নিঃশব্দে বিপদ মুছে ফেলা সিমন
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই স্পেন দলটা নিয়ে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। না, কোনো নেতিবাচক প্রশ্ন নয়।
এতই ইতিবাচক যে সেটা স্পেন দলের গভীরতার আভাস দিচ্ছিল এবং সেই প্রশ্নটা স্পেনের মাঝমাঠ নিয়ে নয়, আক্রমণভাগ নিয়ে তো নয়ই, এমনকি সেন্টারব্যাক জুটি নিয়েও নয়। প্রশ্নটা ছিল গোলরক্ষক নিয়ে। স্পেনের গোলবার সামলাবেন কে?
দাভিদ রায়া আর্সেনালে তখন সদ্য শেষ করেছেন শিরোপাজয়ী দুর্দান্ত মৌসুম। হোয়ান গার্সিয়া লা লিগায় অসাধারণ এক মৌসুম কাটিয়ে ইউরোপের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিভাদের একজন হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। দুজনেরই ছিল স্পেনের নাম্বার ওয়ান হওয়ার সংগত দাবি।
আর তাঁদের এই দাবিটা কত জোরালো, সেটা বুঝতেন বিলবাওয়ের গোলরক্ষক উনাই সিমনও। প্রতিদ্বন্দ্বীদের মান আর তাঁদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কথা তিনি খোলাখুলিই স্বীকার করেছেন। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, স্পেনের সামনে গোলকিপার নির্বাচন নিয়ে এক মধুর সমস্যা বুঝি!
কিন্তু দলটা নির্বাচনের দায়িত্ব যার, তাঁর মনে আসলে কোনো দ্বিধা ছিল না। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে কখনোই বাইরের এ সংশয়ে সুর মেলাননি। টুর্নামেন্টের আগে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান বলেছিলেন।
কারণ, স্পেন কোচের ভাষায়, তাঁর হাতে ‘বিশ্বের সেরা তিন গোলরক্ষক’। কিন্তু দুই দুর্দান্ত বিকল্প থাকা সত্ত্বেও দে লা ফুয়েন্তে কখনো ইঙ্গিত দেননি যে সিমনের জায়গা নিয়ে কোনো সংশয় আছে।
বরং বারবার বলেছেন, ২৯ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক শুধু আক্রমণ সামলান না, স্পেনের খেলার পরিচয় বহন করেন। খেলা গড়ে তোলেন। কোচের সেই বিশ্বাসের মূল্য কী দারুণভাবেই না দিলেন সিমন।
নিউ জার্সিতে গতকাল আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন বিশ্বকাপ জিতল। ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলটা এল ম্যাচের ১০৬ মিনিটে। আর তাতেই বিশ্বকাপ ট্রফির সঙ্গে সিমনের হাতে উঠল গোল্ডেন গ্লাভও। বিশ্বকাপে তাঁর দুর্দান্ত গোলকিপিংয়ের পুরস্কার।
সিমনের সাতটি ক্লিন শিট এক আসরে কোনো গোলরক্ষকের সর্বোচ্চ, যা নতুন রেকর্ডও। ৯১.৭ শতাংশ সেভের হার আসরের সেরা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গোল হজম করার আগে টানা ৬৪৯ মিনিট কোনো গোল না খেয়ে বিশ্বকাপ রেকর্ড গড়েছিলেন।
পুরো আসরে তাঁর দল এক্সপেক্টেড গোলের চেয়ে ০.৭ কম গোল হজম করেছে। অর্থাৎ যা হজম হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়েও কম। আট ম্যাচে স্পেন হজম করেছে একটিমাত্র গোল, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো শিরোপাজয়ী দলের সবচেয়ে কম গোল খাওয়ার রেকর্ড!
সংখ্যাগুলো বিস্ময় জাগায়। কিন্তু সংখ্যাগুলোও আসলে সিমনকে পুরোটা তুলে ধরতে পারছে না। প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে পূর্বাভাস বোঝা, সিমনের বড় গুণ এটাই। বিপদ তৈরি হওয়ার আগেই সেটা নষ্ট করে ফেলার ক্ষমতা তাঁর খেলাকে অন্য স্তরে নিয়ে গেছে।
স্পেনের খেলায় এই বিশ্বকাপে একটা অদ্ভুত দৃশ্য বারবার দেখা গেছে। নিজেদের গোলপোস্টের সামনে চাপ আমন্ত্রণ জানাচ্ছে তারা, ইচ্ছা করে। কারণ, তারা জানে, পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন, যিনি চাপকে ভয় পান না; বরং সেটাকে ব্যবহার করেন।
সিমনের পাস দেওয়ার সামর্থ্য স্পেনকে খেলার আরেকটা পথ তৈরি করে দেয়। একটিমাত্র পাসে নিরীহদর্শন পাস দিয়ে বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরি করার দূরদৃষ্টি আর কৌশল—দুটোই আছে তাঁর।
দে লা ফুয়েন্তে সিমনকে চেনেন বছরের পর বছর। স্পেনের যুব কাঠামোয় কোচিং করানোর পর সিনিয়র দলেও তাঁকে গড়ে তুলেছেন এই কোচ। একসঙ্গে তাঁরা জিতেছেন অনূর্ধ্ব-১৯ আর অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, উয়েফা নেশনস লিগ, ইউরো ২০২৪, আর সর্বশেষ বিশ্বকাপও।
এত দীর্ঘ সময় ধরে আর এত সাফল্যের সঙ্গে কোনো গোলরক্ষকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা খুব কম আন্তর্জাতিক কোচেরই আছে।
সিমনের ওপর দে লা ফুয়েন্তের আস্থা যে কখনো টলেনি, তার সবচেয়ে বড় কারণ বোধ হয় সবচেয়ে সহজ কারণটাই: সিমন তাঁর আস্থা টলার কোনো সুযোগই দেননি।
এই বিশ্বকাপে স্পেনের গল্পটা লেখা থাকবে মাঝমাঠের দারুণ সম্মোহনী খেলায়, রদ্রির গোল্ডেন বলে, কুকুরেয়ায় দৌড়ে, কুবারসির তারুণ্যে। কিন্তু সব গল্পের শুরু আসলে একেবারে পেছন থেকে, যেখানে একটা লোক দাঁড়িয়ে ছিলেন।
যাঁর কাজই ছিল বিপদ তৈরি হওয়ার অনেক আগে সেই বিপদ চেনা। তারপর নিঃশব্দে সেই বিপদ মুছে ফেলা, যেন কিছুই হয়নি। সেই লোকটা উনাই সিমন।