আধুনিক যুগে ফুটবলের নিয়মকানুন প্রথম লিপিবদ্ধ হয় ১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডে। ধীরে ধীরে খেলাটা শ্রমিকশ্রেণির মধ্যেও ভীষণ জনপ্রিয় হয়, তাদের কল্যাণে ছড়ায় গোটা দুনিয়ায়।

ফরাসিরা ১৯০৪ সালে প্যারিসে ফিফা গঠন করে প্রথম সভার আয়োজন করে। সংগঠনটার তখন না ছিল টাকাপয়সা, না ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা, কিন্তু প্রথম থেকেই তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল বিশ্ব পর্যায়ের একটা টুর্নামেন্ট আয়োজন।

সে সময় ফুটবল–বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট ছিল অলিম্পিক গেমস। ফিফা বুঝতে পারে যে ফুটবল এই গেমসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। আর তাই ১৯২০ সালের অলিম্পিক গেমস উপলক্ষে এন্টওয়ার্পের কংগ্রেসে প্রথম বিশ্বকাপের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর চার বছর পর প্যারিস অলিম্পিকে আরও জোর দিয়ে আলোচনাটা ওঠে।

বিশ্বকাপের আবিষ্কারক দুজন ফরাসি—জুলে রিমে ও হেনরি দেলাউনে। সভাপতি জুলে রিমে ছিলেন রোমান্টিক, কূটনীতিবিদ, পরিকল্পনাকারী আর সেক্রেটারি দেলাউনে কর্মবীর, উদ্যমী, স্বপ্নদ্রষ্টা।

ফুটবল তত দিনে বৈশ্বিক খেলা হয়ে উঠেছে, উরুগুয়ে তার বড় প্রমাণ।

ইউরোপিয়ানদের কাছে অচেনা, সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরের মাত্র ২০ লাখ লোকের এক দেশ।  গরিব, কৃষ্ণাঙ্গ, পৃথিবীর প্রথম সুপারস্টার আন্দ্রাদের উরুগুয়ে পরের অলিম্পিকেও  শিরোপা জেতে। আর নেদারল্যান্ডসের সেই আসরে উরুগুয়ের সবচেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আর্জেন্টিনা, তাদের প্রতিবেশী দেশ।

উরুগুয়ে ১৯৩০ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্ন দেখছিল। উল, চামড়া আর গরুর মাংসশিল্পের দারুণ রমরমা অবস্থার কারণে উরুগুয়ের কোষাগারে তখন বিপুল পরিমাণ টাকা জমেছে। প্রেসিডেন্ট অরদোনেজের শাসনামলে কৃষিপণ্য রপ্তানির সেই লাভের টাকা দেশের প্রগতিশীল রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শহরের সমৃদ্ধির পেছনে ব্যয় করা হয়।

একে তো টাকা আছে; দ্বিতীয়ত, ফুটবলের সাফল্যে উদ্দীপ্ত দেশটার ১৯৩০ সালে সংবিধানের  শত বছর পূর্তি হবে। তা উদ্‌যাপন করতে উরুগুয়ে ফিফাকে প্রস্তাব দেয় সব খরচ বহন ও নতুন স্টেডিয়াম গড়ার। এরপর ফিফার বার্সেলোনা কংগ্রেসে জুলে রিমে উরুগুয়েকে প্রথম বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ এবং একটি সোনার ট্রফি বানানোর ঘোষণা দেন। ‘বিজয়ের দেবী’ নামে পরিচিত এই অনিন্দ্যসুন্দর ট্রফিটার নাম বদলে পরে রাখা হয় জুলে রিমে ট্রফি আর এর নির্মাতা ছিলেন ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফলো।

১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে ইউরোপের দলগুলোর সঙ্গে অংশ নেয় দক্ষিণ আমেরিকার সাতটি দেশ—আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, বলিভিয়া, চিলি, প্যারাগুয়ে, পেরু ও স্বাগতিক উরুগুয়ে। এত বেশি লাতিন দেশ আর কোনো বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি। উত্তর আমেরিকা থেকে যোগ দেয় মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র।

এই ১৩ দল নিয়েই বিশ্বকাপ শুরু হয়। আয়োজকেরা ইউরোপের দেশগুলোর কম উপস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ছিল। তবে সবাই বিশ্বাস করতেন, সেরা ফুটবলটা উরুগুয়েই খেলে। ইউরোপে হওয়া আগের দুই অলিম্পিক আসরই তার প্রমাণ।

এস্তাদিও পাকিতোসে ৪ হাজার ৪৪৪ জন দর্শকের সামনে, ১৩ জুলাই রোববার, বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে খেলা শুরু করে গ্রুপ ‘এ’তে থাকা দুই দল ফ্রান্স আর মেক্সিকো। খেলার ১৯ মিনিটে ইতিহাস গড়েন লুসিয়েন লরেন্ত। বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা!

তবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আবার মাঠে নামতে হয় ফরাসিদের। প্রতিপক্ষ আর্জেন্টাইনরা সেদিন প্রচণ্ড ফিজিক্যাল ফুটবল খেলে। বিশেষত অধিনায়ক লুইস মন্টি। তাঁর লাথিতে গোড়ালির হাল খারাপ হয়ে যায় লরেন্তের, হারে ইউরোপের দলটি। তবে আর্জেন্টিনা এ জন্য ধন্যবাদ দিতে পারে ব্রাজিলীয় রেফারি গিলবার্তো রেগোকে। গোল শোধে মরিয়া ফরাসিদের হতাশ করে ৮৪ মিনিটেই তিনি খেলার শেষ বাঁশি বাজিয়ে দেন। ফরাসিদের তীব্র প্রতিবাদে আবার খেলা শুরু হয়, কিন্তু তাল হারানো দলটি আর গোল পায়নি।

আর্জেন্টিনার পরের ম্যাচ ছিল মেক্সিকোর বিরুদ্ধে। মূল স্ট্রাইকার ম্যানুয়েল ফেরেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা দিতে দেশে গেলে সে সুযোগে দলে আসা তরুণ গুইলার্মে স্টাবিলে হ্যাটট্রিক করে বসেন। শেষমেশ ৮ গোল দিয়ে হন টুর্নামেন্ট–সেরাও।

গ্রুপ ‘বি’তে দলই ছিল তিনটি। বেশ কিছু ভালো খেলোয়াড় থাকলেও দল হিসেবে গড়ে উঠতে পারার ব্যর্থতায় যুগোস্লাভিয়ার কাছে ২-১ গোলে হারে ব্রাজিল। মনে রাখা জরুরি, তখনো ব্রাজিল দলে কালো আর ‘মুলাটো’ খেলোয়াড়েরা ব্রাত্য।

উরুগুয়ে গ্রুপ পর্যায়ে কোনোমতে দুটো ম্যাচ জিতলেও সেমিফাইনলে যুগোস্লাভিয়াকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয়। আজকের দিনে আশ্চর্য শোনালেও যুক্তরাষ্ট্রকে কিন্তু অনেকেই ফেবারিট মনে করেছিলেন সেই টুর্নামেন্টে। তবে ‘ডি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দলটি সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ৬-১ গোলে হারে।

ফাইনাল

ফাইনালের প্রতিপক্ষ দুই প্রতিবেশী। এ লড়াই নিয়ে ভর করে উত্তেজনা। সীমান্ত এলাকায় জনস্রোত ঠেকানোর কঠিন পরীক্ষা দিতে হয় দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের।

শক্তপোক্ত মন্টি, যিনি মাঠে অন্যদের চেয়ে দ্বিগুণ জায়গা দখলে রাখতে পারতেন বলে ডাবল আঙ্কা (প্রস্থ) বলে পরিচিত ছিলেন, তিনিও জানালেন, দুই পক্ষ থেকেই মৃত্যুর পরোয়ানা পেয়েছেন। স্বদেশিরা জানিয়েছেন খেলায় হারলে জান নিয়ে আর্জেন্টিনায় ফিরতে পারবেন না আর উরুগুয়ের লোকজন হুমকি দিয়েছে খেলায় জিতলে সেই দেশেই তাঁকে পুঁতে রেখে দেবে।

আয়োজকদের অনুরোধে অবশ্য মন্টি শেষ পর্যন্ত মাঠে নামেন, যেমনটা করেন রেফারি ল্যাংগুনেস। মাঠে কানায়–কানায় পূর্ণ উন্মত্ত দর্শকের সামনে (মাঠের বাইরে অন্তত দেড় লাখ লোক টিকিট না পেয়ে হাপিত্যেশ করছিলেন) বেলা ২টা ১৫ মিনিটে  তিনি খেলা শুরুর বাঁশি বাজান। ল্যাংগুনেস কিন্তু জানতেন, উরুগুয়ে সরকার তাঁর ও তাঁর সহকারী এবং পরিবারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি বন্দরে একটা নৌকাও প্রস্তুত রেখেছিল। যেন শেষ বাঁশি বাজার পরপরই ওনারা নিরাপদে কোথাও চলে যেতে পারেন।

বিপুল পুলিশি প্রহরায় দুই দল মাঠে ঢোকার পর প্রথম ঝামেলা বাধে, কোন বল দিয়ে খেলা হবে। শেষতক সিদ্ধান্ত হয় প্রথমার্ধ হবে আর্জেন্টিনার বলে আর দ্বিতীয়ার্ধ স্বাগতিকদের বল দিয়ে, যা ছিল আকারে সামান্য বড়।

খেলার ১২ মিনিটের মাথাতেই উরুগুয়ের রাইট উইঙ্গার পাবলো ডোরাডো প্রথম গোল করেন, তবে আট মিনিট পরই ফেরেইরার থ্রু বল থেকে পুয়েসেল আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান। এরপর স্ট্যাবিলের গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। সমতায় ফেরান উরুগুয়ের সিয়া।

৫৮ মিনিটে সিয়ার গোলের ১০ মিনিট পর উরুগুয়ের তরুণ লেফট উইঙ্গার সান্তোস ইরাতে দলকে প্রথমবারে মতো এগিয়ে নেন আর খেলা শেষের কয়েক মুহূর্ত আগে কাস্ত্রোর গোলে উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা স্টেডিয়াম। বিপুল উত্তেজনা থাকলেও খেলাটা পরিচ্ছন্ন ও গতিশীল হয়, ইতালীয় সাংবাদিক বেরেরা মন্তব্য করেন, দারুণ কল্পনাশক্তি আর শৈলীর সঙ্গে খেললেও আর্জেন্টিনা পেরে ওঠেনি (৪-২) টেকনিক্যালি শক্তিশালী উরুগুয়ের সঙ্গে।

হতাশ, বিষণ্ন মন্টিকে দেখা যায় ক্লান্তি আর বিষাদে মাঠ ছাড়তে। তবে মন্টি জানতেন না, চার বছর পর আরেক দেশের হয়ে বিশ্বকাপটা ঠিকই জিতে নেবেন। কিন্তু ৮২ বছর আয়ু পাওয়া এই আর্জেন্টাইন কি সেদিনের দুঃখ ভুলতে পেরেছিলেন?

আর্জেন্টাইনরা পারেননি, তা নিশ্চিত। কারণ, পরদিন মন্টেভিডিওতে জাতীয় উৎসব আর বর্ণিল আনন্দের সঙ্গে চলে সীমাহীন উল্লাস। অন্যদিকে নদীর বুয়েনস এইরেসে নেমে আসে কবরের নীরবতা । সেখানকার উরুগুয়ে কনস্যুলেটেও ভাঙচুর চালানো হয়।

মন্টেভিডিওতে জাতীয় বীরেরা ফুলেল সংবর্ধনা পাচ্ছিলেন আর সংবাদমাধ্যমে তাঁদের স্তুতি হচ্ছিল দেবতার আসনে বসিয়ে। আর আর্জেন্টাইনদের জন্য বরাদ্দ ছিল গালমন্দ, খিস্তিখেউড় আর হতাশার তীব্র অন্ধকার।

এ–ই তো জীবন, আর ফুটবল তো জীবনেরই গল্প বলে, তা–ই নয়?