জিদান ইকবাল যে এরই মধ্যে সমর্থকদের মন জয় করে নিয়েছেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে আগেও। শুক্রবার মেলবোর্ন ভিক্টোরির বিপক্ষে ইউনাইটেডের ৪-১ গোলের জয়ের পর ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় বেছে নিতে ক্লাবের ভক্তদের ভোট দিতে বলা হয়েছিল। ২৫ শতাংশ ভোটে যাতে জয়ী হয়েছেন জিদান ইকবাল! ম্যাচে মোট ২১ জন খেলোয়াড়কে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলানো হয়েছে, তথ্যটা সম্ভবত এতে বাড়তি কিছু যোগ করে।

সেদিন ম্যাচে তাঁর সবচেয়ে নজরকাড়া মুহূর্তটা এসেছে দ্বিতীয়ার্ধের ১২ মিনিটে। মেলবোর্নের এক খেলোয়াড়ের বাধা ছিটকে বেরিয়ে বল পায়েই ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গেলেন, সে পথে কাটানো হয়ে গেল আরেক খেলোয়াড়কে। চোখধাঁধানো মুহূর্তটা ৭৪ হাজার দর্শকে ভরা এমসিজিতে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে।

তবে সেটি ছাপিয়েও ইউনাইটেড কোচ এরিক টেন হাগকে বেশি মুগ্ধ করার কথা ইকবালের বল দখলে রাখার ক্ষমতা। বলের নিয়ন্ত্রণ সহজে হারায় না তরুণ মিডফিল্ডারের পা থেকে। (সাবেক ওয়েলশ মিডফিল্ডার) রবি স্যাভেজের ছেলে চার্লি স্যাভেজের সঙ্গে ইকবালের সমন্বয়টাও চোখে পড়েছে। সেইল ইউনাইটেড ছেড়ে ৯ বছর বয়সে ইকবাল ম্যান ইউনাইটেডের একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই একসঙ্গে খেলছেন দুজন।

default-image

একাডেমিতে আলো ছড়িয়ে ইউনাইটেডের মূল দলে খেলার সুযোগও হয়ে গেছে। ইকবালের প্রতিক্রিয়ায় তাই স্বপ্নপূরণের আনন্দ, ‘ইউনাইটেডের হয়ে খেলতে পারা সবচেয়ে সুখের অনুভূতি। এই ক্লাবকে ভালোবেসেই বড় হয়েছি। সেই ক্লাবের হয়েই এত মানুষের সামনে খেলতে পারা স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ব্যাপার। নিজেকে নিজে বলছিলাম, “এমন হতেই পারে যে মূল দলের হয়ে শুধু এই একটা ম্যাচেই খেলার সুযোগ হবে আমার।”মাঠে তাই শুধু নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে যাব, বাকিটা সৃষ্টিকর্তার হাতে।’

ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে ইসলামের অনুসারী ইকবালের বাবা পাকিস্তানি, মায়ের দেশ ইরাক। বাবাকে ‘ফাইভ–আ–সাইড’ ফুটবলে খেলতে দেখে দেখেই ফুটবলে আসা। জন্ম ইংল্যান্ডে, ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার সুযোগ তাই ছিলই। কিন্তু ইকবাল বেছে নিয়েছেন ইরাককে। গত জানুয়ারিতে ইরানের বিপক্ষে ইরাকের জার্সিতে অভিষেকও হয়ে গেছে। এটা জেনে একটু অবাকই হতে পারেন, নামে আর খেলার জায়গায় মিল থাকলেও জিনেদিন জিদান ইকবালের আদর্শ নন, সেটি মেসুত ওজিল।

ইউনাইটেডের জার্সিতে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে অভিষেক অবশ্য গত মৌসুমেই হয়ে গেছে ইকবালের। চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বে অর্থহীন হয়ে পড়া ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের ক্লাব ইয়াং বয়েজের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে ইকবালকে নামিয়ে দিয়েছিলেন সে সময়ের ইউনাইটেড কোচ রালফ রাংনিক। তাতে একটা রেকর্ডও হয়েছে। বাবার সূত্রে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ইকবালই যে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলা প্রথম ব্রিটিশ দক্ষিণ এশিয়ান!

যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশিয়ানদের কমিউনিটিতে ইকবালের ‘পোস্টার বয়’ হয়ে উঠতে আর কী লাগে! যদিও ইকবালের এসবে তেমন আগ্রহ নেই। ‘আমি শুধু নিজের পথচলার কথাই ভাবি। সামনে যা হওয়ার তা-ই হবে। পথচলায় যদি কাউকে অনুপ্রাণিত করতে পারি, তাহলে তো অসাধারণ। দক্ষিণ এশিয়ার খুব বেশি মানুষের এখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার সুযোগ হয় না। তবে আমার মনে হয়, আপনি যদি সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার মতো যোগ্য হন, সে ক্ষেত্রে আপনি কোথা থেকে উঠে এলেন, সেটি কোনো ব্যাপার নয়। আমি এসবে খুব বেশি মনোযোগও দিই না’—নির্লিপ্ত ইকবালের উত্তর।

ইকবালের খেলায় টেন হাগও মুগ্ধ। গত সপ্তাহে ব্যাংককে অনুশীলন সেশনের কথা, কাঁধের ঝাঁকুনিতে শরীর বাঁকিয়ে ক্লাবের ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ফ্রেডকে ঘোল খাইয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন ইকবাল। তবু সে তো অনুশীলন সেশনের কথা, মূল দলে নিয়মিত কতটা সুযোগ হবে ইকবালের? আদৌ হবে? সম্ভাবনা কম। ইউনাইটেডের মাঝমাঠ সাজাতে টেন হাগের হাতে ফ্রেড, স্কট ম্যাকটমিনে, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ডনি ফন ডি বিক ছিলেন; ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনও যোগ দিয়েছেন। বার্সেলোনা থেকে ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংয়েরও যোগ দেওয়ার কথা চলছে। সে ক্ষেত্রে টেন হাগ হয়তো ইকবালের নিয়মিত খেলা নিশ্চিত করতে তাঁকে অন্য কোনো ক্লাবে ধারে পাঠাবেন।

ইউনাইটেডের সঙ্গে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ ইকবালের সেই মানসিক প্রস্তুতিও আছে, ‘কী হবে, তা তো আর বলতে পারছি না। যদি ধারে কোনো ক্লাবে যাওয়ার সুযোগ আসে, সে ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ দুটিই বিবেচনা করে দেখব। এই মুহূর্তে এ নিয়ে কথা বলার কিছু নেই।’

(ইংলিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানডে টাইমস অবলম্বনে)

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন