হাঁটতে পারতেন না, কেঁদেছেন কত রাত—সেই বিশ্বনাথের চোখে এখন সাফের স্বপ্ন

মাঠে ফেরার লড়াই চলছে বিশ্বনাথ ঘোষেরবাফুফে

কখনো কখনো জীবনে এমন সুযোগ আসে, যা হাতছাড়া করলে আফসোস করতে হয় অনেক দিন। বিশ্বনাথ ঘোষের কাছে এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ তেমনই এক সুযোগ। ২২ বছরের শিরোপাখরা ঘোচানোর সুযোগ। নিজেদের মাঠে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পাওয়ার সুযোগ।

আগামী ৫ নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের দলে আছেন হামজা চৌধুরী, শমিত শোমের মতো ফুটবলার। ঘরের মাঠে খেলা। সব মিলিয়ে এবার শিরোপা জয়ের দারুণ এক সম্ভাবনা দেখছেন বাংলাদেশের ডিফেন্ডার বিশ্বনাথ ঘোষ। তাঁর কণ্ঠে দৃঢ় প্রত্যয়, ‘এমন সুযোগ আর আসবে না।’

২০০৩ সালে সর্বশেষ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল বাংলাদেশ। এরপর কেটে গেছে দুই দশকের বেশি সময়। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে চান বিশ্বনাথ, ‘নিজেদের মাঠে খেলা। তা ছাড়া এখন আমাদের দলে বড় বড় প্রোফাইলের খেলোয়াড়ও আছেন। মূল লক্ষ্য ট্রফি জেতা। কীভাবে ট্রফিটা দেশে রাখা যায়, সেটাই সবাইকে ভাবতে হবে।’

তবে দেশের ফুটবলকে নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখলেও বিশ্বনাথ নিজেই এখন অনিশ্চয়তায়। সাফে তাঁর খেলা হবে কি না, এখনো নিশ্চিত নয়। চোটের সঙ্গে লড়াই করে আবারও জাতীয় দলে ফেরার অপেক্ষায় বাংলাদেশের এই রাইটব্যাক।

আসিয়ান কাপের ক্যাম্পে ছিলেন বিশ্বনাথ। কিন্তু দল ঘোষণার ঠিক আগে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে ছিটকে যান
ফাইল ছবি

গত সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত আসিয়ান কাপের ক্যাম্পে ছিলেন বিশ্বনাথ। কিন্তু দল ঘোষণার ঠিক আগে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে ছিটকে যান। এখন চলছে তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার শেষ ধাপ।

২৫ অক্টোবর শুরু হতে যাওয়া সাফের ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার আশা করছেন। তাঁর কথা, ‘নিজেকে ফিট করার চেষ্টাটা চালিয়ে যাচ্ছি। বাকিটা সৃষ্টিকর্তার হাতে। আমাকে যদি জাতীয় দল থেকে ডাকে, ক্লাব ম্যানেজমেন্ট যদি ছাড়ে এবং তারা যদি মনে করে আমি খেলার উপযুক্ত, তাহলে অবশ্যই ভালো কিছু করার চেষ্টা করব।’

সাফের আগে অবশ্য বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। আসিয়ান কাপে তিন ম্যাচের সব কটিতেই হেরেছে টমাস ডুলির দল। প্রতিপক্ষের জালে মাত্র ২ গোল দিয়ে হজম করেছে ১৩টি।

এমন পারফরম্যান্স যে সাফের আগে বড় দুশ্চিন্তার কারণ, সেটি অস্বীকার করছেন না বিশ্বনাথও, ‘আমরা খুবই বাজে খেলেছি। এর দায় আমাদেরই নিতে হবে। সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টটা খুবই খারাপ গেছে, বিশেষ করে শেষ ম্যাচটা।’

আসিয়ান কাপে বিশ্বনাথকে নিয়ে অবশ্য ভিন্ন পরিকল্পনাও ছিল কোচ ডুলির। রক্ষণভাগের পাশাপাশি আক্রমণেও তাঁকে কাজে লাগানোর কথা ভেবেছিলেন বাংলাদেশ কোচ। কিন্তু বিশ্বনাথের পছন্দ নিজের চেনা জায়গা, ‘আমার স্বাভাবিক পজিশন ডিফেন্ডার। কোনো ম্যাচে হয়তো ভালো খেলেছি, অ্যাসিস্ট করেছি বা ভালো কিছু মুভমেন্ট করেছি, যাতে সতীর্থরা উপকৃত হয়েছে। কিন্তু এক ম্যাচে ভালো করেছি বলে অন্য পজিশনে পরের ম্যাচেও ভালো করতে পারব, তার নিশ্চয়তা দিতে পারি না।’

নতুন চোট কাটিয়ে আবারও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন বিশ্বনাথ (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)
ফাইল ছবি

চোটের সঙ্গে বিশ্বনাথের লড়াই অবশ্য নতুন নয়। তাঁর ক্যারিয়ারে এমন একটা সময়ও এসেছে, যখন ফুটবলে আর ফিরতে পারবেন কি না, সেই সংশয়ই পেয়ে বসেছিল তাঁকে।

২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভুটানের বিপক্ষে ফিফা প্রীতি ম্যাচে হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন বিশ্বনাথ। সেই চোট এতটাই গুরুতর ছিল যে অস্ত্রোপচার করাতে হয়। মাঠের বাইরে থাকতে হয় প্রায় দেড় বছর।

সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা এখনো ভুলতে পারেননি বিশ্বনাথ। নতুন করে চোটে পড়লেই পুরোনো আতঙ্ক ফিরে আসে। মনে পড়ে হাসপাতালের বিছানায় কাটানো দিনগুলো, অসহায় রাতগুলোর কথা, ‘খুব বাজে একটা সময় পার করেছি। এখন চোটে পড়লে সেই দিনগুলো মনে পড়ে। ভয় লাগে আবার তেমন কিছু হলো না তো। অস্ত্রোপচারের পর হাঁটতেই পারতাম না। শুয়ে শুয়ে খেলা দেখতাম। এমন অনেক রাত ছিল শুধু কেঁদেছি। মনে হতো আর বুঝি ফুটবল খেলা হবে না!’

সেই বিশ্বনাথ আবার মাঠে ফিরেছেন। আবারও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। তবে এবার তাঁর ব্যক্তিগত স্বপ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে দেশের ফুটবলের স্বপ্ন।