মেক্সিকান টাকোস আর আমেরিকান বার্গারের বিশ্বকাপ
জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক লেখক আহমদ ছফাকে বলেছিলেন, ‘যখন কোনো নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। ওই জায়গার মানুষ কী খায়। আর পড়ালেখা কী করে। কাঁচা বাজারে যাইবেন, কী খায় এইডা দেখনের লাইগ্যা। আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়াশোনা কী করে হেইডা জাননের লাইগ্যা।’
উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যাঁরা বিশ্বকাপ দেখতে যাবেন, তাঁদের বেশির ভাগই যে আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ পড়ে যাবেন না, সেটা নিশ্চিত। এমনকি বাংলাভাষী যাঁরা যাবেন, তাঁদের সবার হয়তো এই বই পড়াও থাকবে না৷ কিন্তু যাঁরা যাবেন, তাঁদের অনেকে বইটা না পড়েই সেসব দেশের স্থানীয় খাবারগুলো চেখে দেখবেন৷
নতুন কোনো জায়গায় গেলে এটা যেন এক অলিখিত নিয়ম। স্থানীয় খাবার, সংস্কৃতি ও চর্চার সঙ্গে পরিচিত হওয়াটাই যে দারুণ এক অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপ দেখতে আসা নানা ধর্ম, বর্ণ ও জাতির মানুষও স্বাভাবিকভাবে নিজেদের মতো করে সেই অভিজ্ঞতার অংশ হতে চাইবেন। তবে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে খাবারের স্বাদ চাখার আনন্দ তুলনাহীন।
মেক্সিকোর খাবার দিয়ে শুরু করলে প্রথমেই আসে টাকোস। সাধারণত ছোট রুটির (টর্টিলা) মাঝখানে মাংস, সবজি, সস এবং কখনো চিজ ভরে টাকোস তৈরি করা হয়। খুবই সহজ রেসিপি, তবে দুর্দান্ত স্বাদের খাবারটি বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয়।
টাকোসই অবশ্য মেক্সিকোর একমাত্র পরিচয় নয়। এনচিলাডা, কেসাডিলা কিংবা গুয়াকামোলির মতো খাবারগুলোতেও পাওয়া যায় মেক্সিকান রান্নার সেই স্বতন্ত্র ঝাল, টক আর মসলার অসাধারণ মিশেল। আলাদা করে বলতে হয় ‘পোজোল’র কথাও। মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী পোজোল একধরনের বিশেষ স্যুপ, যা সাধারণত ভুট্টা (হোমিনি), মাংস এবং সুগন্ধি মসলা দিয়ে তৈরি হয়। এর সঙ্গে মরিচ, রসুন ও নানা ধরনের হার্বস যোগ করা হয়। পাশাপাশি মেক্সিকান চকলেটের খ্যাতির কথা কে না জানে! মেক্সিকোর খাবারে আদিবাসী ঐতিহ্য ও স্প্যানিশ প্রভাব একসঙ্গে কাজ করেছে, ফলে প্রতিটি পদ যেন ইতিহাসের একটি ধারাকে বহন করে চলেছে। যে ধারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় অনেক গল্পও।
মেক্সিকান খাবারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সর্বজনীন উপস্থিতি। রাস্তার ধারের ছোট দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্টুরেন্ট—সবখানেই পাওয়া যায় একই ধরনের আন্তরিকতা ও স্বাদ। এক প্লেট টাকোস হাতে নিয়ে মাথা দোলাতে দোলাতে লাতিন সংগীত শোনার দৃশ্য যেন মেক্সিকোর জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। এখানে খাবার শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়; বরং এটি এক সামাজিক অভিজ্ঞতা, একধরনের উদ্যাপন। বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী ড্রিবলিং, পাসিং ও ফিনিশিংয়ের জাদু দেখতে দেখতে নিতে পারেন এসব খাবারের আশ্চর্য স্বাদ।
যুক্তরাষ্ট্র বহু ধর্ম, বর্ণ ও জাতির মানুষ নিয়ে গড়া এক দেশ। এখানকার খাবারেও আছে বহুজাতিক সংস্কৃতির ছোঁয়া। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের খাবারের প্রভাব রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খাবারে, যা তৈরি করেছে এক নতুন ধারাও। আর এই ধারার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতীক হলো বার্গার। নরম বান, ভেতরে রসালো মাংসের প্যাটি, চিজ, লেটুস আর সস—এই খাবার আজ বিশ্বব্যাপী ফাস্ট ফুড সংস্কৃতির সমার্থক হয়ে উঠেছে।
বার্গারের পাশাপাশি হট ডগ, ফ্রায়েড চিকেন কিংবা বারবিকিউ রিবস—সব কটিই আমেরিকান খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের খাবারের বৈশিষ্ট্য হলো এর উদ্ভাবনী শক্তি। এই অঞ্চলে একই খাবার নানা উপায়ে তৈরি হয়, যোগ হয় নতুন নতুন উপকরণ আর প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকে এর ধরনও। নিউইয়র্কের পিৎজা, টেক্সাসের বারবিকিউ বা ক্যালিফোর্নিয়ার ফিউশন কুইজিন দারুণ বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়
ভোজনরসিকদের সামনে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে খাওয়ার অভিজ্ঞতা মানেই একধরনের নিরীক্ষা। যেখানে প্রতিটি খাবারই হতে পারে নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ।
কানাডার খাবার যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ঘরানার এবং স্বাদেও অনন্য। এখানকার সবচেয়ে পরিচিত খাবার পুটিন। এটি মূলত ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের ওপর চিজ কার্ড আর গ্রেভি সসের মিশেল। দেখতে সাধারণ হলেও এর স্বাদ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এ ছাড়া ম্যাপল সিরাপ কানাডার খাবার টেবিলের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। এটি প্যানকেক থেকে শুরু করে নানা ধরনের খাবারে ব্যবহার করা হয়।
কানাডার ঠান্ডা আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক সম্পদ তাদের খাবারের ধরনে প্রভাব ফেলেছে, যেখানে সরলতা ও পুষ্টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কানাডার খাবারে ফরাসি ও ব্রিটিশ ঐতিহ্যের প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে কুইবেক অঞ্চলে ফরাসি ধাঁচের রান্না বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী খাদ্য সংস্কৃতির ছাপও রয়েছে। ফলে কানাডার খাবার একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী, তেমনি অন্যদিকে আধুনিকতার ছোঁয়াও রয়েছে।
এই তিন দেশের খাবারের মধ্যে পার্থক্য যেমন স্পষ্ট, তেমনি কিছু মিলও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তিন দেশেই স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতি অত্যন্ত জনপ্রিয়। মেক্সিকোর রাস্তার টাকোস, যুক্তরাষ্ট্রের ফুড ট্রাকের বার্গার বা হট ডগ, আর কানাডার ফাস্ট ফুড স্টল সহজেই মানুষকে নিজের দিকে টেনে নেয়। এই স্ট্রিট ফুডই অনেক সময় একটি দেশের প্রকৃত স্বাদকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে।
বিশ্বকাপ উপভোগ করতে যাওয়া ভোজনরসিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা একসঙ্গে যেন বর্ণিল এক রন্ধন মানচিত্র। যার প্রান্তে ছড়িয়ে আছে স্বাদের নতুন কোনো গল্প।
বিশ্বায়নের প্রভাবে এই তিন দেশের খাবার এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দেশের জনপ্রিয় খাবারগুলো এখন বিভিন্ন দেশে সহজলভ্য। তবে যে দেশের খাবার, সেখানে বসে স্বাদ গ্রহণের নিশ্চয় কোনো তুলনা হয় না। কারণ, সেখানে থাকে স্থানীয় উপকরণ, পরিবেশ আর মানুষের আবেগ, যা অন্য কোথাও পুরোপুরি পুনরুৎপাদন করা সম্ভব নয়। ফলে রেসিপি হয়তো নকল হতে পারে, কিন্তু আবেগ ও ভালোবাসার আবেশ কখনোই নয়।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার খাবার একসঙ্গে একটি অসাধারণ বৈচিত্র্যের জন্ম দেয়। তাই বিশ্বকাপ উপভোগ করতে যাওয়া ভোজনরসিকদের জন্য এই তিন দেশ একসঙ্গে যেন বর্ণিল এক রন্ধন মানচিত্র। যার প্রান্তে ছড়িয়ে আছে স্বাদের নতুন কোনো গল্প।
তবে এই গল্প শুধু খাবারেরও নয়। এটি একই সঙ্গে একটি জনপদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গল্পও বলে। মানুষ হিসেবে তারা কেমন, সেই ইঙ্গিতও
মেলে এই খাবার থেকে। আর কিংবদন্তি আবদুর রাজ্জাকের কথা তো অনুপ্রেরণা হিসেবেই রইলই। যা আমাদের বলে, কোনো জনপদকে জানতে হলে, তারা কী খায়, তা জানা জরুরি। বিশ্বকাপের এই সফরে তাই খাবারও হয়ে উঠতে পারে মানুষ ও সংস্কৃতিকে জানার এক অনন্য পথ।
লেখক: সহসম্পাদক, প্রথম আলো