রাফিনিয়া-ভিনিদের ‘মরু-থ্রিলার’, রিয়ালকে হারিয়ে সুপার কাপ বার্সার

স্প্যানিশ সুপার কাপের শিরোপা নিয়ে বার্সার খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপনরয়টার্স

বার্সেলোনা ৩-২ রিয়াল মাদ্রিদ

কোনো কোনো থ্রিলার সিনেমায় গল্পের শুরুটা হয় সাদামাটা। হয়তো ভেতরে ভেতরে একটু চাপা উত্তেজনা, যেন কিছু একটা ঠিক নেই! তারপর, গল্পের শেষটায় আসতে আসতে একদম জমে যায়।

স্প্যানিশ সুপার কাপ ফাইনালের প্রথম আধা ঘন্টা খুব রোমাঞ্চকর ছিল না। তবে ভেতরে ভেতরে একটু বিষ্ময়ের সঙ্গে উত্তেজনাও ছিল। এ কোন রিয়াল মাদ্রিদ!

মৌসুমের প্রথম ফাইনাল, তারওপর প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা, সেখানে আক্রমণে রিয়ালের তেমন গরজ নেই। ডিফেন্সিভ, বেশি জায়গা দিচ্ছে, বলে দখল থাকছে না, প্রতি আক্রমণই সম্বল। বল হারালে পুনরুদ্ধারেও ক্ষিপ্রতা নেই, বরং নিচে নেমে আসছেন কেউ কেউ।

রবার্ট লেভানডফস্কি, রাফিনিয়া, লামিনে ইয়ামালদের সামনে এমন কৌশলে বেশিক্ষণ জাল অক্ষত রাখা খুব কঠিন। ঘটলও ঠিক তাই। রিয়ালের কোচ জাবি আলোনসোর গোলকিপার থিবো কোর্তোয়াকে জাল থেকে বল বল কুড়াতে হলো ৩৫ মিনিটে।

তার এক মিনিট আগেই রাফিনিয়া নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেন। বাঁ প্রান্ত দিয়ে টেনে নিয়ে গেলেও শটটা ঠিকমতো হয়নি। পরের মিনিটেই ‘কার্বন কপি’ সুযোগে করলেন গোল কিন্তু জেদ্দার কিং আব্দুল্লাহ স্পোর্টস সিটি স্টেডিয়ামে খেলা তখনো ঠিক জমেনি। গোলটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। এভাবে কাটল আরও দশ-এগারো মিনিট এবং তারপর বিশ্বাসের সব বাঁধ ভেঙে জাগল মরু-রোমাঞ্চ।

প্রথমার্ধে তিন মিনিটের যোগ করা সময়ে গোল হলো তিনটি!

এমন কিছু প্রতিদিন দেখা যায় না। এল ক্লাসিকোর ইতিহাস ততক্ষণে বলছে, এই দ্বৈরথের ইতিহাসেও ঠিক তাই; যে কোনো একটি অর্ধে যোগ করা সময়ে এত গোল নজিরবিহীন। মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত, অসাধারণ কিছু মুভ, ম্যাচ ততক্ষণে জমে ক্ষীর। মজাটাও কেমন, বিরতিতে কেউ এগিয়ে নেই। দুই দলই সমান, যেন কোনো থ্রিলার সিনেমার ‘ইন্টারভাল’—শুরুর মতোই ড্র, তবে পাঞ্চ ও পাল্টা পাঞ্চে পাল্টেছে স্কোরলাইন। ২-২।

৪৭ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ৪৯ মিনিটে লেভানডফস্কি ও ৪৬ মিনিটে গঞ্জালো গার্সিয়ার গোলে ম্যাচ নামের এই প্লটে মোচড়ের পর মোচড়। দ্বিতীয়ার্ধটা তাই হয়ে উঠেছিল প্রবল আকাঙ্খিত। গোল হবে আরও সেটা জানা কথাই ছিল। কিন্তু কয়টি?

শেষ বাঁশি বাজার পর উত্তর মেলাতে গিয়ে কেউ কেউ হতাশ হতে পারেন। মাত্র এক গোল! আসলে প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তের উত্তেজনার পারদ যতটা চড়েছিল, তাতে বিরতির পর কেউ না কেউ গোল করতেনই।

বেশ কিছু আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের মধ্যে সেই ‘কেউ’ হলেন, ম্যাচে গোলের ঘরে তালাটা প্রথম যিনি ভেঙেছিলেন, রাফিনিয়া!

৭৩ মিনিটে বক্সের মাথা থেকে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে শট নেন ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার। রিয়ালের ডিফেন্ডার রাউল আসেনসিওর পায়ে লেগে বলের দিক পাল্টে যায়। পোস্টে গোলকিপার থিবো কোর্তোয়া তাতে ‘রং ফুটেড’ এবং গোল।

এই গোলটাই বার্সাকে শেষ পর্যন্ত এনে দিয়েছে ৩-২ গোলের দারুণ এক জয়। তাতে মৌসুমের প্রথম শিরোপা জয়ের সঙ্গে বার্সা কোচ হান্সি ফ্লিকের ফাইনালে জয়রথ এক ধাপ এগোল। এটা তাঁর ১৫ তম ফাইনাল, ট্রফি হাতছাড়া হয়নি একবারও। তার মধ্যে সর্বশেষ এই জয়ে ‘বোনাস’ কি প্রতিশোধ? গত অক্টোবরেই লা লিগায় রিয়ালের মাঠে ২-১ গোলে হেরেছে বার্সা।

দ্বিতীয়ার্ধে যোগ করা সময়ে ফ্রেঙ্কি ডি ইয়াংয়ের লাল কার্ড দেখা বার্সার ট্রফি আনন্দকে মাটি করতে পারেনি। ম্যাশের শেষ ১৫ মিনিটেও দাপট ছিল তাদের। বদলি নেমে কিলিয়ান এমবাপ্পেও রিয়ালের হার ঠেকাতে পারেননি।

এমবাপ্পের তুলনায় ভালো খেলেছেন ইয়ামাল
রয়টার্স

পিছিয়ে পড়ার তিন মিনিট পরই (৭৬ মিনিট) গঞ্জালো গার্সিয়াকে তুলে এমবাপ্পেকে নামান রিয়াল কোচ জাবি। তাঁর মিশন তখন পরিস্কার: গোল দরকার। হাঁটুর চোট থেকে সেরে ওঠা ফরাসি স্ট্রাইকার তাতে সফল হতে না পারলেও বার্সাকে ১০ জনে পরিণত করতে পেরেছেন। তাঁকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেন মিডফিল্ডার ফ্রেঙ্কি ডি ইয়াং। ফাউলটা লাল কার্ড দেখার মতো ছিল কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে রিয়াল যে ফেরার সুযোগ পেয়েছিল এবং সেটা কাজে লাগাতে পারেনি, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দ্বিতীয়ার্ধে যোগ করা সময়ের পঞ্চম ও ষষ্ঠ মিনিটে নিশ্চিত দুটি সুযোগ নষ্ট হয়। প্রথমে বক্সের ভেতর থেকে আলভারো ক্যারেরাস সরাসরি বার্সার গোলকিপার হোয়ান গার্সিয়ার হাতে বল মারেন। অবিশ্বাস্য মিস! পরের মিনিটে রাউল আসেনসিওর হেডও গার্সিয়ার হাতে। হাপ ছেড়ে বাঁচে বার্সা। তবে শেষ বাঁশি বাজতেই সুপার কাপ ধরে রাখার উদ্‌যাপন শুরু। গত বছর এই মাঠেই ফাইনালে রিয়াল হেরেছিল ৫-২ গোলে।

বার্সার উদ্‌যাপনের সময় ভিনির মুখটা শুকনো। ম্যাচের সেরা গোলটি তাঁর আর সেটাও খুব দরকারের সময়ে। জাতীয় দল (৩) ও ক্লাব (১৬) মিলিয়ে টানা ১৯ ম্যাচে গোল ছিল না। দলও তখন পিছিয়ে। বাঁ প্রান্তে প্রথমার্ধের শুরুতে বার্সার ডিফেন্ডার জুলস কুন্দেকে গতিতে পেছনে ফেলার পর বোঝা গিয়েছিল ভিনির আজ খরা কাটতে পারে। সেটাও কী দারুণভাবে; কুন্দেকেই বাঁ প্রান্ত দিয়ে গতিতে পেছনে ফেলে বক্সে আবারও ‘নাটমেগ’ করলেন তাঁকেই, সামনে ততক্ষণে পাউ কুবারসি, তাঁকেও কাটিয়ে তারপর গোলের শট। মনে রাখার মতো এক গোল।

কিন্তু কারও কারও কাছে সেটার স্থায়ীত্ব হতে পারে মাত্র দুই মিনিট। যোগ করা সময় তিন মিনিট দেওয়া হলেও খেলা ততক্ষণে চতুর্থ মিনিটে এবং পেদ্রির নিখুঁত এক ডিফেন্স চেরা পাস থেকে পায়ের সামান্য এক টাচে লেভানডফস্কির অসাধারণ এক গোল! কিন্তু প্রথমার্ধের শেষ অঙ্ক তখনও বাকি। বক্সের জটলা থেকে গঞ্জালোর গোলে রিয়াল যখন সমতায় যোগ করা সময়ের খেলা পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেছে।

তবে গোল হতে পারত আরও। দুই অর্ধে রিয়াল গোলকিপার কোর্তোয়া দুটি সেভ করেন। প্রথমার্ধে একটি সেভ গার্সিয়ার। রিয়ালের ১২টি শটের ১০টি ছিল পোস্টে, বার্সার ১৬টির মধ্যে ৭টি। এসব পরিসংখ্যান ছাপিয়ে এই ম্যাচে রিয়াল কোচ জাবির খেলানোর কৌশল নিয়ে কথা উঠতে পারে।

গত ২৬ অক্টোবরে লা লিগায় রিয়ালের বিপক্ষে সেই হারের পর আর কোনো স্প্যানিশ প্রতিপক্ষের কাছে হারেনি টানা ১০ ম্যাচজয়ী বার্সা। আর লা লিগাতেও দ্বিতীয় রিয়ালের সঙ্গে ৪ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে শীর্ষে। বার্সার এবারের সুপার কাপ জয় কিন্তু একটি ইঙ্গিতও দিচ্ছে।

২০২২ সুপার কাপ জয়ের পর লিগ জেতে রিয়াল। পরের তিনটি বছর এই ধারা চলছে। সুপার কাপজয়ী দল শেষ পর্যন্ত জিতেছে লিগ। ২০২৩ সালে বার্সা, ২০২৪ সালে রিয়াল এবং গত বছর আবার বার্সা। তাহলে এবারও কি বার্সারই লিগ শিরোপা?