রোমাঞ্চের কথা যখন এলই, তখন ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের মতো রোমাঞ্চ কিন্তু খুব বেশি আসেনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুতে বিশ্বকাপ জয় করা আর্জেন্টিনা মিলানের সান সিরো স্টেডিয়ামে ক্যামেরুনের সঙ্গে খেলেছিল ১৯৯০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ। ম্যারাডোনা, বুরুচাগা, ক্যানিজিয়াদের আর্জেন্টিনা আফ্রিকার দেশটিকে কয় গোল উড়িয়ে দেবে, সেই হিসাবই কষছিল সবাই।

কিন্তু ম্যাচ শুরু হতেই যে দৃশ্যপট পুরোপুরি ভিন্ন। আর্জেন্টিনাকে মরণ কামড় দিয়ে ধরা আফ্রিকার অদম্য সিংহরা সেদিন শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই মাঠ ছেড়েছিল। দুই লাল কার্ডে ৯ জনের দলে পরিণত হয়েও ক্যামেরুন ওমাম বিইকের গোলে ১-০ গোলে হারিয়েছিল ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর উদ্বোধনী ম্যাচ ’৯০ বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছিল কি না, সে বিতর্ক হতেই পারে। তবে মিলানের সেই উদ্বোধনী ম্যাচের সঙ্গে প্রবল বিক্রমে লড়তে নামবে ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ আয়োজনের উদ্বোধনী ম্যাচটি। জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স সেদিন সিউলে ১-০ গোলে ধরাশায়ী হয়েছিল আফ্রিকার আরেক দল সেনেগালের বিপক্ষে। পাপা বোউবা দিউপ ছিলেন সেই রোমাঞ্চের নায়ক।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাসে এ দুটি ম্যাচ নিঃসন্দেহেই আলাদা জায়গা নিয়েই থাকবে। তথাকথিত দুর্বল, নবাগত দলের বিপক্ষে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হার, তা–ও উদ্বোধনী ম্যাচেই, বিশ্বকাপের এমন নাটকীয় শুরু তো খুব বেশি হয়নি। ১৯৮২ বিশ্বকাপেও ’৭৮ বিশ্বকাপের শিরোপাজয়ী আর্জেন্টিনা হেরে গিয়েছিল শুরুর দিনই। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে যাওয়া সেই ম্যাচটিও ছিল দর্শকদের জন্য যথেষ্ট রোমাঞ্চেরই।

চ্যাম্পিয়ন দলের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলার একটা রীতি অনেক দিন ধরেই ছিল। ১৯৭৪ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নরা খেলেছে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে। ২০০৬ সালের পর সেই রীতিতে বদল আনা হয়।

১৯৭৪ সালের আগে অবশ্য বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ নিয়ে বাঁধাধরা কোনো নিয়ম ছিল না। চ্যাম্পিয়ন দলের বদলে উদ্বোধনী ম্যাচে জায়গা করে নেয় স্বাগতিক দল। ২০০৬ সালে জার্মানি স্বাগতিক হিসেবে কোস্টারিকার বিপক্ষে দারুণ একটা ম্যাচ উপহার দিয়েছিল, সেটি আগেই বলা হয়েছে। তবে ২০১৪ বিশ্বকাপে স্বাগতিক ব্রাজিল অঘটনের শিকার হলেও হতে পারত।

ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মার্সেলোর আত্মঘাতী গোলে পিছিয়ে পড়লেও ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত জিতেছিল নেইমারের জোড়া গোলে ৩-১ ব্যবধানে। চার বছর আগে অবশ্য (২০১০) দক্ষিণ আফ্রিকা-মেক্সিকো ম্যাচটি উদ্বোধনী ম্যাচের আগ্রহ ছাড়া আর বিশেষ কিছু দিতে পারেনি।

উদ্বোধনী ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে নেমে দুবার হেরেছে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিল ১৯৭৪ সালে যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে করেছিল গোলশূন্য ড্র। তবে ১৯৯৮ সালে ’৯৪-এর বিশ্বকাপজয়ী হিসেবে খেলতে নেমে স্কটল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিল।

চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের বিশ্বকাপে খেলতে নেমে জয় না পাওয়া দলের মধ্যে আছে ১৯৭৮ সালে পশ্চিম জার্মানি ও ও ১৯৮৬ সালে ইতালি। ১৯৯০ বিশ্বকাপজয়ী জার্মানি ১৯৯৪ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে বলিভিয়াকে হারিয়েছিল ১-০ গোলে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত বিশ্বকাপের প্রতিটি উদ্বোধনী ম্যাচই উপহার দিয়েছিল নিষ্প্রভ ড্র।

১৯৮২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-বেলজিয়াম, ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনা-ক্যামেরুন ম্যাচ, ২০০২ সালে ফ্রান্স-সেনেগাল ম্যাচ যদি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা তিন রোমাঞ্চের উদ্বোধনী ম্যাচ হয়, তাহলে ২০০৬ বিশ্বকাপে জার্মানি-কোস্টারিকা ম্যাচটি বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার দিনে সবচেয়ে বেশি গোল হওয়া ম্যাচের অন্যতম।

এর আগে ১৯৩৪ বিশ্বকাপের শুরুর দিন হওয়া ‘অন্যতম’ ম্যাচে জার্মানি ৫-২ গোলে হারিয়েছিল বেলজিয়ামকে। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের শুরুর দিন সবচেয়ে বেশি গোল হওয়া ম্যাচও হয়েছিল ১৯৩৪ সালেই। সেবার যুক্তরাষ্ট্রকে ৭-১ গোলে হারিয়েছিল ইতালি।

১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত শুধু ১৯৩৮ সাল বাদ দিয়ে প্রতিবারই বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল একাধিক ম্যাচ। বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম ‘একপেশে’ উদ্বোধনী ম্যাচে চার বছর আগে (২০১৮) রাশিয়া ৫-০ গোলে হারিয়েছিল সৌদি আরবকে।

কাতার-ইকুয়েডর ম্যাচ আজ রাতেই স্থান করে নেবে ইতিহাসে। সেটি নাটকীয়তা আর উত্তেজনার ইতিহাস গড়ুক, ফুটবলপ্রেমীদের চাওয়া এটিই। রোমাঞ্চকর ইতিহাসের সাক্ষী হওয়াটাও যে বিশেষ কিছুই।