চোটে পড়লেই কেন ফিনল্যান্ডে ছোটেন তারকা ফুটবলাররা

সার্জন ল্যাসে লেম্পাইনেনের সঙ্গে জার্মান গোলকিপার টের স্টেগানইনস্টাগ্রাম/ল্যাসে লেম্পাইনেন

সামনেই বিশ্বকাপ। এ সময়ে গুরুতর চোট মানেই বিশ্বকাপ মিস করার শঙ্কা। সেই ঝুঁকি এড়াতেই রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার এদের মিলিতাও ছুটে গেছেন ফিনল্যান্ডে। মঙ্গলবার সেখানে তাঁর অস্ত্রোপচারও সম্পন্ন হয়েছে।

শুধু মিলিতাও-ই নন, দুই দশক ধরে তারকা ফুটবলারদের অনেকেই চোটের চিকিৎসার জন্য ফিনল্যান্ডে উড়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে উসমান দেম্বেলে, আন্দ্রে টের স্টেগেন, রোনালদ আরাউহোরা যেমন আছেন, আছেন একসময়ের তারকা ফুটবলার ডেভিড বেকহাম, ফ্রান্সের বর্তমান কোচ দিদিয়ের দেশম ও ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলাও।

দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর চোট বা আঘাতের চিকিৎসার ক্ষেত্রে তারকা ফুটবলাররা কেন ফিনল্যান্ডের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তা উঠে এসেছে ও’গ্লোবোর এক প্রতিবেদনে। ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমটি বলছে দুজন ক্রীড়া চিকিৎসাবিশেষজ্ঞের কারণেই চোটাক্রান্ত খেলোয়াড়েরা ফিনল্যান্ডের বিমানে চড়ে বসেন। একজনের নাম ল্যাসে লেম্পাইনেন, আরেকজন সাকারি ওরাভা। এর মধ্যে ওরাভা এখন অবসরে, তাঁর শিষ্য হিসেবে কাজ করা লেম্পাইনেনই বর্তমান তারকাদের অস্ত্রোপচার করছেন।

২১ এপ্রিল লা লিগায় আলাভেসের বিপক্ষে ম্যাচে বাঁ পায়ের চোটে পড়েন রিয়াল সেন্টার ব্যাক মিলিতাও। ঊরুর পেছনের এই চোটের জন্য রিয়াল তাঁকে ফিনল্যান্ডে লেম্পাইনেনের কাছে অস্ত্রোপচারের জন্য পাঠায়। পরে ক্লাবের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মিলিতাওয়ের অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। তবে ২৮ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার সম্ভবত বিশ্বকাপে খেলতে পারছেন না।

মিলিতাওয়ের অস্ত্রোপচার করা চিকিৎসক লেম্পাইনেন অর্থোপেডিক সার্জারিতে বিশেষজ্ঞ। ৪৭ বছর বয়সী এই ফিনিশীয় চিকিৎসকের হ্যামস্ট্রিং চোটের পুনর্বাসনের ওপর পিএইচডি গবেষণা আছে। ব্যালন ডি’অরের বর্তমান মালিক দেম্বেলে আর জার্মান গোলকিপার টের স্টেগেনসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ফুটবলারের চিকিৎসা করিয়েছেন তিনি।

দেম্বেলের চিকিৎসার কথাই বলা যাক। ২০২১ সালে বার্সেলোনায় থাকার সময় ডান হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন এই ফরাসি উইঙ্গার। সেই চোটে ইউরো মিস করা দেম্বেলে টানা ১৩৫ দিন মাঠের বাইরে ছিলেন। লেম্পাইনেনের কাছে অস্ত্রোপচার করানোর পর দেম্বেলে আর কখনো ডান হাঁটুতে চোট পাননি।

সফল অস্ত্রোপচার শেষে চিকিৎসক লেম্পাইনেনের সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার এদের মিলিতাও
ইনস্টাগ্রাম/ল্যাসে লেম্পাইনেন

লেম্পাইনেনের এই সাফল্য-যাত্রা যাঁর হাত ধরে, সেই ওরাভাও একজন ফিন। ফিনল্যান্ডবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী পোর্টাল ‘দিস ইজ ফিনল্যান্ডের’ মতে, কিছু রোগীর কাছে ‘ডক্টর হাউস’ নামে পরিচিত ওরাবা। বর্তমানে অবসরে থাকা এই চিকিৎসক তাঁর কর্মজীবনে ক্রীড়াবিদসহ ২৫ হাজারের বেশি মানুষের সফল চিকিৎসা করেছিলেন। স্প্যানিশ অ্যাথলেট মার্তা দমিঙ্গুয়েজ তো একবার গুরুতর চোট থেকে ফেরার পর ওরাভাকে ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের ঈশ্বর’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

অভিজ্ঞ এই সার্জনের সঙ্গে ২০০১ সালে কাজ শুরু করেন লেম্পাইনেন। তৎকালীন পিএইচডি পদপ্রার্থী তরুণ লেম্পাইনেনের গবেষণার বিষয় ছিল ঊরুর পেছনের অংশের চোট। সেই গবেষণাই এখন তাঁকে ক্রীড়াবিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক সার্জনে পরিণত করেছে। ওরাভা চিকিৎসা পেশা থেকে অবসর নেন ২০২০ সালে।

এ পর্যন্ত পড়ে বোঝা গেল ফিনল্যান্ড চোটাক্রান্ত খেলোয়াড়দের গন্তব্য হয়ে কারণ লেম্পাইনেন, আর লেম্পাইনেন এসেছেন ওরাভার পথ ধরে। কিন্তু ওরাভা কীভাবে জড়িয়ে গেলেন ফুটবল দুনিয়ার সঙ্গে?

‘দিস ইজ ফিনল্যান্ড’ ওয়েবসাইট বলছে, সাকারি ওরাভা খেলাধুলার সঙ্গেই ছিলেন। ১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া সার্জন মাত্র ১৭ বছর বয়সে ফিনল্যান্ডের ৫৪ কেজি অনূর্ধ্ব ক্যাটাগরিতে জাতীয় বক্সিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। দুই বছর পর ১৯ বছর বয়সে তিনি খেলাধুলা ছেড়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে মনোযোগ দেন। তবে চিকিৎসক হিসেবে যখন খ্যাতি পেয়ে যান, তখন ইউরোপের নামী ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।

সাকারি ওরাভা ও ল্যাসে লেম্পাইনেন, যে দুজনের কারণে খেলোয়াড়েরা ফিনল্যান্ডমুখী
ইনস্টাগ্রাম/ল্যাসে লেম্পাইনেন

কয়েক দশক ধরে ওরাভা রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, এসি মিলান, চেলসি এবং জুভেন্টাসের মতো ক্লাবগুলোর খেলোয়াড়দের চোট নিয়ে কাজ করেছেন। ১৯৮৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ফিনল্যান্ডের অলিম্পিক দলগুলোর দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। তাঁর চিকিৎসা নিয়েছে ডাচ তারকা মার্কো ফন বাস্তেন, ফ্রান্সের সাবেক ফুটবলার ও বর্তমান কোচ দিদিয়ের দেশম, ইংল্যান্ডের জোনাথন উডগেট, ইতালির আন্দ্রে বারজাল্লি ও ইংল্যান্ডের বেকহামের মতো ক্রীড়াবিদেরা।

২০১০ বিশ্বকাপের তিন মাস আগে এসি মিলানের হয়ে খেলার সময় বেকহামের অ্যাকিলিস টেন্ডন ছিঁড়ে যায়। ৩৪ বছর বয়সী বেকহাম তখন ইংল্যান্ডের হয়ে চতুর্থ ও শেষ বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায়। কিন্তু ওরাভার কাছে যাওয়ার পর বুঝতে পারেন জাতীয় দলের হয়ে তিনি আর কখনোই খেলতে পারবেন না।

ওরাভার হাতে অস্ত্রোপচার করানোর ছয় মাস পরই লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সির হয়ে মাঠে ফেরেন বেকহাম। ২০১৩ সালে বুটজোড়া তুলে রাখার আগে বেকহাম আর কখনো চোটে পড়েননি। স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক মার্কার এক প্রতিবেদনে ওরাভার হাতে গার্দিওলার চিকিৎসার একটি খবর পাওয়া যায়। ২০১৩ সালে পত্রিকাটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওরাভা বলেন, ‘আমার মনে আছে গার্দিওলা খুব চিন্তিত ছিল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে আবার ফুটবল খেলতে পারবেন কি না। যখন আমি বললাম যে পারবেন, তখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছিল তিনি ওই কথাগুলোর অপেক্ষাতেই ছিলেন।’

‘দিস ইজ ফিনল্যান্ড’ ওয়েবসাইটে ওরাভার একটি উক্তি আছে, যেখানে কাজের স্বীকৃতি নিয়ে এই সার্জন বলেছেন, ‘তারা আমাকে বলেছিল ‘‘আপনি যদি আমেরিকান হতেন এবং আমেরিকায় থেকে এসব আবিষ্কার করতেন, তবে আপনি একজন বিখ্যাত এবং ধনী ব্যক্তি হতেন।” কিন্তু আমরা এসবের পরোয়া করি না।’ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কীভাবে তাঁর ক্লিনিকে ফোন যেত, ওরাভা সেটা বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘মানুষ সাধারণত ক্লিনিকে ফোন করে বলে, আমি আমার দেশে অপারেশন করাতে পারছি না, কেউ করছে না। আমি কি ফিনল্যান্ডে আসতে পারি?’

আরও পড়ুন