ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচই এখন ভারতের গলার কাঁটা
ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ—এমন সুযোগ যেকোনো ছোট দলের জন্যই আরাধ্যের। আর সেই ব্রাজিল যখন আপনার দেশে খেলতে আসার দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলে, তখন তো কথাই নেই। ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের জন্যও এমন ম্যাচ বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র-রাফিনিয়ার মতো তারকাদের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাওয়াটা যেকোনো ভারতীয় ফুটবলারের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে।
কিন্তু সেই বহু কাঙ্ক্ষিত ম্যাচই এখন ভারতীয় ফুটবলের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে। ফুটবলের কর্তাদের ভাবতে হচ্ছে ব্রাজিলকে তারা বেশি গুরুত্ব দেবেন নাকি অন্য ম্যাচকে?
আগামী ৩ অক্টোবর কলকাতায় ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলবে ভারত জাতীয় দল। একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ায় শুরু হবে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ফিফা আশিয়ান কাপ। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবরের এই টুর্নামেন্টে ভারত খেলবে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে।
অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ) সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ব্রাজিল ম্যাচ ও আশিয়ান কাপের জন্য আলাদা দল গঠন করা হবে। গত বৃহস্পতিবার নির্বাহী কমিটির সভার পর এআইএফএফ জানিয়েছে, দুটি প্রতিযোগিতাতেই অংশ নেওয়ার কথা ফিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
আর এখানেই শুরু হয়েছে ভারতীয় ফুটবলের নতুন সংকট। এত দিন অভিযোগ ছিল, জাতীয় দল পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলার সুযোগ পায় না, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নেই। গত বছরই যেমন ভারত খেলতে পেরেছিল মোটে ১০ ম্যাচ। এবার পরিস্থিতি উল্টো। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের আন্তর্জাতিক উইন্ডোতেই চার-পাঁচটি ম্যাচ খেলার সুযোগ এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত ম্যাচের মধ্যে কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেবে ভারত?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ নিয়ে সাবেক কোচ ও খেলোয়াড়দের মতামত নিয়েছে। তাদের বড় অংশই ব্রাজিলের ম্যাচের চেয়ে আশিয়ান কাপকে এগিয়ে রাখছে। সাবেক এফসি পুনে সিটির কোচ প্রদ্যুম রেড্ডি ব্রাজিল ম্যাচকে সরাসরি ‘নিরর্থক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, অনেক বছর ধরে ভারতকে সাফ কাপের গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার মধ্যসারির দলগুলোর বিপক্ষে খেলার কথা বলা হচ্ছে। এবার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দলের বিপক্ষে সেই সুযোগ এসেছে। তাই সেটিকে ছেড়ে ব্রাজিলের দিকে ছোটা ভুল হবে।
মোহনবাগানকে আই-লিগ জেতানো সঞ্জয় সেনেরও একই মতের। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘ব্রাজিলের ম্যাচ থেকে ভারতের কী লাভ? আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আশিয়ান কাপ। আমরা যদি ইন্দোনেশিয়ার মতো দলকে হারাতে পারি, সেটিতে উন্নতি বোঝা যাবে।’
সাবেক ভারতীয় ডিফেন্ডার মেহরাজউদ্দিন ওয়াদুও ফিফা আশিয়ান কাপকে ‘১০০ শতাংশ’ অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে। তাঁর যুক্তি, এখানে ধারাবাহিক প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ আছে, শিরোপা জেতার সুযোগ আছে, পুরস্কারের অর্থ আছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দীর্ঘমেয়াদি কাজে লাগবে এমন অভিজ্ঞতা হবে। ব্রাজিলের ম্যাচ সমর্থকদের জন্য রোমাঞ্চকর হলেও ফুটবলের উন্নতির বিচারে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণ দেখছেন না তিনি।
তবে সবাই যে ব্রাজিল ম্যাচকে বাতিল করে দিচ্ছেন, তা নয়। সাবেক ভারতীয় খেলোয়াড় ও ইন্ডিয়ান অ্যারোজের কোচ ফ্লয়েড পিন্টো বরং এটিকে দেখছেন এক জীবনে একবার আসা সুযোগ হিসেবে। তাঁর প্রশ্ন, কোন সিনিয়র খেলোয়াড় ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো তারকার বিপক্ষে খেলতে চাইবে না? একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, আশিয়ান কাপ হতে পারে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার জায়গা।
কিন্তু ভারতের জন্য বিষয়টি শুধু পছন্দের নয়, নিয়মেরও। আশিয়ান কাপ ফিফার আয়োজিত প্রতিযোগিতা হওয়ায় সেখানে দ্বিতীয় সারির দল পাঠানো কতটা সম্ভব, সেটিও প্রশ্ন। সাবেক এআইএফএফ মহাসচিব শাজি প্রভাকরণ দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, ফিফার প্রতিযোগিতায় সাধারণত ‘এ’ দল পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকে। কারণ, প্রতিযোগিতার মর্যাদা ও স্বচ্ছতা রক্ষা করতে ফিফা এমন ব্যবস্থাই অনুসরণ করে।
তাঁর মতে, ভারত এমনিতেই দুটি শক্তিশালী ‘এ’ দল মাঠে নামানোর মতো খেলোয়াড় তৈরি করতে পারেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভবিষ্যতের জন্য কোন সুযোগটি বেশি মূল্যবান।
অর্থাৎ যে ম্যাচটি একসময় ভারতের জন্য ছিল স্বপ্নের, সেটিই এখন তাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে কঠিন বাস্তবতার প্রশ্ন। ব্রাজিলের বিপক্ষে ভিনিসিয়ুসদের সামনে দাঁড়ানোর রোমাঞ্চ, নাকি ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ-ভারতকে বেছে নিতে হবে কোনটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে!