ব্রাজিলে ‘মরুভূমির হলান্ড’, সাম্বার দেশে নতুন এক গোলমেশিন

প্রথম আলো গ্রাফিকস

একটা কথা আছে, প্রিয় নায়কদের কখনো খুব কাছ থেকে দেখতে নেই; তাতে মোহভঙ্গ হতে পারে।

কথাটা ব্রাজিলিয়ান কিশোর ‘দেল’কে বলতে যাবেন না। ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-১৭ দল আর বাহিয়া ক্লাবের এই স্ট্রাইকারের কাছে ম্যানচেস্টার সিটির আর্লিং হলান্ড বিশাল এক অনুপ্রেরণা। এখন পর্যন্ত তার জীবনের সবচেয়ে বড় ধ্যানজ্ঞানই হচ্ছে নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারকে কাছ থেকে দেখা।

শৈশব থেকে যাঁকে ‘দ্রোনাচার্য’ ভেবে বড় হয়েছেন, সেই আর্লিং হলান্ডের কাছ থেকে যখন হঠাৎ ভিডিও বার্তা পেলেন,  দেলের রোমাঞ্চের পারদটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল, তা বোধ হয় অনুমান করাই যায়।

ঘটনাটা হচ্ছে, তাঁর প্রতি দেলের এমন অগাধ ভালোবাসার কথা কোনো না কোনোভাবে হলান্ডও জানতে পেরেছেন। তারপর সিটির সতীর্থ সাভিনিওর কাছ থেকে একটু তালিম নিয়ে হলান্ড ভাঙা ভাঙা পর্তুগিজে একটা ভিডিও বার্তাও পাঠালেন দেলকে। সেই বার্তায় বললেন, ‘দেল, ইতিহাদে খেলা দেখার জন্য তোমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’

ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব–১৭ দলের হয়ে দারুণ খেলেন দেল
দেলের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল

দেলের চোখেমুখে তখন রাজ্যের বিস্ময় আর আনন্দ। ফিরতি বার্তা পাঠালেন, ‘হলান্ড, তুমি ডাকলে আমি আসবই। তোমার গোল করা দেখতে আর তোমার কাছ থেকে শিখতে তর সইছে না।’ ভিডিওর শেষে হলান্ডের সেই বিখ্যাত ‘লোটাস’ বা পদ্মাসন ভঙ্গিটাও নকল করে দেখালেন দেল।

আরও অনেক ব্রাজিলিয়ানের মতো দেলের আসল নামটাও বড়সড়। ওয়েন্দেমন ওয়ান্দারলেই সান্তোস দি মেলো। ২০০৮ সালের জুনে উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলের সারজিপে রাজ্যে জন্ম তার। ঝোপঝাড়ে ঘেরা ধূসর প্রান্তরের এই এলাকাটি ব্রাজিলে ‘সেরতাও’ বা মরুভূমিসদৃশ বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সেখান থেকেই দেলের উঠে আসা, আর তাই ব্রাজিলের ফুটবলে তার নাম হয়ে গেছে ‘হলান্ড দো সেরতাও’ বা মরুভূমির হলান্ড।

আরও পড়ুন

ব্রাজিলের আধা পেশাদার লিগ থেকে উঠে এসে মাত্র ১২ বছর বয়সে দেল যোগ দেন বাহিয়া ক্লাবে। যে ক্লাব থেকে একসময় দানি আলভেসের মতো কিংবদন্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০২৩ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাহিয়ার অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে ৩৪ ম্যাচে ৪০ গোল করে হইচই ফেলে দেন তিনি। ইউরোপে তখন হলান্ডও গোলবন্যা বইয়ে দিয়ে একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চুরমার করছিলেন। ব্রাজিলের ফুটবল হয়তো তখনই টের পেয়েছিল, তাদের দেশে নরওয়েজীয় গোলমেশিনের এক প্রতিচ্ছবি তৈরি হচ্ছে।

২০২৫ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে দেল নিজেকে মেলে ধরলেন আরও দারুণভাবে। সেমিফাইনালে চিলির বিপক্ষে একমাত্র গোলটি তাঁরই। ফাইনালে স্বাগতিক কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টিটাও নিলেন ঠান্ডা মাথায়। এই বয়সেই তাঁর স্নায়ু যেন ইস্পাত দিয়ে গড়া!

বাহিয়ার হয়ে সময়টাও মাঠে উপভোগ করলেন দেল
দেলের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল

এরপর কাতার অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ। হন্ডুরাসের বিপক্ষে জোড়া গোল দিয়ে শুরু, এরপর জাম্বিয়ার বিপক্ষে দারুণ এক হেডে দলের মান বাঁচানো গোল। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে যখন খেলা ১-১ সমতায়, যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে দেল দেখালেন তাঁর কারিশমা। বুক দিয়ে বল নামিয়ে গোলরক্ষককে কাটিয়ে পাঠালেন শূন্য জালে। সত্যিকারের এক ‘নাম্বার নাইন’ গোল! যদিও সেমিফাইনাল আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ব্রাজিল টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়, কিন্তু টুর্নামেন্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে দেল তত দিনে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিয়ে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

কাতার থেকে ফিরে বাহিয়ার মূল দলে জায়গা করে নিতে খুব বেশি সময় লাগেনি দেলের। বাহিয়ার মূল দলের হয়ে ৯ ম্যাচে ৪ গোল করে রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে বড় ভূমিকা রাখেন। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভিতোরিয়ার বিপক্ষে ডার্বিতে জয়সূচক গোলটিও তাঁর। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখতে হয়েছে দেলকে। সিরি-আ লিগে ফ্লুমিনেন্সের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ৯ মিনিটের মাথায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছে তাঁকে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারের মুখে অনিচ্ছাকৃত আঘাত করে বসা—মাঠের আগ্রাসনটা বোধ হয় হলান্ডের চেয়ে একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল সেদিন!

দেল প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবেন তো
দেলের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল

তবে এই হোঁচট হয়তো দেলকে থামাতে পারবে না। সামনেই কোপা লিবার্তোদোরেস, এরপর লিগের লম্বা মৌসুম। এর ফাঁকে সময় পেলে হয়তো হলান্ডের খেলা দেখতে ইতিহাদেও যাবেন। তবে তাঁর স্বপ্নটা এখন নিশ্চয়ই আরও বড় হয়েছে। শুধু ইতিহাদের গ্যালারিতে বসে হলান্ডের খেলা দেখা কেন, মাঠে হলান্ডের সতীর্থ হয়ে গোল উৎসব করতে পারলে মন্দ কী!

মরুভূমির হলান্ড এটুকু তো চাইতেই পারেন!