প্রথম যে ম্যাচটার কথা বলা হলো, তা স্পেন-জার্মানি। এই বিশ্বকাপের আটটা গ্রুপের মধ্যে শুধু একটা গ্রুপেই বিশ্বকাপজয়ী দুটি দল। টুর্নামেন্টের যে পর্যায়েই দেখা হোক না কেন, এই দুই দলের ম্যাচ ‘বড়’ বলে স্বীকৃতি পাবেই। তবে এখন তা বড় থেকে আরও বড়। ম্যাচটার রংই যে পুরোপুরি বদলে গেছে। বিশ্বকাপের ড্রয়ের পর ২৭ নভেম্বরের যে ম্যাচটাকে মনে করা হয়েছিল ‘ই’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়নশিপ নির্ধারণী, এখন তা পরিণত জার্মানির টিকে থাকার লড়াইয়ে।

যে ম্যাচের সব টিকিট সবচেয়ে আগে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল, সেটিও এখন আরেক সাবেক চ্যাম্পিয়নের বাঁচা-মরার লড়াই। গ্রুপে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কঠিন ম্যাচের স্বীকৃতি পেয়েছিল এটি আগেই। এখন আর শুধু কঠিন বললেই চলছে না। আগামীকাল মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচটি লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ-স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। সৌদি আরবের বিপক্ষে অভাবনীয় পরাজয় শুধুই একটা পরাজয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি আরও বড় তাৎপর্য নিয়ে দেখা দেবে, তা অনেকটাই ঠিক করে দেবে এই ম্যাচ। ২০০২ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেওয়ার চোখরাঙানি নিয়ে মাঠে নামবেন মেসিরা।

জার্মানিকে অবশ্য এতটা পিছিয়ে যেতে হচ্ছে না। রাশিয়ায় ২০১৮ বিশ্বকাপেই তো প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের। জার্মানির সেই বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল মেক্সিকোর কাছে হার দিয়ে, শেষ দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে আরেকটি হারে। জাপানের কাছে এই পরাজয় স্বাভাবিকভাবেই জার্মান শিবিরে ফিরিয়ে আনছে সেই দুঃস্বপ্ন। কোস্টারিকাকে স্পেন গোলবন্যায় ভাসিয়ে দেওয়ার পর যা আরও তীব্রতর হয়ে উঠেছে। হাজার ছাড়ানো পাসের ম্যাচে স্পেন যেভাবে কোস্টারিকাকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছে, তা সতর্কবাণী শুনিয়ে দিয়েছে শিরোপাপ্রত্যাশী সব দলকেই। তবে স্পেনকে নিয়ে অন্য দলগুলোর তো পরে ভাবলেও চলছে। জার্মানির যে এখনই স্প্যানিশ ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচার পথ সন্ধান করতে হচ্ছে।

জাপানের বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল জার্মানি দলের ওই ছবিটা। ফিফা ‘ওয়ান লাভ’ আর্মব্যান্ড পরতে দিচ্ছে না বলে নয়্যার-মুলাররা প্রতিবাদ করেছিলেন মুখে হাত চাপা দিয়ে। অন্য আরও অনেক দলেরই ওই আর্মব্যান্ড পরার কথা ছিল। ফিফার বিধিনিষেধে ক্ষোভও আছে সেসব দলে। তবে আর কোনো দল মাঠে সেটির প্রকাশ ঘটায়নি। জার্মানির ওই প্রতীকী প্রতিবাদ তাই প্রশংসাই পেয়েছিল উদার ও মুক্তচিন্তার সব মানুষেরও। জার্মানদের তো বটেই। কিন্তু জার্মানি হেরে যাওয়ার পর সেটিকেও এখন দেখা হচ্ছে অন্যভাবে। ১৯৯০ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান অধিনায়ক লোথার ম্যাথাউস বলছেন, খেলার আগে অন্য সব বিষয় নিয়ে একটু বেশিই ভেবে ফেলেছে জার্মানি। এর সঙ্গে পরাজয়ের যোগসূত্র খুঁজে না পেলে অবশ্যই এ কথা বলতেন না।

এশিয়ায় এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ২০ বছর আগে প্রথমটি এশিয়ার সেরা সাফল্যের সাক্ষী হয়ে আছে। ভালো খেলার সঙ্গে বিতর্কিত রেফারিংয়ের একটু সহায়তা যোগ হয়ে যৌথ স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া যেবার সেমিফাইনালে উঠে যায়। আরেক স্বাগতিক জাপানের অগ্রযাত্রা দ্বিতীয় রাউন্ডে থেমে গেলেও সেটাই হয়ে আছে বিশ্বকাপে তাদের সেরা সাফল্য। গত বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জিততে জিততে হেরে যাওয়ায় যা ছাড়িয়ে যাওয়া হয়নি। এশিয়ায় আবার বিশ্বকাপ এবং এই বিশ্বকাপকে কাঁপিয়ে দেওয়া প্রথম দুটি আপসেটই এশিয়ান দলের কীর্তি। জার্মানির বিপক্ষে জাপানের জয় অনুমিতভাবেই ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ বলে স্বীকৃতি পাচ্ছে। জাপানের ফুটবল ইতিহাসে দোহার পরিচিতিটাও বদলে গেছে এতে। এত দিন দোহা বললেই জাপানিদের মনে পড়ে যেত হৃদয় ভেঙে দেওয়া সেই স্মৃতি। ২৯ বছর আগে এই দোহাতেই ১৯৯৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের সেই ম্যাচ। ইরাকের বিপক্ষে ২-১ গোলে এগিয়ে জাপান। জিতলেই প্রথমবারের মতো নিশ্চিত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্ব। যোগ করা সময়ে গোল করে ইরাক ড্র করে ফেলায় যে স্বপ্ন বাতাসে মিলিয়ে যায়। জাপানি ফুটবলে এই ম্যাচটার নাম ‌‘অ্যাগনি ইন দোহা’। যেটির বাংলা করা যায়, ‘দোহার যন্ত্রণা’। পুরো বিপরীত এক অভিজ্ঞতা বোঝাতে দোহার নামটা এখন আসছে ভিন্নভাবে। জাপানি সংবাদমাধ্যম জার্মানির বিপক্ষে জয়টার নাম দিয়েছে, ‘মিরাকল ইন দোহা’।

বিশ্বকাপে ‘মিরাকল’ শব্দটা এত দিন শুধু একটা ম্যাচের ক্ষেত্রেই সেভাবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৫৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে সে সময়ের সর্বজয়ী হাঙ্গেরির বিপক্ষে পশ্চিম জার্মানির জয়কে দেওয়া হয়েছিল এই নাম। যা নিয়ে পরে সিনেমাও। ‘মিরাকল’ এখন তাহলে দুটি। নিয়তির কী পরিহাস, ৬৮ বছর আগে ‘মিরাকল’-এর স্রষ্টারা এবার নিজেরাই ‘মিরাকল’-এর শিকার!