২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়ন আর্সেনাল

প্রিমিয়ার লিগের নতুন চ্যাম্পিয়ন আর্সেনাল।আর্সেনাল

বাড়িতে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে কি তখন উত্তেজনায় নখ কামড়াচ্ছিলেন মিকেল আরতেতা? নাকি বুক ঢিপঢিপানি লুকাতে বারবার কফির মগে চুমুক দিচ্ছিলেন? মার্টিন ওডেগার্ড, বুকায়ো সাকারাও নিশ্চয়ই টিভির পর্দার সামনে তখন মূর্তির মতো জমে ছিলেন। ভাইটালিটি স্টেডিয়ামে যখন শেষ বাঁশি বাজল, আরতেতা নিশ্চয়ই উল্লাসে লাফিয়েছেন, জড়িয়ে ধরেছেন প্রিয়জনকে। ওডেগার্ড-সাকাসহ আর্সেনালের খেলোয়াড়েরা নিশ্চয়ই খুশিতে বিয়ারের ক্যান খুলেছেন, আনন্দে ফোন করেছেন একে অন্যকে।

২২ বছর! অবশেষে আবার প্রিমিয়ার লিগ জিতল আর্সেনাল।

নাহ, আজ মাঠে নামতে হয়নি তাদের। বোর্নমাউথের মাঠে ম্যানচেস্টার সিটি হোঁচট খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চিত হয়ে গেল—ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের নতুন রাজা আর্সেনাল!

সিটির জন্য সমীকরণটা ছিল সোজাসাপ্টা—শিরোপার লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে বোর্নমাউথের বিপক্ষে জিততেই হবে। কিন্তু ‘চেরি’দের মাঠে গিয়ে ১-১ গোলে ড্র করে বসল সিটিজেনরা।

প্রথমার্ধে ইলি জুনিয়র কোপির গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচজুড়ে মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে সিটি। সুযোগ তৈরি করেছে ভুরি ভুরি। একদম শেষ মুহূর্তে আর্লিং হলান্ড গোল করে সমতা ফেরালেও তা সিটির শিরোপা স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

এই ড্রয়ের পর ৩৭ ম্যাচ শেষে সিটির পয়েন্ট ৭৮। সমান ম্যাচ খেলে আর্সেনাল এগিয়ে ৪ পয়েন্টে। লিগে দুই দলেরই মাত্র একটি করে ম্যাচ বাকি। ফলে গাণিতিকভাবেই সিটির আর আরতেতার দলকে ছোঁয়া সম্ভব নয়। ২০২৫/২৬ মৌসুমের শেষ দিনে ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে যখন আর্সেনাল মাঠে নামবে, তখন তাদের নামের পাশে জ্বলজ্বল করবে ‘চ্যাম্পিয়ন’ তকমা। এটি গানারদের ইতিহাসের ১৪তম লিগ শিরোপা, যা ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ।

ইলি জুনিয়র কোপির গোল।
রয়টার্স

দারুণ ব্যাপার হচ্ছে, আরতেতার এই উৎসবে যিনি অলক্ষ্যে থেকে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করলেন, তিনি আর কেউ নন, আরতেতার ছোটবেলার বন্ধু বোর্নমাউথের কোচ আন্দোনি ইরাওলা। সিটিকে রুখে দিয়ে তিনি কেবল ছোটবেলার বন্ধুকেই এক বিশাল উপহার দেননি, নিজের ক্লাবের জন্যও ইতিহাস লিখেছেন। এই ১ পয়েন্টের সুবাদে আগামী মৌসুমে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় খেলা নিশ্চিত করল বোর্নমাউথ। এমনকি তাদের সামনে এখন চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

ম্যাচের শেষ দিকে সিটির গ্যালারি থেকে ভেসে আসছিল সমবেত কণ্ঠের আকুল এক প্রার্থনা—‘আর একটা বছর, আর একটা মাত্র বছর!’ ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থকেরা হয়তো পেপ গার্দিওলাকে আরও একটা বছর ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, সিটির ডাগআউটে স্প্যানিশ এই মাস্টারমাইন্ডের অধ্যায় এখন স্রেফ ‘আর একটা ম্যাচের’। আর মৌসুমের সেই শেষ ম্যাচটি সিটির জন্য রূপ নিয়েছে স্রেফ আনুষ্ঠানিকতায়।

আর্সেনালের সাফল্যের নেপথ্য কারিগর কোচ মিকেল আরতেতা।
এএফপি

হ্যাঁ, সিটির সমর্থকেরা নিশ্চয়ই শেষ ম্যাচটিকে উৎসবের মঞ্চ বানাবেন। ইংলিশ ফুটবলে গত এক দশকে গার্দিওলা যে ফুটবলীয় বিপ্লব ঘটিয়েছেন, যে অবিশ্বাস্য কীর্তিতে একটা যুগকে রাঙিয়েছেন, তার জন্য দারুণ এক বিদায়ী সংবর্ধনা পেপের প্রাপ্যই। কিন্তু লিগের শেষ দিন পর্যন্ত আর্সেনালকে স্নায়ুচাপে রাখার যে রোমাঞ্চকর সুযোগ ছিল সিটির সামনে, তা আজ কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।

ম্যাচ শেষে স্কাই স্পোর্টসকে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে গার্দিওলা বলেন, খুব কঠিন একটা ম্যাচ ছিল এবং আমরা সেটা জানতামও। আমাদের কিছুটা শক্তির অভাব ছিল, যা খুব স্বাভাবিক। আমাদের প্রতি তিন দিনে একটা করে ম্যাচ খেলতে হয়েছে। তাও আমরা লড়াই করে গেছি। শেষ মুহূর্তে আমরা গোল পেয়েছিলাম, কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে। খেলোয়াড়েরা তাদের সবটুকু ঢেলে দিয়েছে, যেমনটা তারা পুরো মৌসুম জুড়েই করেছে।

ম্যাচ শেষে হতাশ গার্দিওলা।
এএফপি

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের শিরোপা জয়ে নিজের উদারতা দেখাতে ভুল করেননি পেপ। বন্ধু ও একসময়ের সহকারী আরতেতাকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, আর্সেনাল, মিকেল আরতেতা এবং তাদের খেলোয়াড়দের অভিনন্দন। তারা এটার যোগ্য। মুহূর্তটি ওদের জন্য সত্যি ভীষণ স্পেশাল।