আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড ম্যাচের ঝাঁজ কেন এত বেশি
আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ডের দেখা হয়েছে খুব বেশি নয়। কিন্তু যে কবার হয়েছে, বেশির ভাগই জন্ম নিয়েছে আলোচিত কোনো ঘটনা। ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে বেকহামের লাল কার্ড কিংবা ফুটবলের নিয়ম বদলে দেওয়া রাতিনের বহিষ্কার—এমন সব ঘটনাই দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দিয়েছে অন্য মাত্রা।
৫. রাতিনের বহিষ্কার, বদলে গেল ফুটবলের নিয়ম
১৯৬৬ বিশ্বকাপে ওয়েম্বলি ম্যাচটা ছিল কোয়ার্টার ফাইনাল। এই ম্যাচেরই এক ঘটনা পরে ফুটবলের রেফারিং ব্যবস্থাই বদলে দেয়। আর্জেন্টিনার আন্তোনিও রাতিনকে অসন্তোষ প্রকাশের দায়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন। কিন্তু রেফারির ভাষা না বোঝায় রাতিন একজন দোভাষী দাবি করেন এবং প্রায় ১০ মিনিট মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত তাঁকে মাঠ থেকে সরাতে পুলিশ ডাকা হয়। তখন ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। এ ঘটনাই পরবর্তী সময়ে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। কাকতালীয়ভাবে এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড সেমিফাইনালের লাইনআপ চূড়ান্ত হওয়ার দিনই ৮৯ বছর বয়সে মারা যান রাতিন।
৪. বার্তোনির ঘুষিতে ভাঙল চেরির দুটি দাঁত
স্রেফ প্রীতি ম্যাচ ছিল এটি। তবে ১৯৭৭ সালে লা বোম্বোনেরায় হওয়া ম্যাচটিতে অপ্রীতিকর ঘটনাই ঘটে যায়। ম্যাচ শেষ হতে সাত মিনিট বাকি থাকতে ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরি পেছন থেকে আর্জেন্টিনার দানিয়েল বার্তোনিকে কড়া ট্যাকল করেন। ব্যাপারটা ভালোভাবে নেননি বার্তোনি। উঠে দাঁড়িয়ে সোজাসুজি চেরির মুখে ঘুষি বসিয়ে দেন। ঘটনার আকস্মিকতা কাটানোর পর চেরি আবিষ্কার করেন, তাঁর সামনের দুটি দাঁত ভেঙে গেছে। এ ধরনের ঘটনায় রেফারির চুপ করে থাকার কথা নয়। দুজনকেই দেখানো হয় লাল কার্ড। আর দাঁত হারানো চেরি নাম লেখান একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডে—আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে লাল কার্ড দেখা প্রথম ইংলিশ ফুটবলার তিনি।
৩. পচেত্তিনোর ফাউল, বেকহামের জয়সূচক পেনাল্টি
২০০২ বিশ্বকাপের এই ম্যাচটি রেফারিং সিদ্ধান্তের কারণে আলোচিত। সুবিধাটা পেয়েছিল ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধের শেষ দিকে মরিসিও পচেত্তিনো ইংল্যান্ডের মাইকেল ওয়েনকে ফাউল করেছেন জানিয়ে ইংল্যান্ডকে পেনাল্টি দেন রেফারি। যা কাজে লাগিয়ে গোল করেন ডেভিড বেকহাম। একমাত্র সেই গোলে জিতে নকআউট পর্বে উঠে যায় ইংল্যান্ড। আর গ্রুপে তৃতীয় হয়ে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
২০১৬ সালে টটেনহামের কোচ থাকাকালে পচেত্তিনো বলেন, ‘১৫ বছর আগে ওয়েন ডাইভ দিয়েছিল। ইংলিশ ফুটবল সব সময় ন্যায্য—এটা বিশ্বাস করবেন না। ও যেন সুইমিংপুলে ঝাঁপ দিয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে স্পর্শই করিনি।’ জাপানের হোক্কাইদোতে হওয়া সেই ম্যাচে রেফারি ছিলেন পিয়েরলুইজি কলিনা। মজার ব্যাপার হলো, সেই কলিনাই এখন ফিফার রেফারি–বিষয়ক কমিটির প্রধান, এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচের রেফারিং নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবও দিয়ে যাচ্ছেন তিনিই!
২. বেকহামের লাল কার্ড
দুই দলের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে। সেই ম্যাচেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল ডেভিড বেকহামকে। প্রথমার্ধ শেষে স্কোর ছিল ২–২। ইংল্যান্ডের হয়ে গোল করেন অ্যালান শিয়ারার ও মাইকেল ওয়েন, আর আর্জেন্টিনার হয়ে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও হাভিয়ের জানেত্তি। দ্বিতীয়ার্ধের মাত্র দুই মিনিটের মাথায় ডিয়েগো সিমিওনের ফাউলের পর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে লাল কার্ড দেখেন বেকহাম। এরপরও ১০ জনের ইংল্যান্ড ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানেই হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের।
১. ‘ঈশ্বরের হাত’
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা লড়াইয়ের কথা উঠলে সবার আগে যে ঘটনার কথা মনে পড়ে, সেটি ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল গোলশূন্য। দ্বিতীয়ার্ধে শূন্যে ওঠা একটা বলের উদ্দেশে ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লাফিয়ে হাত দিয়ে ঘুষি মেরে বল জালে জড়িয়ে দেন ম্যারাডোনা। কিন্তু রেফারি আলি বিন নাসের এ নিয়ে ভ্রুক্ষেপ করেননি। গোল বহাল থাকে। ম্যারাডোনা মেতে ওঠেন উদ্যাপনে, আর ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা ফেটে পড়েন ক্ষোভে।
বিতর্কিত সেই গোলের মাত্র চার মিনিট পরই ম্যারাডোনা করেন আরেকটি অবিশ্বাস্য গোল। প্রায় ৬০ গজ দূর থেকে বল নিয়ে চার ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে করা সেই গোলটি অনেকের চোখেই ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জেতে ২–১ ব্যবধানে। আর এক সপ্তাহ পর নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপাও।