ব্রাজিলে এক ম্যাচে ২৩ লাল কার্ড, সর্বোচ্চ ৩৬ লাল কার্ডের বিশ্ব রেকর্ড আর্জেন্টিনায়

ছবিটি প্রতীকী। দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল ম্যাচে সাধারণত মারামারি বেশি হয়রয়টার্স

ফুটবল ম্যাচ রণক্ষেত্র হয়ে উঠলে কী হয়? এই ধরুন, ম্যাচটি গণপিটুনির হয়ে যায়! বল নিয়ে খেলার বদলে কিল, ঘুষি, লাথিই চলে বেশি। গত পরশু ব্রাজিলের মিনেইরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছে। ক্রুজেইরো ও আতলেতিকো মাদ্রিদের মধ্যে ম্যাচে এমন মারামারি করে লাল কার্ড দেখেন ২৩ জন!

ক্রুজেইরোর ১২ ও আতলেতিকোর ১১ ফুটবলার ও কর্মকর্তাকে লাল কার্ড দেখান রেফারি। খেলা চলাকালীন ক্রুজেইরো মিডফিল্ডার ক্রিস্টিয়ান ও গোলকিপার এভারসনকে লাল কার্ড দেখান রেফারি ম্যাথিয়াস দেলগাদো কানদানকান। বাকি ২১ জনকে লাল কার্ড দেখান ম্যাচ শেষে। রেফারির ম্যাচ রিপোর্টে জানা যায়, মোট ২৩ খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানো হয়েছে।

ব্রাজিলে সিনিয়র পর্যায়ের ফুটবলে কোনো ম্যাচে এটা সর্বোচ্চ লাল কার্ড দেখার রেকর্ড। এর আগে ১৯৫৪ সালে রিও-সাও পাওলো টুর্নামেন্টে বোটাফোগো ও পর্তুগিজার মধ্যকার ম্যাচে ২২ জন লাল কার্ড দেখেন। ৭২ বছর আগের সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে ক্রুজেইরো-আতলেতিকো ম্যাচ।

এমন একটি ম্যাচের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এক ম্যাচেই যদি ২৩ জন লাল কার্ড দেখেন এবং সেটি যদি বিশ্ব রেকর্ড না হয় তাহলে বিশ্ব রেকর্ড কোনটি? অর্থাৎ এক ম্যাচে সর্বোচ্চ কতজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেছেন?

ব্রাজিল থেকে চোখ সরিয়ে এবার মনোযোগ দিন আর্জেন্টাইন ফুটবলে। কারণ, রেকর্ডটি আর্জেন্টাইন ফুটবলে এবং খুব বেশি দিন আগেরও কথা নয়, আর এই রেকর্ড জায়গা পেয়েছে গিনেস বইয়েও।

২০১১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনাইন ফুটবলে পঞ্চম বিভাগের ম্যাচে মুখোমুখি হয় আতলেতিকো ক্লেপোল ও ভিক্টোরিয়ানো অ্যারেনাস। এই ম্যাচে দুই দলের সব খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ মিলিয়ে মোট ৩৬ জন লাল কার্ড দেখেন। ২২ জন ছিলেন দুই দলের একাদশের খেলোয়াড় এবং বাকি ১৪ জন কোচিং স্টাফ ও বেঞ্চের খেলোয়াড় মিলিয়ে। সিনিয়র পর্যায়ে ফুটবলে এক ম্যাচে এটাই সর্বোচ্চ লাল কার্ড দেখার রেকর্ড।

আরও পড়ুন

কী ঘটেছিল সেদিন

সেদিন ছিল শনিবার। ভিক্টোরিয়ানোর বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল স্বাগতিক আতলেতিকো। ভিক্টোরিয়ানো দলের খেলোয়াড় রদ্রিগো সানচেজ আতলেতিকোর জোনাথন লেদেসমার ওপর চড়াও হওয়ার পর সংঘাতের সূচনা হয়।

দুই খেলোয়াড়ের এই ব্যক্তিগত সংঘাত দ্রুতই মাঠের ভেতর পূর্ণাঙ্গ মারামারিতে রূপ নেয়। দুই দলের মূল একাদশ, বদলি খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফরাও মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে রেফারি দামিয়ান রুবিনো ঘটনাটিকে ‘সাধারণ মারামারি’ হিসেবে ঘোষণা করে দুই দলের সব খেলোয়াড় এর সঙ্গে জড়িত বলে রিপোর্ট করেন এবং কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড় মিলিয়ে মোট ৩৬ জনকে লাল কার্ড দেখান।

২০১১ সালের সেই ম্যাচে মোট ৩৬ জন লাল কার্ড দেখেন
ভিডিও থেকে নেওয়া

ঘটনার তাৎক্ষণিক পরিণতি ছিল ভয়াবহ। আতলেতিকোর কোচ সের্হিও মিচেইলি রেফারির এই সিদ্ধান্তকে ‘বোকামি’ বলে আখ্যা দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বেশ কিছু খেলোয়াড় মারামারি থামাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। ভিক্টোরিয়ানো ক্লাবের সভাপতি ডমিনিগো সাগনাগা রেফারির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তিনি বিষয়টি থেকে ‘হাত ধুয়ে ফেলেছেন’ এবং খেলোয়াড়েরা যখন প্রায় একে অপরকে মেরে ফেলছিল, তখন তিনি লুকিয়ে ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী পরের ম্যাচের জন্য দুই দলই কার্যত খেলোয়াড়শূন্য হয়ে পড়েছিল।

আরও পড়ুন

ব্যতিক্রমী প্রতিরক্ষার মঞ্চ

ম্যাচের কয়েক দিন পরের ঘটনা। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সদর দপ্তর ভিয়ামন্ট স্ট্রিটে অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য দেখা যায়। ডিসিপ্লিনারি ট্রাইব্যুনালের সামনে সাক্ষ্য দিতে এএফএর কেন্দ্রীয় হলে অপেক্ষায় ছিলেন দুই দলের ৩০ জনের বেশি খেলোয়াড়।

ক্লাব দুটির যুক্তি ছিল, বড় ধরনের শাস্তি টুর্নামেন্টে তাদের ভবিষ্যৎ শেষ করে দেবে। ভিক্টোরিয়ানো অধিনায়ক রদ্রিগো সানচেজ দাবি করেন, ‘সতীর্থদের রক্ষা করতে’ তিনি মারামারিতে হস্তক্ষেপ করেন। আতলেতিকো সে ম্যাচের ফুটেজসহ একটি ডিভিডি উপস্থাপন করে ডিসিপ্লিনারি কমিটির সামনে।

রেফারি দামিয়ান রুবিনোর সিদ্ধান্ত যে পুরোপুরি সঠিক ছিল না, তার পক্ষে যুক্তি দিতে এই ডিভিডি ছিল তাদের শেষ আশা। কারণ, দুই ক্লাবের দাবি ছিল, রেফারি তাঁর প্রতিবেদনে আক্রমণকারী এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো পার্থক্য টানেননি।

সেই সময় আদালতের সূত্রগুলো জানিয়েছিলেন, এই ঘটনায় ‘কেউ পার পাবে না’ এবং বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড় নিয়ে নিজেদের পরবর্তী ম্যাচ খেলার সন্নিকটে ছিল দুই দল।

চূড়ান্ত রায়

আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম এল গ্রাফিকো জানিয়েছে, সেই সময়ের প্রযুক্তি এবং সাধারণ বিচারবুদ্ধিকে রেফারির প্রাথমিক ম্যাচ রিপোর্টের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ম্যাচের ভিডিও দেখার পর ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত নেন, ক্লাব দুটির যুক্তি ‘প্রতারণামূলক’ নয়। ঐতিহাসিক সে রায়ে, প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত ৩৬ খেলোয়াড়ের মধ্যে ৭ জনকে শাস্তি দেওয়া হয় এবং বাকি খেলোয়াড়দের রেহাই দেওয়া হয়, যেন ক্লাবগুলো বড় ক্ষতির মুখে না পড়ে।

সংঘাতের উৎস হিসেবে সবচেয়ে বড় শাস্তি পেয়েছিলেন রদ্রিগো সানচেজ। তাঁকে ৭ ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয়। শাস্তি পাওয়া বাকি ছয়জন হলেন ভিক্টোরিয়ানোর মাতিয়াস পারদো ও মাতিয়াস লাপোর্তে। আতলেতিকোর হয়ে শাস্তি পান নিকোলাস আরান্দা, আদ্রিয়ান কারদোজা ও অ্যালান কাস্ত্রো। সপ্তম খেলোয়াড়টি ভিক্টোরিয়ানোর ক্লদিও লেইভা। ম্যাচ চলাকালীন লাল কার্ড দেখেন তিনি।

আরও পড়ুন