বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এমবোলোর লাল কার্ড নিয়ে মুখ খুললেন রেফারি
২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ডের ম্যাচটি নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সেই ম্যাচের বিতর্কগুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনেইরো। এই ম্যাচের রেফারি ছিলেন তিনি।
ম্যাচে পিনেইরো ও মেসির মধ্যে কথোপকথন পরে ভাইরাল হয়। আর্জেন্টিনা অধিনায়ক তাঁকে ঠিক কী বলেছিলেন এবং কেন সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোকে লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন, সেসব নিয়েও মুখ খুলেছেন পিনেইরো।
সেদিন ম্যাচের এক পর্যায়ে মেসি রেফারি পিনেইরোকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে ঠিকভাবে কথা বলুন। আমাকে অসম্মান করবেন না। আমি আপনার সঙ্গে ঠিকভাবে কথা বলেছি, আপনিও আমার সঙ্গে ঠিকভাবে কথা বলুন।’ এই কথপোকথনের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন পিনেইরো। পাশাপাশি মেসির মতো তারকা ফুটবলারদের ম্যাচ পরিচালনার সময় একজন রেফারিকে কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হয়, সেটিও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
পর্তুগালের চ্যানেল ১১-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিনেইরো বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা খেলোয়াড়দের মধ্যে ঘটে। ফুটবলে এমন কথাবার্তা স্বাভাবিক। অধিনায়কেরা সাধারণত একটু বেশি কথা বলেন, আর নতুন নিয়মও তাঁদের সেই সুযোগ দিয়েছে।’
পিনেইরো আরও বলেন, ‘মেসির সঙ্গে যা হয়েছে, এমন ঘটনা অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গেও হয়েছে। অবশ্য তিনি মেসি বলেই বিষয়টি হয়তো বেশি নজরে এসেছে। কিন্তু ফুটবলে এসব খুবই স্বাভাবিক। রেফারিরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলেন, খেলোয়াড়েরাও রেফারিদের সঙ্গে কথা বলেন। কোনো কোনো পরিস্থিতি নিয়ে মতভেদ হতে পারে, তবে এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।’
উয়েফার এলিট ক্যাটাগরির এই রেফারি যোগ করেন, ‘এটা যদি মেসি বা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে না ঘটত, তাহলে হয়তো বিষয়টিকে এত বড় করে দেখা হতো না। এগুলো ইতিবাচক; কারণ, সব পরিস্থিতিতেই হলুদ কার্ড দেখানোর প্রয়োজন হয় না। আমরা কথা বলি, আর কথা বলেই একে অপরকে বুঝতে পারি।’
কানসাস সিটিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোর লাল কার্ড। এ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেন পিনেইরো, ‘সে মুহূর্তে আমাদের মনে হয়েছিল, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ফাউল করেছেন এবং সেটি হলুদ কার্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। কিন্তু ভিএআর জানায়, কোনো ফাউল হয়নি; বরং অন্য খেলোয়াড় ফাউলের অভিনয় করেছেন। এরপর আমি ঘটনাটি আবার (ভিএআর মনিটরে) দেখি এবং নিশ্চিত হই যে সত্যিই কোনো ফাউল হয়নি, এটি ছিল অভিনয়। ফলে সেটিই দ্বিতীয় হলুদ কার্ডে পরিণত হয়।’
পিনেইরো ব্যাখ্যা করেন, ‘এটি যদি তাঁর প্রথম হলুদ কার্ডও হতো, তবু সিদ্ধান্ত একই থাকত। এ কারণেই ফিফা এই পরিবর্তন এনেছে। আমার বিশ্বাস, নতুন নিয়মগুলোর লক্ষ্যই হলো খেলাকে আরও উন্নত করা। রেফারিদের জন্যও এগুলোর প্রভাব খুবই ইতিবাচক এবং এগুলো মাঠের প্রকৃত ঘটনাকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে সাহায্য করছে। সত্যি বলতে, এগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন।’
তবে পিনেইরোর বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় ফুটবলের নিয়মনীতি নির্ধারক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এমবোলোর লাল কার্ড দেখানো ছিল রেফারির ভুল সিদ্ধান্ত।
নিজেদের অফিশিয়াল বিবৃতিতে ভিএআর প্রটোকল ব্যাখ্যা করে আইএফএবি বলেছে, ‘ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ’–সংক্রান্ত (মিসটেকেন আইডেন্টিটি) ভিএআর প্রটোকল বা নিয়মটি এমবোলোর মতো ওই ধরনের ঘটনার জন্য প্রযোজ্য ছিল না। ভবিষ্যতে অন্য টুর্নামেন্টে হয়তো নিয়মটি ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে চলমান নিয়ম পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি এভাবে প্রয়োগ করা যাবে না।’
তবে আইএফএবি নিজেদের অবস্থান জানানোর পর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে ফিফা। সংস্থাটি এমবোলোকে লাল কার্ড দেখানোর সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছে, এটি নিয়মের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে ফিফা প্যারাগুয়ে-যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে মিগেল আলমিরনের একই ধরনের হলুদ কার্ডের ঘটনা উল্লেখ করে বলেছে, ‘ফিফা বিশ্বকাপজুড়ে “ভুল খেলোয়াড় শনাক্ত”-সংক্রান্ত নিয়মের একই ব্যাখ্যা ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।’
ফিফার বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমাদের মতে এটি রেফারি বা ভিএআরের কোনো ভুল ছিল না; বরং এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে। আইএফএবির সার্কুলারে দেওয়া মন্তব্য আমরা লক্ষ করেছি। পুরো প্রক্রিয়াতেই তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। তারা নিশ্চিত করেছে, এই ব্যাখ্যা বৈধ এবং ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বার্ষিক সাধারণ সভায় যেমন আলোচনা হয়েছিল, তেমনি ভিএআর প্রটোকল সংশোধনের সময়ও বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে।’
ফিফা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তি ও ব্যাখ্যার সুযোগ এড়াতে সংশ্লিষ্ট নিয়মটি আরও স্পষ্টভাবে পুনর্লিখন করা হবে।