default-image

গত ১৯ জুন বাফুফের পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এমনই এক কারচুপির কথা বলা হয়েছে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল একাদশের বিপক্ষে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড জালিয়াতি করে তিন ফুটবলারকে খেলানোর অপরাধে এক লাখ টাকা জরিমানাসহ এক বছর নিষিদ্ধ করা হয়েছে খেলাঘর ক্রীড়াচক্রকে। ক্লাবটির ম্যানেজার সোয়েব হাসানকে ৫০ হাজার ও তিন ফুটবলারকে ২৫ হাজার টাকা করে করা হয়েছে আর্থিক জরিমানা। অর্থাৎ একটা দল তিনজন বেশি বয়সী খেলোয়াড় খেলানোর জন্য অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডই নিজেদের মতো করে বানিয়ে ফেলেছে। ভাবা যায়! যে মঞ্চে ফলাফলের চেয়ে বেশি নজর খেলোয়াড় তৈরি করা, সেখানেই এত বড় জালিয়াতি!

আবারও আশ্রয় নিতে হচ্ছে সেই ‘আমার পণ’ কবিতায়—‘আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।’ কার্ড জালিয়াতির বিষয়গুলো কিশোরদের জানার কথা নয়। তারা শুধু চায় যেকোনো উপায়ে খেলতে। আর নিজেদের স্বার্থে অসৎ উপায়ে সে খেলার সুযোগ করে দেওয়ার কাজটি করে দিয়েছেন দলের অভিভাবক বা গুরুজনেরা। সেটি স্বীকার করে অনুতপ্ত ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন। মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেছেন, ‘প্রথম ম্যাচে আমরা হেরে যাই। পরে সুপার লিগে খেলার লোভ থেকে আমরা এ অন্যায়টি করেছি। পরে দোষ স্বীকার করে নিয়েছি। এ জন্য আমরা অনুতপ্ত।’

অনিয়মের গল্প শোনা যায় আরও। লিগে খেলেছে সুবিধাবঞ্চিত কিশোরদের নিয়ে গড়া গোল্ডেন ফিউচার একাডেমি। যে একাডেমির দায়িত্বে ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক দুই ফুটবলার আলফাজ ও বেলাল মিয়া। দুজনই খুব কাছ থেকে দেখেছেন প্রতিপক্ষ দলগুলোকে। চমকে ওঠার মতো একটি তথ্য পাওয়া গেল লম্বা থ্রো-ইনের জন্য বিখ্যাত সাবেক ডিফেন্ডার বেলালের কাছ থেকে। বেলাল বলছিলেন, ‘মেডিকেল করানোর জন্য হাসপাতালে গিয়ে রিসিট করানোর পর বলা হয় অমুক নাম্বার রুমে যান। তখন সে রুমে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় অল্পবয়স্ক খেলোয়াড়কে। এতে নাম অন্য আরেক জনের হলেও সে খেলোয়াড়ের জায়গায় অল্পবয়স্ক খেলোয়াড়ের বয়সই এসেছে।’ তাকেও সে একই পদ্ধতি ব্যবহার করতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ বেলালের।

একটি দলের বিপক্ষে অভিযোগ উঠেছিল বেশি বয়সী একজন ফুটবলার খেলানোর। সেই খেলোয়াড়কে আবার মেডিকেল করানোর জন্য ডেকে পাঠানো হয়। ক্লাব এমন এক অল্পবয়স্ক খেলোয়াড় নিয়ে আসে, অভিযুক্ত খেলোয়াড়ের ছবির সঙ্গে যার চেহারার কোনো মিল নেই। এটা একপ্রকার নিশ্চিতই যে মেডিকেল করানোর জন্য খেলোয়াড় বদল করে আনা হয়েছে।

default-image

ঘটনাটা বলেছেন বাফুফের সহসভাপতি ও মহানগরী লিগ কমিটির চেয়ারম্যান ইমরুল হাসান, ‘দলের মধ্যে থেকে এমন একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে আসা হয়, যে ছেলেটাকে দেখে মেডিকেল করানোর ইচ্ছাও জাগেনি। ওই ছেলেটাকে অভিযুক্তর ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, চেনে কি না? সে বলল, ‘‘আমাদের দলে খেলেছে।’’ আবার দলের কোচকে আলাদা করে জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলল, অভিযুক্তর ছবিটা এডিট করা।’ এরপর থেকে সে দলের প্রতি নজর বাড়িয়ে দেয় লিগ কমিটি।

কিন্তু কারচুপির কৌশলের তো অন্ত নেই। টুর্নামেন্ট কমিটির কাছে সঠিক খেলোয়াড় তালিকা দেওয়া থাকলেও খেলার মাঝবিরতিতে জার্সি বদল করে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে অনিবন্ধিত খেলোয়াড়। প্রতিদিন একাধিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ায় খেলার দিকে নজর না রেখে প্রতারণা ধরার কাজটা তো আয়োজকদের জন্য কষ্টসাধ্যই। আগামী বছর থেকে একটা পরিকল্পনার কথা জানালেন চেয়ারম্যান ইমরুল হাসান, ‘মেডিকেলে উত্তীর্ণ খেলোয়াড়দের সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপে আঙুলের ছাপ রাখা হবে। মাঠে নামার আগে মেলানো হবে সে ছাপ।’ কিন্তু নিজেরা ভালো না হলে অনিয়ম জমতে জমতে তা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হতে কতক্ষণ!

তাই প্রশ্নটা থেকে যায়, ছলচাতুরী করে আমরা কাকে ফাঁকি দিচ্ছি? নিজেদেরই নয় কি?

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন