১৯৩৮ বিশ্বকাপ
যুদ্ধের ছায়ায় ইতালির টানা দ্বিতীয় শিরোপা
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের যে রোমাঞ্চের শুরু হয়েছিল, ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই ফুটবল-আবেগে মিশে গেল রাজনীতির বারুদ। মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও তখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা। একদিকে অ্যাডলফ হিটলারের আগ্রাসন, অন্যদিকে স্পেনের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র মাস তিনেক আগে অস্ট্রিয়া দখল করে নেয় জার্মানি। ফলে বাছাইপর্ব পেরিয়েও অস্ট্রিয়ার আর খেলা হলো না। তাদের বদলে অন্য কোনো দেশকেও নেওয়া হয়নি। ফিফা শুধু একটি ছোট্ট বিবৃতিতে জানাল—অস্ট্রিয়া না আসায় সুইডেন সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে চলে গেছে।
ব্রাজিল ও কিউবার ‘বিদ্রোহ’
তৃতীয় বিশ্বকাপ কোথায় হবে, তা ঠিক করতে ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকের সময় ফিফার কমিটি বসেছিল জার্মান রাজধানীর ‘ক্রল অপেরা’ হলে। আমেরিকা মহাদেশ থেকে একমাত্র প্রার্থী আর্জেন্টিনা। কিন্তু ইউরোপীয় ভোট গেল ফ্রান্সের দিকে। ফিফা সভাপতি জুলে রিমের দেশ বলে আবেগ, আর ইউরোপ থেকে বুয়েনস এইরেস যাওয়ার দূরত্বের অজুহাত—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার হাত থেকে সরে গেল আয়োজনের স্বপ্ন। ক্ষোভে আর্জেন্টিনা শুধু বিশ্বকাপ থেকে নিজেরাই সরে গেল না, অন্য আমেরিকান দেশগুলোকেও বয়কটে টানার চেষ্টা করল। অন্য সব দেশ সায় দিলেও ব্রাজিল আর কিউবা রাজি হলো না। দুই দেশ গেল ফ্রান্সে। দক্ষিণ আমেরিকায় তারা ‘বেইমান’ তকমা পেল। স্পেন খেলল না অন্য কারণে, ১৯৩৬ সাল থেকে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে তখন জ্বলছে দেশটা।
মাটিয়াস সিনদেলার: এক অবাধ্য ‘মোৎসার্ট’
অস্ট্রিয়া না খেললেও হিটলারের নির্দেশে জার্মানি দলে সাতজন অস্ট্রিয়ান ফুটবলারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু সেই সময়ের সেরা অস্ট্রিয়ান তারকা মাটিয়াস সিনদেলার জার্মানির হয়ে খেলতে সাফ মানা করে দিলেন। অস্ট্রিয়ার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় মনে করা হয় তাঁকে, ডাকা হতো ‘ফুটবলের মোৎসার্ট’ নামে। লম্বা, দেখতে হালকা পাতলা বলে অনেকে ডাকতেন ‘দ্য পেপারম্যান’ নামে। নাৎসি বাহিনী তাঁকে খেলার জন্য চাপ দিলেও তিনি মাথা নত করেননি। বিস্ময়করভাবে, এক বছর পরেই ভিয়েনার এক অ্যাপার্টমেন্টে রহস্যজনকভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁকে। সরকারি ভাষ্য ছিল, গ্যাস লিকে মৃত্যু। কেউ কেউ বলেন, হিটলারের সবচেয়ে ভয়ংকর এসএস বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। ভিয়েনার ‘জেন্ট্রালফ্রিডহফ’ সিমেট্রিতে তাঁর শেষকৃত্যে এসেছিলেন প্রায় বিশ হাজার মানুষ।
রোগা কিন্তু দুর্দান্ত
কোয়ার্টার ফাইনালে স্ত্রাসবুর্গে নেমেছিল পোল্যান্ড ও ব্রাজিল। দুই দলেই অসুস্থ তারকা। পোল্যান্ডের আর্নেস্ট ভিলিমভস্কি দাঁতের ব্যথায় কাতর। ব্রাজিলের লিওনিদাস দা সিলভা ভুগছেন কানের সংক্রমণে, চিকিৎসক বললেন মাঠে নামা চলবে না। দুজনেই নামলেন। সেটা ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বর্ণময় ম্যাচ। ভিলিমভস্কি করলেন চার গোল—তখনকার বিশ্বকাপ রেকর্ড। লিওনিদাস করলেন তিনটি। তবু পোল্যান্ড হারল ৬-৫ গোলে। মজার ব্যাপার, লিওনিদাস একটা গোল করেছিলেন খালি পায়ে! প্রচণ্ড বৃষ্টি আর কাদায় তাঁর এক পায়ের বুট আটকে গিয়েছিল। সেটা ফেলেই শুধু মোজা পরা পায়ে বল জালে পাঠিয়ে দেন তিনি। রেফারিও কাদা মাখা মোজাকে বুট ভেবে ভুল করেছিলেন।
ছেঁড়া ইলাস্টিক
সেমিফাইনালের ৬০তম মিনিট, ইতালি ১-০ গোলে এগিয়ে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাউলে পেনাল্টি পেল ইতালি। কিক নিতে গেলেন ইতালির অধিনায়ক জিউসেপ্পে মিয়াজ্জা। তাঁর শর্টসের ইলাস্টিক ছিঁড়ে গিয়েছিল এক ট্যাকেলে। এক হাতে প্যান্ট ধরে রেখেই গোল করলেন! গোল উদ্যাপনের সময় দুই হাত তুলতে গিয়ে শর্টস পড়ে গেল হাঁটুর কাছে। সতীর্থরা ঘিরে ধরলেন, সহকারী কোচ নতুন প্যান্ট নিয়ে এলেন।
‘জয় অথবা মৃত্যু’
১৯ জুন, কলম্বেস অলিম্পিক স্টেডিয়াম, প্যারিস। বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি ইতালি ও হাঙ্গেরি।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট আলবার্ট লেব্রুঁ ফাইনাল দেখতে গেলেন। ফুটবল সম্পর্কে তাঁর ন্যূনতম ধারণাও যে নেই, সেটা বোঝা গেল ম্যাচ শেষে। লেব্রুঁ নাকি ফিফা সভাপতি জুলে রিমেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ফ্রান্স দল কোথায়?’ জুলে রিমে রেফারির দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘ওই যে রেফারি, উনি ফরাসি।’
শোনা যায়, ফাইনালের আগে ইতালির ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিতো মুসোলিনি খেলোয়াড়দের কাছে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন মাত্র তিনটি শব্দে—‘ভিনচেরে ও মোরিরে’ (জয় অথবা মৃত্যু)। ইতালিয়ান ডিফেন্ডার পিয়েত্রো রাভা অবশ্য পরে বলেছিলেন, ওটা ছিল স্রেফ শুভকামনা বার্তা।
৪-২ গোলে ইতালি ফাইনাল জেতার পর হাঙ্গেরির গোলরক্ষক আন্তাল সাবো রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘চারটা গোল খেয়েছি তো কী হয়েছে, এগারোটা মানুষের জীবন তো বাঁচাতে পেরেছি