’৮২ বিশ্বকাপ ড্রয়ের অনুষ্ঠান প্রথম টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ওই টুর্নামেন্টে ফিফার চাহিদা অনুযায়ী স্পেনের স্টেডিয়ামগুলো মেরামতে ৪ কোটি ডলার খরচ করা হয়, ৬ কোটি খরচ করা হয় সাংগঠনিক কাজে, যার মধ্যে ৬০ লাখই খরচ হয় সেই অনুষ্ঠানে।

সমস্যা শুরু হয় ড্র শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে, যখন স্প্যানিশ পুলিশ একটি অজ্ঞাতনামা সতর্কবার্তা পায়; যেখানে বলা হয়, বাস্কদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ইটিএ ‘অনুষ্ঠানের গুরুতর ক্ষতিসাধন করতে চায়’। যদিও শেষতক তা ফাঁপা বুলিতে পরিণত হয়েছিল। তবে এই বিশ্বকাপের জন্য ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে স্পেনে আসা অতিথিদের বরণ করা হয়েছিল আপাদমস্তক বন্দুকে মোড়ানো প্রহরী এবং শিকারি কুকুরদের পাহারায়।

ইংল্যান্ড ১২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরলেও তাদের শীর্ষ ছয় বাছাইয়ের একটি দল হিসেবে রাখা হয়, আর এতে খেপে অন্য ইউরোপিয়ান দলগুলো। এমন ফ্যাসাদে লিপ্ত ছিল দক্ষিণ আমেরিকানরাও। আর্জেন্টিনার ডিয়েগো ম্যারাডোনা সন্দেহ প্রকাশ করে বসেন যে ড্র–টা পাতানো হবে যেন ‘সবার চোখের মণি ব্রাজিল ফাইনালে ওঠার সহজতম রাস্তায় হাঁটতে পারে’।

আর ম্যারাডোনার এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাজিলিয়ানরাও মনে করিয়ে দেয়, চার বছর আগে আর্জেন্টিনায় স্বৈরশাসক ভিদেলার আয়োজিত বিশ্বকাপে কী কী সব অশৈলী কারবার ঘটেছিল।

তবে ব্রাজিলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিবাদী ও ক্যারিশম্যাটিক ফুটবলার সক্রেটিস সোচ্চার ছিলেন নিজ দেশ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সব রকম স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে। বলে রাখা ভালো, ’৭৮–এর মহাবিতর্কিত বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার সামরিক শাসকেরা স্বপ্ন দেখছিলেন, আরও একটা বিশ্বকাপ জিতে এবং ফকল্যান্ড যুদ্ধের ধোঁয়া তুলে নিজেদের শাসন পাকাপোক্ত করবেন। কিন্তু মায়ো দেল প্লাতার আন্দোলন তখন গণ–আন্দোলনে পরিণত। লোকে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, স্বৈরাচার যতই শক্তিশালী হোক, জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামনে দাঁড়াতে পারবে না।

বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকাকে সমর্থন করায় নিউজিল্যান্ড ক্ষমা না চাইলে বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেয় ক্যামেরুন। নিউজিল্যান্ড ক্ষমা না চাইলেও ক্যামেরুন আর আলজেরিয়া শেষতক বিশ্বকাপে অংশ নেয় ঠিকই, তবে ক্যামেরুনের গোলকিপার থমাস এনকোনো মাঠে ও মাঠের বাইরে জঘন্য বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে নিজের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন।

শুরু হলো বিশ্বকাপ

মোট ২৪টি দল প্রাথমিক পর্বে ছয়টি গ্রুপে ভাগ হলো। সেরা দুটি করে দল দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবে, যেখানে তিনটি করে দল নিয়ে চারটি গ্রুপ হবে। এই পর্বের গ্রুপ–সেরারা যাবে সেমিফাইনালে। এ–ই ছিল সেই টুর্নামেন্টের ফরম্যাট।
প্রথম খেলাতেই (১৩ জুন) ঘটল অঘটন। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা হেরে গেল বেলজিয়ামের কাছে। শুধু তা–ই নয়, বার্সেলোনার ঐতিহাসিক ক্যাম্প ন্যুতে ৯৫ হাজার দর্শকের সামনে সেই খেলার অন্যতম আকর্ষণ, আর্জেন্টাইন তরুণ ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে রীতিমতো বোতলবন্দী করে রাখে বেলজিয়ানরা। তবে বেলজিয়াম আর আর্জেন্টিনাই হাঙ্গেরি আর হন্ডুরাসকে পেছনে ফেলে পরের রাউন্ডে উঠে যায়।

গ্রুপ ‘বি’তে ফরাসিদের ফেবারিট ধরা হলেও তারা ইংল্যান্ডের কাছে হারে আর সাবেক চেকোস্লোভাকিয়ার সঙ্গে ড্র করে। তবে প্লাতিনির দল পরের পর্বে উতরে যায়।
ঠিক ৪০ বছর পর এখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ এক দেশে বিশ্বকাপ হওয়ার লগ্নে ১৯৮২ সালের সেই আসর আরেক তেলসমৃদ্ধ দেশ কুয়েতের জন্য ছিল স্মরণীয়। বিশ্বকাপে খেলার টিকিট পাওয়ায় কুয়েতের ২৪ সদস্যের দলের সবাই উপহার পান একটি করে ক্যাডিলাক গাড়ি, এক খণ্ড করে জমি আর দামি স্পিডবোট। এ প্রসঙ্গে কুয়েতি আমিরের ভাই আর ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল জাবির আল সাবাহের গল্পটা মনে করা যাক।

ফ্রান্সের সঙ্গে গোটা তিনেক গোল হজম করার পর কুয়েত যখন শেষ বাঁশির ক্ষণ গুনছিল, তখন আলা জিহেস ফ্রান্সের হয়ে আরও ১টি গোল করে বসেন। কিন্তু কুয়েতিরা দাবি করেন, গ্যালারি থেকে আসা বাঁশির শব্দকে রেফারির শেষ বাঁশি ভেবে খেলা ছেড়ে দিয়েছিলেন! এর মধ্যেই এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটে। জোব্বা পরিহিত, দামি ধনরত্নে মোড়ানো এক লোক হুংকার দিয়ে মাঠে তেড়ে যান। পেছন–পেছন একগাদা স্প্যানিশ পুলিশ। লোকটা কে? কুয়েতি রাজপুত্তর। আশ্চর্যজনকভাবে এরপর রেফারি বলে বসেন, ‘না গোল হয়নি!’ ওইখানেই খেলা শেষ। আর ফিফা এরপর মহামান্য আমিরকে জরিমানা করে আট হাজার পাউন্ড ।

সবচেয়ে বড় লজ্জার ঘটনাটা ঘটেছে ২ নম্বর গ্রুপে। সেটি সম্ভবত বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরেকটি পাতানো ম্যাচ।

পাতানো খেলায় কলঙ্কিত বিশ্বকাপ:

পশ্চিম জার্মানি প্রথম খেলাতেই বিস্ময়করভাবে আলজেরিয়ার কাছে হেরে যায়। লাখদার বেলোউমি নামক এক ২৪ বছর বয়সী আলজেরীয় সেদিন জার্মান বাহিনীকে যেভাবে একাই নাস্তানাবুদ করেছিলেন, এর সঙ্গে সম্ভবত কেবল চার বছর পরের ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা চলে। ১টি গোল আর একটি ‘অ্যাসিস্ট’ করা বেলাউমির সেদিনের পারফরম্যান্স বিশ্বকাপ ইতিহাসেই অন্যতম সেরা। আলজেরিয়ার সর্বকালের সেরা তকমা পাওয়া বেলাউমি-ব্লাইন্ড পাসের মতো দারুণ কৌশলের আবিষ্কারক এই খেলোয়াড়কে নিয়ে সে পর্যায়ের মাতামাতিটা হয়নি; কারণ, তিনি ইউরোপে ক্লাব ফুটবল খেলেননি।

তবে পশ্চিমাদের ভণ্ডামির বড় এক প্রমাণ পাওয়া যায় ২৫ জুন গিজনের এল মিনিয়নে। দুই খেলায় জেতা অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ম্যাচ ছিল চিলিকে হারানো জার্মানির। জার্মানি জিতলে আলজেরিয়াসহ তিন দলের সমান পয়েন্ট হবে। আলজেরিয়ার গোল ব্যবধান ০, অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার +৩ আর জার্মানির +২। অর্থাৎ জার্মানি যদি ১ বা ২ গোলের ব্যবধানে জেতে, তাহলে ইউরোপের দুটি দেশ পরের রাউন্ডে যাবে আর বাদ পড়বে আলজেরিয়া।

কে না জানে, জার্মানরা হিসাব আর জ্ঞানবিজ্ঞানে খুবই পাকা। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে অস্ট্রিয়া ১০ মিনিটের মাথায় ১ গোল খেয়ে আর কোনো উদ্যমই দেখায়নি। জার্মানিও এই ‘স্পিরিট’কে সম্মান দেখিয়ে একই কাজ করে।

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম লজ্জাজনক এই ম্যাচে পুরো ৮০ মিনিট দুই দল এক্কাদোক্কা খেলে যায়। জঘন্য পাতানো খেলায় দুই দল নিজেদের মধ্যে পাস খেলে সময় পার করে। ফিফা অবশ্য যথারীতি এর মধ্যে কোনো অপরাধই খুঁজে পেল না! ঝামেলায় যেতে না চাওয়ার এই আশ্চর্য দক্ষতার জন্য ফরাসি কোচ মিশেল হিদালগো দাবি করেছিলেন, ফিফাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত। তিনি সেদিন মাঠে এসেছিলেন পরের রাউন্ডে প্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রিয়ার খেলা দেখে কিছু নোট নেওয়ার জন্য। খেলা শেষে তাঁর নোট খাতায় একটি আঁচড়ও পড়েনি!

খেলা শেষে জার্মান এক ধারাভাষ্যকার ঘোষণা দেন, এই ম্যাচ নিয়ে যে পর্যালোচনা হওয়ার কথা, তা সংগত কারণেই বাতিল হলো। অস্ট্রিয়ার একজন ধারাভাষ্যকার সবাইকে অনুরোধ করেন খেলার চ্যানেলটা পাল্টে অন্য কিছু দেখতে। একজন জার্মান–ভক্ত এই লজ্জার প্রদর্শনী দেখে রাগে, ক্ষোভে নিজের দেশের পতাকা পুড়িয়ে দেন, আলজেরীয়রা গ্যালারি থেকে অস্ট্রিয়ানদের উদ্দেশে টাকার বান্ডিল দেওয়ার ভান করেন, কেউ কেউ খিস্তিখেউড় করেন। কিন্তু দুর্বলের ক্ষোভ কে কবে পাত্তা দিয়েছে!
আলজেরিয়ায় এই ম্যাচটাকে বলা হয় ‘ফাদাখাত গিজন’ বা ‘গিজনের কলঙ্ক’ আর জার্মানিসহ ইউরোপে মশকরা করে বলা হয় ‘আনচলুস’ (১৯৩৮ সালে হিটলারের জার্মানির অস্ট্রিয়া দখলের সঙ্গে তুলনা করে)। তবে এই ম্যাচ নিয়ে সবচেয়ে জুতসই কাজ করে স্পেনের সংবাদপত্র ‘এল কমের্সিও’।

পরেরদিন সংবাদমাধ্যমটি ম্যাচে প্রতিবেদন ফলাও করে ছাপে ছবিসহ। তবে তা খেলার পাতায় নয়, অপরাধ পাতায়!

উৎকর্ষের চূড়ায় উঠেছিলেন যাঁরা

এত লজ্জা আর তামাশার মধ্যে সে আসরে খেলোয়াড়ি উৎকর্ষের চূড়ান্তও দেখা যায়। তিন খেলোয়াড়—ইতালির পাওলো রসি, ব্রাজিলের সক্রেটিস আর ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনি মনোমুগ্ধকর খেলা উপহার দেন।

সবচেয়ে বড় আফসোস হয় ব্রাজিলের দলটি নিয়ে। লেখক স্টুয়ার্ট হর্সফিল্ড ব্রাজিলের ১৯৮২ বিশ্বকাপের মিশন নিয়ে লেখা ‘গ্লোরিয়াস ফেইলিউর’ বইয়ে দাবি করেন, এই দলটা ১৯৭০–এর দলটার চেয়েও চিত্তাকর্ষক ফুটবল খেলত। সক্রেটিসের অধিনায়কত্বে ‘ফুটবল আর্টের’ চূড়ান্ততম নিদর্শন দেখালেও তারা দ্বিতীয় রাউন্ডের গ্রুপ নির্ধারণী খেলায় হারে ইতালির কাছে।

সক্রেটিসকে নিয়ে অবশ্য একটা আস্ত অধ্যায় হওয়া উচিত। তাঁর দারুণ পড়ালেখা করা পিতা, যিনি সে দেশের সামরিক শাসনকে ঘৃণা করতেন, পুত্রের নাম রেখেছিলেন এই আশায় যে তিনি একদিন দার্শনিক হবেন। আশার চেয়েও বেশি মিটেছিল। মার্ক্স যেমনটা বলতেন, দার্শনিকের কাজ কেবল দুনিয়ার ব্যাখ্যা নয়, একে বদলানো—দাড়িওয়ালা, মাথায় ব্যান্ড বেঁধে খেলতে নামা, সেই যুগের তরুণদের কাছে স্টাইলের আইকন সক্রেটিস ফুটবল দিয়ে মন জয় করে দেশের গণতন্ত্র ফেরাতেও নিজের খ্যাতিকে কাজে লাগান। সেই বিশ্বকাপের দুই বছর পর সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা আন্দোলনের দাবি ছিল সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজন। ১৯৮৪ সালের ১৬ এপ্রিল ক্যাথেড্রাল স্কয়ারে সমবেত ২০ লাখ লোকের সমাবেশে সক্রেটিস ঘোষণা দেন, যদি নির্বাচন দেওয়া না হয়, তবে তিনি ব্রাজিল ছেড়ে ইতালি চলে যাবেন। এই হুমকিতে কর্তৃপক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়।

সক্রেটিসের মিডফিল্ডের কমরেড জিকো কেমন খেলতেন, তা বোঝা যায়, বাংলাদেশে সে সময়ের আশপাশে জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের নাম হিসেবে ‘জিকো’র জনপ্রিয়তা। এই দুজনের সঙ্গে ফ্যালকাও আর তোনিনহো ক্রেজা মিলে চারজনের মিডফিল্ডকে তর্কযোগ্যভাবে অনেকে সর্বকালের সেরা বলেন।

তবে সেরা হলেই যে জেতা যায় না, তার প্রমাণ দিলেন ইউরোপে সর্বকালের সেরাদের একজন প্লাতিনি। তিনিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেমিফাইনালে বিদায় নেন টাইব্রেকারে। অবশ্য বাজে রেফারিংয়েরও ভূমিকা ছিল। জার্মান গোলরক্ষক হ্যারল্ড শুমাখার সেদিন ঘুষি মেরে ফ্রান্সের ব্যাটিসটনকে মাটিতে পেড়ে ফেলেন, কিন্তু ডাচ রেফারি চার্লস করভার সবাইকে বিস্মিত করে শুমাখারকে শুধু হলুদ কার্ড দেখান।

তবে এত কিছু করেও জার্মানরা ফাইনালে হারে। প্লাতিনি, সক্রেটিসরা যদি দেবতাসুলভ সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হন, তবে সেই টুর্নামেন্টে মহাকাব্যের নায়ক ছিলেন পাওলো রসি। গ্ল্যামারবিহীন এই ফুটবলার হাজির হয়েছিলেন কলঙ্ক আর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে।
১৯৮০ সালে ইতালির ফুটবল একেবারে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। স্বভাবসুলভ রসিক ইতালিয়ানরা বলতেন, সে বছর ইতালিয়ান সিরি ‘আ’তে সবচেয়ে ফেবারিট দল হচ্ছে রেজিনা কোয়েলি। না, এই নামে কোনো দল ছিল না, নামটা রোমের জেলখানার। সে বছর ইতালির ১১ জন খেলোয়াড় সে দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক ‘তোতোনেরো’ (ব্ল্যাক লটারি) ম্যাচ গড়াপেটা কেলেঙ্কারিতে কারাদণ্ড ভোগ করেন।

এর আগে বিশ্বকাপে ভালো পারফর্ম করা ২৩ বছরের রসির নামও এতে জড়িয়ে পড়ে। ইতালির সে সময়ের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়টির বিরুদ্ধেও অভিযোগ আসে ২০ লাখ লিরা ঘুষ নেওয়ার। রসি বরাবরই তা অস্বীকার করেন, কিন্তু সমস্যা হয় দুই জায়গায়। এক, রসির আইনজীবী একজন সাক্ষীকে ঘুষ সাধেন এবং ইতালিয়ান ফেডারেশন মনে করে, একে তো রসি এই মামলায় খুব বেশি তথ্য দেননি সহখেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে আর এমন নামি খেলোয়াড়কে কঠোর সাজা দিলে তা ভবিষ্যতের জন্য ভালো দৃষ্টান্ত হবে।

তিন বছরের সাসপেনশন পেলেও শেষতক রসি আবেদন করে এক বছর সাজা কমান, কিন্তু দুই বছর খেলার বাইরে থেকে মুটিয়ে যাওয়া রসির জন্য বিশ্বকাপে খেলাটা অসম্ভব মনে হচ্ছিল। সে বছর মাত্র তিনটি লিগ ম্যাচ আর ছয়টি কাপ ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নিয়েই রসি হাজির হন স্পেনে।

রসির শুরুটা ছিল দলের মতোই নিষ্প্রভ। প্রথম তিন ম্যাচে তিনটা ড্র করে ইতালি, রসি গোলের খাতা খুলতে পারেননি, কিন্তু সময়মতো তিনি জ্বলে উঠলেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে অন্যতম সেরা হ্যাটট্রিকে দিয়ে থামিয়ে দেন ব্রাজিলকে। সেমিফাইনালে জোড়া গোল করে হারান সেই টুর্নামেন্টে দারুণ ফর্মে থাকা পোল্যান্ডকে। আর ফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে ১ গোল দিয়ে ইতালিকে জেতান ৩-১ গোলে।

সারা দুনিয়া তখন হতবাক। ব্রাজিলিয়ান দেবতা আর ফরাসি শিল্পীদের বদলে লজ্জা আর অপমানে ন্যূব্জ হয়ে থাকা ইতালির অবিশ্বাস্য জয়ে। মর্ত্যের মানুষ রসির অমর হয়ে ওঠার অনবদ্য কাহিনিতে রঙিন হয়েছিল ১৯৮২ বিশ্বকাপ।

সে বিশ্বকাপের শেষটা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় ইতালির দারুণ দলীয় সমন্বয়ে গড়া দ্বিতীয় গোলের পর গোলদাতা মার্কো তারদেল্লির আকাশ, বাতাস কাপানো এক উল্লাসে। সেই বিজয়োল্লাসের নামই হয়ে গেল ‘তারদেল্লি স্ক্রিম।’ সেই চিৎকার জানান দিচ্ছিল, নশ্বর, ভুলে ভরা মানুষই শেষতক জেতে। এই দুনিয়ার আসল চ্যাম্পিয়ন সেই মানুষেরাই।