প্রবাসীদের ভরসায় ‘ফাঁপা আশা’: আসিয়ান কাপ কি আমাদের আয়না দেখাল

আসিয়ান কাপে নিজেদের শেষ ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার সামনে দাঁড়াতেই পারেনি বাংলাদেশবাফুফে

১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ার মারদেকা কাপে হংকংয়ের কাছে বাংলাদেশের ৯-১ গোলে হারের পর এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছিল। বাংলাদেশের একমাত্র গোলটি যিনি করেছিলেন, সেই তরুণ কাজী সালাহউদ্দিনের হোটেল রুমের দরজায় কড়া বাজল রাতে। কক্ষ খুলে অবাক সালাহউদ্দিন। হংকংয়ের ক্যারোলিন হিল ক্লাবের কর্মকর্তারা তাঁকে তাঁদের দলে খেলার প্রস্তাব নিয়ে হাজির। পরে সালাহউদ্দিন ক্যারোলিন হিল ক্লাবেই খেলেছেন।

৫১ বছর আগে হংকং বাংলাদেশকে ৯ গোলের প্রথম দুঃস্মৃতি উপহার দিয়েছিল। তখন বাংলাদেশ জাতীয় দলের বয়স মাত্র বছর দুয়েক। বলা যায় শিক্ষানবিশ এক দল, ৯ গোল তারা খেতেই পারে। এরপর ১৯৭৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও ১৯৮২ সালে ইরান দিয়েছে ৯ গোল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশ আবার ৯ গোল খেল ৪৪ বছর পর। গতকাল ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯–২ গোলে হেরে শেষ হলো বাংলাদেশের আসিয়ান কাপ অভিযান।

ইন্দোনেশিয়ার স্ট্রাইকার মিচেল বেকার বাংলাদেশের জালে একাই দিয়েছেন ৫ গোল। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএল লিগ টুর ক্লাব ভার্মট গ্রিন এফসির ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার এই ১৯ বছরের তরুণের সামনে বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা, বিশেষ করে তারিক কাজী, খাবি খেয়েছেন। বাংলাদেশের ফুটবলারদের শারীরিক ও স্কিল সামর্থ্য কম। টেকনিক্যাল দক্ষতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার মধ্যে বিশাল পার্থক্য ছিল। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে রক্ষণভাগ পুরো ভেঙে পড়েছিল।

গোলকিপার মেহেদী হাসান দু-তিনটি ভালো সেভ করলেও পোস্টের নিচে ছিলেন নড়বড়ে। তাঁর সামনে রক্ষণ কালবৈশাখীর মুখে খড়ের ছাউনির মতো নিমেষেই উড়ে গেছে। উইং দিয়ে ইন্দোনেশিয়া যখনই গতি বাড়িয়েছে, বাংলাদেশের রক্ষণ দিশাহারা পথিকের মতো খেই হারিয়েছে। ফাইনাল থার্ডে তাদের দ্রুত পাসিং ও ক্ষিপ্র প্রেসিংয়ের সামনে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ যেন ছিল তাসের ঘর। মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত আক্রমণ ঠেকানো এবং গোলের সুযোগ তৈরি—সব জায়গাতেই দুর্বলতা ছিল স্পষ্ট।

কে কী বলছেন

বাংলাদেশের ফুটবলের বর্তমান দুর্দশার অন্যতম কারণ পরিকল্পনার অভাব। যাঁরা দায়িত্বে আছেন তাঁদের অবহেলা দেখছি আমি। মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনের প্রস্তুতি নিয়ে বড় টুর্নামেন্টে খেলতে যাওয়ার ফলই মাঠে দেখা গেছে। ফিজিক্যাল ফিটনেস, মনোযোগ ও দলীয় প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। অন্য দলগুলো যেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে, বাংলাদেশ সেখানে অপ্রস্তুত ছিল। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে ফুটবল ফেডারেশনকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে অন্তত ১০ বছরের লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে।
আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু , সাবেক ফরোয়ার্ড

তা ছাড়া টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়ের পর দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় সাদ উদ্দিন ও জুনিয়র সোহেল রানার কোনো এক নাইট ক্লাবে যাওয়ার ছবি ছড়িয়ে পড়লে দলে শৃঙ্খলা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

কোচ টমাস ডুলির কাছে আসিয়ান কাপ অনেকটা শিক্ষাসফর
বাফুফে

আসিয়ানের তিন প্রতিপক্ষই এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশের হার স্বাভাবিকই। কিন্তু মালয়েশিয়ার সঙ্গে ৩-০, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে ১-০, এরপর ইন্দোনেশিয়া ম্যাচে ৯-২ স্কোরলাইনের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ নিজেরাও বিব্রত হবে। কোচ টমাস ডুলি আসিয়ান কাপকে তাঁর দলের জন্য অনেকটা শিক্ষাসফর হিসেবে বলে আসছিলেন। আবার অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া দু-একটি ম্যাচ জয়ের আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেছিলেন। কোচ আর অধিনায়কের কথার মধ্যে বৈপরীত্য দেখা গেছে। তার ওপর প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ডুলি ঠিক কী ফুটবল খেলতে চেয়েছেন, তা বোঝা ছিল দুঃসাধ্য। বাজে ফুটবল খেলেই টুর্নামেন্ট শুরু করে বাংলাদেশ।

শেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ যখন শক্তিশালী ইন্দোনেশিয়া, ড্রর আশাও ছিল বাড়াবাড়ি। এমন ম্যাচে কিনা কোচ ডুলি ‘ওপেন’ ফুটবলেই গিয়েছেন। প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে কোথাও হয়তো পুরো ধারণা ছিল না দলের। ভালো হতো হয়তো কোচ রক্ষণের ব্লক তৈরির চেষ্টা করলে; কিন্তু সেটা তৈরি করতে চেয়েছেন বলে মনে হয়নি। শ্রাবণের বৃষ্টির মতোই গোল খেয়েছে বাংলাদেশ। এ জন্য প্রস্তুতি–ঘাটতির কথা বলবেন? সপ্তাহ তিনেক অনুশীলন তো করেছে। সবাইকে নিয়ে করতে পারেনি হয়তো, এটা একটা অজুহাত হতে পারে।

ডুলি এসেছেন কয়েক মাস হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কী বলছে, সবকিছুর উত্তর দেন তিনি। এগুলো নিয়ে চিন্তিত থাকেন। আর এ ব্যাপারগুলো তাঁকে দল গড়ার ক্ষেত্রে মানসিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কাল বিকেলে বাফুফে ভবনের সামনে একদল ফুটবল সমর্থক তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ পর্যন্ত করেছেন, ভাবা যায়! আসিয়ানের আগে বিশ্বের সর্বনিম্ন র‍্যাঙ্কিংয়ের সান মারিনোকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে শুরু করেন নতুন কোচ। তা নিয়ে কী উচ্ছ্বাস বাংলাদেশের! কিন্তু আসল পরীক্ষাতেই দলের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়েছে। দলের ভেতর একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কে কোন ম্যাচে খেলবেন, বোঝা কঠিন। স্থিতিশীল একাদশ দাঁড় করাতে পারেননি কোচ, এ জন্য অবশ্য তাঁকে সময় দিতে হবে।

কে কী বলছেন

বাংলাদেশের ফুটবলের মূল সমস্যাই কাঠামোগত দুর্বলতা ও পরিকল্পনার অভাব। সারা দেশে নিয়মিত লিগ ও প্রতিযোগিতা না থাকায় খেলোয়াড় তৈরির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। লিগের সময়সূচি, ক্যালেন্ডার ও ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি প্রবাসী ফুটবলার বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা, কোন মানের লিগে খেলেন এবং পারফরম্যান্স—এসব যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে না। ফলে জাতীয় দলের শক্তি বাড়ানোর বদলে সমস্যাগুলোই থেকে যাচ্ছে।
রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বির, সাবেক প্লেমেকার

সমস্যা হলো, বাংলাদেশ ফুটবল দল গঠনের প্রক্রিয়াটাই এখন পুরো বদলে গেছে। স্রোতের মতো প্রবাসী আসছেন। সকালে এসে বিকেলে জাতীয় দলের জার্সি পরে ফেলছেন, দলের সঙ্গে সেভাবে বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছে না তাঁদের। কেউ কেউ বলছেন, ‘ট্রাংক ভর্তি’ করে এভাবে যত্রতত্র প্রবাসী ফুটবলার আনা বন্ধ না হলে এমন হতেই থাকবে।

তিন ম্যাচে ১৩ গোল হজম করেছে বাংলাদেশ দল
বাফুফে

প্রবাসী ফুটবলার এনে লাভ যে একেবারে হচ্ছে না, তা বলা ভুল। ১৯ বছর বয়সী ফারহান আলী ওয়াহিদ বা জাপানি প্রবাসী শুকি ইতোফুসা, জিদান ইউসুফরা মাঠে নিজেদের সামর্থ্যের ছাপ কিন্তু রেখেছেন। বিশেষ করে শুকি ইতোফুসাকে বাংলাদেশের উইংয়ের নতুন প্রাপ্তি বলা যায়। তাঁর গতি ও উদ্যম ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু প্রবাসীরা জাতীয় দলের জন্য স্থায়ী কোনো সমাধান হতে পারে না।

কে কী বলছেন

পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে নিজের ফিটনেস ধরে রাখা সব ফুটবলারের দায়িত্ব। তিন-চার মাস ম্যাচ না খেললেও নিজেকে ৯০ মিনিট খেলার জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। কিন্তু জাতীয় দলের ক্যাম্পে এসে ফিটনেস ঠিক করার প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে টানা ম্যাচ খেলার মতো শারীরিক সক্ষমতা তৈরি হয়নি। দুই ম্যাচের পর তৃতীয় ম্যাচে খেলোয়াড়দের উদ্যম ও শক্তি কমে গেছে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও ম্যাচ অনুশীলনের অভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে।
আলফাজ আহমেদ, সাবেক স্ট্রাইকার

প্রবাসী নিয়ে মরক্কোর উদাহরণ আসে। ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের ২৬ জনের স্কোয়াডে ১৯ জনই ছিলেন প্রবাসী বা বংশোদ্ভূত। ইন্দোনেশিয়ার পুরো দলটাই এখন প্রবাসী, বাংলাদেশ দলে আছেন ৯ জন। কিন্তু হামজা চৌধুরী ছাড়া বাংলাদেশের প্রবাসীদের কেউই বড় কোনো লিগে খেলেন না। ফলে তাঁরা শক্তিশালী দলের সামনে অসহায় হয়ে পড়ছেন।

ঘরোয়া ফুটবলের কাঠামো ধ্বংসপ্রায়, পাইপলাইন দুর্বল, লিগের মান প্রশ্নবিদ্ধ। এই বাস্তবতাকে কার্পেটের নিচে আড়াল করে শুধু প্রবাসী ফুটবলারদের কাঁধে ভর করে বড় আসরে সমর্থকেরা যেন ফাঁপা বেলুনের মতো এক কৃত্রিম আশা লালন করছেন। বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অতি উচ্ছ্বাস ছিল এত দিন।

কে কী বলছেন

ইন্দোনেশিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে আমাদের জমাট থাকা উচিত ছিল। কিন্তু পুরো ৯০ মিনিট ওপেন প্লেতে খেলা হয়েছে, যা প্রতিপক্ষকে প্রচুর জায়গা দিয়েছে। লো ব্লক বা মিড ব্লকে থেকে তাদের আক্রমণের জায়গাগুলো বন্ধ করা দরকার ছিল। বিশেষ করে উইংয়ে যে জায়গা দিয়ে একের পর এক ক্রস এসেছে, সেসব অঞ্চল ঠিকভাবে ব্লক করা হয়নি। ফলে প্রতিপক্ষ সহজেই গোলের সুযোগ পেয়েছে। এমনকি ৩-১ হওয়ার পরও কৌশল পরিবর্তন করা হয়নি।
জাহিদ হাসান এমিলি, সাবেক স্ট্রাইকার

হামজা চৌধুরী দলে যোগ দেওয়ামাত্রই বাংলাদেশ রাতারাতি আলাদিনের চেরাগ পেয়ে এশিয়ার পরাশক্তি হয়ে যাবে ধরে নেন অনেকে। গত বছরটা ভালোই খেলেছে দল, হংকং–সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বুক চিতিয়ে লড়েছে। ২২ বছর পর ভারতের বিপক্ষে জয় এসেছে। মাঠে দর্শক ফিরেছেন। কিন্তু সেই বাংলাদেশই নতুন কোচের অধীনে আসিয়ানে ছন্নছাড়া ছিল। কোচকেও এখন নতুন করে ভাবতে হবে তাঁর কৌশল বা দল নির্বাচন নিয়ে ভুল ছিল কি না।

জাতীয় দল তখনই ভালো করবে, যখন খেলোয়াড়দের সামর্থ্য বাড়বে। চাঁদপুরে যে এবড়োখেবড়ো মাঠে কাল ঘরোয়া লিগে মোহামেডানের ম্যাচ হলো, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। যে দেশে এমন মাঠে ঘরোয়া ফুটবল হয়, সে দেশ ৯ গোল খেলেই বা আর আশ্চর্যের কী!

আরও পড়ুন