যা–ই হোক, আলিয়াঞ্জ অ্যারেনার ঘোষক স্টেফান লেহমান তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এভাবে, ‘বেশি নয়, মার্তিনেজের চেয়ে মাত্র ১৫ বছরের ছোট।’ তরুণ সেই খেলোয়াড় দৌড়ে মাঠে ঢুকে পজিশনে দাঁড়িয়ে গেলেন। এর কিছুক্ষণ পরই এল জাদুকরি মুহূর্ত।

বদলি নামার পাঁচ মিনিটের মধ্যে লাইপজিগের চার ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোল! সমতায় বায়ার্ন। চার মিনিট পর তো এগিয়েই গেল বাভারিয়ানরা। কিংসলে কোমানের পাসে থমাস মুলার যে গোলটি করলেন, সেই বলটিও বানিয়ে দেন ওই তরুণ। ঘোষক লেহমান মাইক্রোফোনে হাসতে হাসতে বলতে লাগলেন, ‘এ আমি বিশ্বাস করি না।’

কে সেই তরুণ, যাঁকে নিয়ে এত শোরগোল? তিনি জামাল মুসিয়ালা। এবারের বিশ্বকাপে উদীয়মান সেরার দৌড়ে যাঁকে এগিয়ে রেখেছে ফুটবলবিষয়ক জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমগুলো। ১৯ বছর বয়সী মিডফিল্ডারকে নিয়ে জার্মানিও দেখছে অনেক বড় স্বপ্ন।

সেদিন ছিল ৫ ডিসেম্বর ২০২০। সেদিনের আগেও বায়ার্নের মূল দলের হয়ে বেশ কিছু ম্যাচ খেলেছেন মুসিয়ালা। তবে বিশ্ব ফুটবল তাঁকে চিনেছে ওই দিনই।

পাক্কা জহুরি যেমন আসল হীরা চিনতে ভুল করেন না, ফ্লিকও ঠিক তা–ই। অনেক প্রতিভার ভিড় থেকে তিনি মুসিয়ালাকে বের করে এনেছেন। তারুণ্যেই নিজের সামর্থ্য আর দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে সবাইকে এতটাই বিমোহিত করেছেন যে জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলো তাঁকে পেতে উতলা হয়ে পড়ে।

মায়ের দেশ জার্মানিতে জন্ম হলেও বাবা নাইজেরিয়ান। বেড়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডে। লন্ডনের ক্লাব চেলসির একাডেমিতে ছিলেন আট বছর। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ইংল্যান্ড-জার্মানি দুই দলের হয়েই খেলেছেন। চাইলে খেলতে পারতেন বাবার দেশ নাইজেরিয়ার হয়েও। সে পথে না হেঁটে অবশ্য ভালোই করেছেন। সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললে কি আর কাতারে যেতে পারতেন?

নাইজেরিয়া যে এবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি! অনেক ভেবেচিন্তে মুসিয়ালা গত বছর জন্মভূমি জার্মানিকেই শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ডাই মানশাফটদের হয়ে এরই মধ্যে ১৭ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন মুসিয়ালা। দোহার খলিফা ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে আজ জাপানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক হতে পারে তাঁর। যাঁকে জার্মানির আগামী দিনের তারকা মনে করা হচ্ছে, তাঁর দিকে তো তাই আজ আলাদা করে চোখ রাখতেই হবে।

ইওয়াখিম লুভ দায়িত্ব ছাড়ার পর সেই ফ্লিকই এখন জার্মানির প্রধান কোচ। জাতীয় দলেও চেনা মানুষকে গুরুর ভূমিকায় পাওয়ায় নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার কিছু নেই মুসিয়ালার। ফ্লিকও তাঁর কাছ থেকে বায়ার্নের মতোই পরিপূর্ণ সেবা চাইতে পারেন। তরুণ শিষ্যকে ব্যবহার করতে পারেন ‘লুকানো তাস’ হিসেবেও।

এত অল্প বয়সেই মুসিয়ালাকে সুযোগ দেওয়া নিয়ে ফ্লিক বলেছেন, ‘ওর চোখ দুটো দেখলে মনে হয়, শিকার ধরতে নামছে। কখন মাঠের কোন পজিশনে থাকতে হবে, সেই বোধশক্তি দারুণ। বিশেষ করে উইংয়ে বলের ওপর ওর নিয়ন্ত্রণ খুব ভালো।’

মাঠে ভয়ংকর হয়ে উঠলেও শারীরিক গড়ন ও হাবভাবে একদমই ‘নিষ্পাপ শিশু’ মুসিয়ালা। হাবাগোবা চালচলনের কারণে সতীর্থরা তাঁর নাম দিয়েছেন ‘বাম্বি’। আর জার্মান কিংবদন্তি লোথার ম্যাথাউস তো তাঁকে লিওনেল মেসির সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছেন।

ক্লাব ফুটবলে সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েই এসেছেন। এবার বিশ্বমঞ্চে নিজের জাত চেনানোর পালা।

মুসিয়ালা কি পারবেন এত সুখ্যাতির প্রতিদান দিতে?