আত্মঘাতী গোলের নতুন রেকর্ড, কেন এই বিশ্বকাপে এত বেশি হচ্ছে

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আত্মঘাতী গোল করেন মিসরের মোহামেদ হানিএএফপি

এই গোল কেউ করতে চায় না। কারণ, সেটা নিজ দলেরই বিপক্ষে যায়। বুঝতেই পারছেন, আত্মঘাতী গোলের কথা বলা হচ্ছে। এবার বিশ্বকাপে এমন গোল খুব বেশি হচ্ছে। এতই বেশি যে ভেঙে দিয়েছে এক আসরে অতীতের রেকর্ড!

ডালাসে গতকাল রাতে শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে মিসর–অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে আত্মঘাতী গোল করেন আফ্রিকার দলটির রাইটব্যাক মোহামেদ হানি। চলতি বিশ্বকাপে এটা ছিল ১৩তম আত্মঘাতী গোল। এই গোলেই ভেঙেছে বিশ্বকাপে এক আসরে সর্বোচ্চ আত্মঘাতী গোলের রেকর্ড।

কিন্তু নতুন এই রেকর্ড সেখানেই থেমে থাকেনি। পরে বাংলাদেশ সময় ভোরে মায়ামিতে আর্জেন্টিনা–কেপ ভার্দে ম্যাচেও দেখা গেল আত্মঘাতী গোল। আর্জেন্টিনার ৩–২ গোলের জয়ে এ ম্যাচের শেষ গোলটি আত্মঘাতী। অতিরিক্ত সময়ের ১১১ মিনিটে আত্মঘাতী গোলটি করেন কেপ ভার্দে ডিফেন্ডার দিনেই বোর্হেস।

বিশ্বকাপে এত দিন এক আসরে সর্বোচ্চ আত্মঘাতী গোলের রেকর্ড ছিল ২০১৮ আসরে। সেবার ১২টি আত্মঘাতী গোল দেখা গিয়েছিল। এবার শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে ভেঙে গেল আট বছর আগের আসরের সে রেকর্ড। সামনে এখনো শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল। আত্মঘাতী গোলের নতুন এ রেকর্ড কোন উচ্চতায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

তবে এরই মধ্যে একটি আলোচনাও উঠেছে। এবার বিশ্বকাপে কেন এত বেশি আত্মঘাতী গোল হচ্ছে? বিষয়টি খতিয়ে দেখা যাক।

সাধারণ যুক্তি, অতীতে ৩২ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বকাপ। এবারই প্রথমবারের ৪৮টি দল অংশ নিয়েছে বিশ্বকাপে। অর্থাৎ, ম্যাচসংখ্যা এবার স্বাভাবিকভাবেই আগের তুলনায় বেশি। যেমন ধরুন, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে মোট ৬৪ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এবার দল বাড়ায় মোট ১০৪টি ম্যাচ হবে। যেহেতু এবার ম্যাচসংখ্যা বেশি, তাই স্বাভাবিকভাবেই আত্মঘাতী গোলের ঝুঁকিও বেশি। এবার এখন পর্যন্ত মোট ৮৮টি ম্যাচে আত্মঘাতী গোলসংখ্যা ১৪টি।

কারিগরি ও কৌশলগত কিছু বিষয়ও আছে। টেলিভিশন ফুটেজের উন্নতি, ভিএআর রিপ্লে ও ক্যামেরাসংখ্যা বাড়ায় এখন আগের মতো গোল কে করেছেন, সেটা নিয়ে আর দ্বিধা থাকে না। সে কারণে কোনো ডিফেন্ডারের আত্মঘাতী গোল করে বেঁচে যাওয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি আক্রমণের ধরনে বদল আসার প্রভাবও পড়েছে আত্মঘাতী গোলে।

আগে সাধারণত বক্সের কোনা থেকে ক্রসের একটা প্রচলন ছিল, যেগুলো গোলপোস্ট থেকে কিছু দূরে বাঁক খেয়ে যেত। বিশেষ করে ডান পায়ের ফুটবলারদের ডান দিক থেকে দেওয়া ক্রস—যেমনটা করতেন ডেভিড বেকহ্যাম। এ ধরনের ক্রসে সাধারণত ডিফেন্ডারদের আত্মঘাতী গোল করার ঝুঁকি তেমন একটা থাকে না।

প্রথম আলো গ্রাফিকস

কিন্তু এখন দলগুলোর আক্রমণ অনেক বেশি গতিময়। খেলোয়াড়েরা এখন একদম বাইলাইন পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে বক্সের ভেতর আড়াআড়ি বল বাড়ান। ফলে ডিফেন্ডারদের বাধ্য হয়ে নিজেদের গোলপোস্টের দিকে তীব্র গতিতে ছুটে যেতে হয়। বলগুলো এমনভাবে বক্সে ঢোকে যে অনেক সময় ডিফেন্ডারদের গায়ে লেগে কিংবা হেড করতে গিয়ে তাঁরা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিজেদের জালে বল জড়িয়ে ফেলেন। বেলজিয়াম ও মিসরের বিপক্ষে হানির দুটি আত্মঘাতী গোলই প্রায় এমনই।

আরও পড়ুন

তবে এবার বিশ্বকাপে স্রেফ ভুল করে আত্মঘাতী গোলের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। গ্রুপ পর্বে প্যারাগুয়ে এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পাওয়া দুটি আত্মঘাতী গোলই এমন। প্যারাগুয়ের বোবাদিলার গায়ে লেগে বল জালে জড়ায়, যেটা তিনি আরেকটু তৎপর থাকলে হয়তো এড়াতে পারতেন। অস্ট্রেলিয়ার বার্হেসও আরেকটু তৎপর থাকলে পা সরিয়ে নিতে পারতেন এবং আত্মঘাতী গোলটি হয়তো হতো না। তবে এটাও সত্য, আগের তুলনায় বল নিয়ন্ত্রণে এখন ডিফেন্ডারদের দক্ষতা অনেক বেশি। তবু আসলে মুহূর্তের মহিমায় তিল পরিমাণ ভুলেও আত্মঘাতী গোল হয়ে যায়।

প্যারাগুয়ের বোবাদিলা আত্মঘাতী গোল করেন
এএফপি

ডিফেন্ডিংয়ের ধরনও আত্মঘাতী গোলে ভূমিকা রাখছে। ‘লো ব্লক’ বা রক্ষণাত্মক কৌশলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও আত্মঘাতী গোল বাড়ার কারণ। শক্তিতে একটু পিছিয়ে থাকা দলগুলো সাধারণত বড় দলের বিপক্ষে এ কৌশলে খেলে। নিজেদের গোলপোস্টের খুব কাছাকাছি থেকে রক্ষণ সামলানোর ঝুঁকিও তাতে বাড়ে। কারণ, এমন রক্ষণকৌশলে বক্সে জটলা তৈরি হয় এবং প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসা ক্রস যে কারও পায়ে লেগেই জালে জড়ানোর আশঙ্কা বাড়ে।

গ্রুপ পর্বে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ইরাক ফরোয়ার্ড আয়মান হুসেইন নিচে নেমে রক্ষণভাগকে সাহায্য করতে গিয়ে এভাবে বিপত্তি বাধিয়ে আত্মঘাতী গোল করে বসেন।

আরও পড়ুন