১১টা সেভ, তবু আর্জেন্টিনাকে বাঁচাতে পারলেন না মার্তিনেজ
৩০ গজ দূর থেকে ফ্রি-কিক নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন লামিনে ইয়ামাল। কমেন্ট্রি থেকে ভেসে আসছে পিটার ড্রুরির কণ্ঠ, এটাই হয়তো এই বিশ্বকাপের শেষ কিক। বল জালে জড়ালেই থামবে মহারণ, স্পেনের মাথায় জুটবে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। ইয়ামাল ফ্রি-কিক নিয়েছিলেন মাপা। যতটা দুর্দান্ত ছিল সেই শট, তার থেকেও অবিশ্বাস্য ছিল এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সেভ। নির্ধারিত সময়ের শেষ সেকেন্ডের সেভটা বাঁচিয়ে রেখেছিল আর্জেন্টিনার আশা।
অথচ পুরো টুর্নামেন্টে মার্তিনেজ ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। থাকবেন না-ই বা কেন? ডান হাতের অনামিকায় চোট লুকিয়ে খেলেছেন বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকা; যেখানেই ডাক্তার দেখিয়েছেন, সবার মতামত ছিল একটাই—অপারেশনটা করিয়ে ফেলো, ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলো না। মার্তিনেজ তাচ্ছিল্যের স্বরে ভাবছিলেন, ৩৩ বছর বয়সে এসে ক্যারিয়ার বাঁচানোর কী আছে? এর থেকে বরং দেশকে বাঁচাই।
অপারেশন ফেলে তাই উঠে পড়েছেন বিশ্বকাপের বিমানে। অনুশীলনে ঘাম ঝরানো ছাড়াই নেমে পড়েছেন মাঠে। কোচ লিওনেল স্কালোনি জানতেন, গোলবারের নিচে মার্তিনেজ নামটাই স্বস্তি এনে দেবে দলকে, পারফরম্যান্স আসবে এমনিতেই। পুরো দল জানত সেটা। তাই তো টুর্নামেন্টজুড়ে মার্তিনেজকে আগলে রেখেছেন সতীর্থরা।
প্রথম দুই ম্যাচে হজম করেননি কোনো গোল, খুব একটা বেগও পেতে হয়নি গোলবারের নিচে। কিন্তু তৃতীয় ম্যাচ থেকেই বাড়তে লাগল চাপ, সঙ্গে সঙ্গে গোলবারের নিচে তাঁর ক্লান্তিটাও স্পষ্ট হয়ে উঠল। লোকে তো আর চোটের কথা জানে না, তাই রব উঠল ‘এই মার্তিনেজ আর আগের মার্তিনেজ নেই’। দুই ক্লিন শিটের পর ৫ ম্যাচে ৭ গোল হজম—গোল্ডেন গ্লাভ পাওয়া গোলরক্ষকের সঙ্গে বেশ বেমানান।
গত বিশ্বকাপে সামনে থেকে বুক চিতিয়ে যিনি রক্ষা করেছেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্স, তিনিই যেন চার বছরের ব্যবধানে ক্লান্ত–পরিশ্রান্ত। তাই তো ফাইনালের আগে নিজেই সামনে এসে স্বীকার করে নিলেন ভুলত্রুটি। আঙুলের চোটটা অনেক ভুগিয়েছে তাঁকে, বিশ্বকাপটা বিশ্বকাপের মতো যায়নি। কিন্তু ফাইনালে দরকার হলে সেই পুরোনো এমিকেই দেখবে বিশ্ব। সংবাদ সম্মেলনে যেন কথা দিয়ে গেলেন আর্জেন্টিনার কোটি ভক্তকে।
এমি কথা দিয়ে কথা রাখেন, রাখতে পারেন। যেভাবে রেখেছিলেন ২০২১ সালের কোপা আমেরিকায়। মেসিকে একটা শিরোপা এনে দেওয়ার কথা রেখেছিলেন টাইব্রেকারে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে কিংসলে কোমানের পেনাল্টি থামিয়ে। এমি মার্তিনেজ জ্বলে উঠলেন যেদিন তাঁকে দরকার পড়ল মাঠে। ম্যাচজুড়ে স্পেন পুতুলনাচের মতো নাচিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। মাঝমাঠে পুরো নিয়ন্ত্রণ রেখে খেলাটা চলেছে শুধু আর্জেন্টিনার অর্ধেই। কিন্তু স্পেনের সব কারিকুরি এসে থেমে যাচ্ছিল এক মার্তিনেজের সামনে।
নির্ধারিত সময়েই লজ্জাজনক এক হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারত আর্জেন্টিনা, হয়নি একমাত্র মার্তিনেজের কারণে। দলের বাকি ১০ জনের সঙ্গে জার্সিতে যেমন তফাত ছিল, পারফরম্যান্সেও ছিল যোজন যোজন পার্থক্য। পুরো ম্যাচে একটা শটও গোলমুখে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে এমি মার্তিনেজ একাই শট থামিয়েছেন ১১টি। বিশ্বকাপ ফাইনালে এত বেশি সেভের রেকর্ড নেই অন্য কোনো গোলরক্ষকের। যদিও এখানে মার্তিনেজের কৃতিত্বের সঙ্গে স্প্যানিশ আক্রমণভাগের ব্যর্থতাটাও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকগুলো শট তারা নিয়েছে মার্তিনেজের হাতে কিংবা শরীর বরাবর। তারপরও ১১টা সেভ, সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য!
জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’, ইনি তো রক্তমাংসের এমি মার্তিনেজ। একের পর এক শট থামাতে থামাতে তিনিও যেন থমকে গিয়েছিলেন মুহূর্তের জন্য। আর সেই মুহূর্তটাই রাঙিয়ে নিলেন ফেরান তোরেস। মুহূর্তের অসতর্কতা কাঁপিয়ে দিল আর্জেন্টিনার গোলবার। মিকেল ওইয়ারবাসাল, লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমোদের থামিয়ে দেওয়া এমি থামলেন ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের এক শটে। ওই একটা শট, একটা মুহূর্ত—টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন, স্বপ্ন হয়েই রইল আর্জেন্টিনার জন্য। এমি মার্তিনেজ সব পেরেও যেন কিছুই পারলেন না।
২০২৬ ফাইনালের স্মৃতিতে এমি মার্তিনেজ হয়ে থাকবেন ট্রয়ের হেক্টর হয়ে, যিনি একাই এগিয়ে গিয়েছিলেন দেশকে রক্ষা করতে। নায়ক হতে হতে বিদায় নিলেন এক ট্র্যাজিক চরিত্র হয়ে।