উরুগুয়েকে ভয় ধরিয়ে দিয়ে পয়েন্ট কাড়ল সৌদি আরব
উরুগুয়ে ১–১ সৌদি আরব
উরুগুয়ে নদীর জল বোধ হয় বেশ বাড়বে! ভিজবে সৌদি আরবের উষর মরুভূমিও। মানুষের চোখের জলে পৃথিবীর দুটি আলাদা মহাদেশের ভূখণ্ডে এমন অল্পস্বল্প পরিবর্তনের জন্য ‘দায়ী’ আসলে বিশ্বকাপ!
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়াম থেকে সেই ভেজা চোখের শুরু। তার আবার দুই রকম ভাষা। উরুগুয়ে জিততে না পারায় দক্ষিণ আমেরিকার সেই নদীতে জমেছে কষ্টের ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। সৌদির তপ্ত বালু ভিজেছে আক্ষেপমেশানো আনন্দাশ্রুতে। উরুগুয়ের বিপক্ষে জিততে জিততেও যে সৌদি আরবের জেতা হলো না!
সেই না হওয়াতে উরুগুয়ে নদীর পানি যতটুকু বাড়ার শঙ্কা ছিল, ততটুকু না বাড়লেও কয়েক ফোঁটা অশ্রু তো পড়েছেই। উরুগুয়ে দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ফিফা আয়োজিত অলিম্পিকে দুটি ফুটবল ইভেন্ট জেতায় জার্সিতে অবশ্য চার তারকা। সেই উরুগুয়ে কিনা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৪৮ ধাপ পিছিয়ে থাকা সৌদির বিপক্ষে ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্তও পিছিয়ে ছিল ১–০ গোলে!
মাক্সিমিলিয়ানো আরাউহো ৮০ মিনিটে গোল করেছিলেন বলে রক্ষা। নইলে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের সীমানাচিহ্ন এঁকে দেওয়া উরুগুয়ে নদীতে অশ্রুর বানও নামতে পারত! ওপার থেকে সহমর্মিতা জানাতেন আর্জেন্টাইনরা। তাদের কষ্ট তো আরও বেশি। কাতারে চার বছর আগের বিশ্বকাপে এই সৌদি আরবের বিপক্ষেই প্রথম ম্যাচে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। উরুগুয়ের কষ্ট সে তুলনায় একটু কম। অন্তত ১–১ গোলের ড্রয়ে পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপটা শুরু করতে পারল।
বিশ্বকাপে এই রাতটাই ছিল কেমন ভয় ধরানো। প্রথমে তুমুল ফেবারিট স্পেনকে গোলশূন্য ব্যবধানে রুখে দিল নবাগত কেপ ভার্দে। তারপর ইউরোপে আরেক বড় দল বেলজিয়ামের বিপক্ষে জিততে জিততে শেষ পর্যন্ত ড্র করতে বাধ্য হয়েছে মিসর। সেই ম্যাচের পর মায়ামিতে রীতিমতো ভূমিকম্প হওয়ার দশা।
শেষ পর্যন্ত সেই কম্পনে উরুগুয়ের খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে ‘ওয়ার্নিং বেল’ পেয়ে গেলেন বিয়েলসা। আদাজল খেয়ে সৌদি বক্সের ভেতরে পড়ে থেকে মুহুর্মুহু আক্রমণে ফেদে ভালভের্দেদের অর্জন মাত্র ১টি গোল।
বিয়েলসার আক্রমণভাগকে খুব বেশি দোষারোপের সুযোগও নেই অবশ্য। সৌদির গোলকিপার মোহাম্মদ আল–ওয়াইস ৯টি সেভ করেন। মরিয়া উরুগুয়েকে ঠেকাতে আল–ওয়াইসকে বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সেভ করতে হয়েছে। কিন্তু পারেননি শুধু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ১১ মিনিট আগে। উড়ে আসা ক্রসে উরুগুয়ে ফরোয়ার্ড ফেদেরিকো ভিনাসের হেড ঠেকান সৌদি গোলকিপার। ফিরতি বলে আরাউহোর বাঁ পায়ের শট ঠেকানো তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
মাঠের অন্য প্রান্তে উরুগুয়ের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ফার্নান্দো মুসলেরাকে অত পরীক্ষা দিতে হয়নি। তবে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়েও থাকেননি। দুটি দারুণ সেভ করতে হয় মুসলেরাকে। কিন্তু ৪১ মিনিটে সৌদি ডিফেন্ডার আবদুলেলাহ আল–আমরির শটের জবাব ছিল না তাঁর কাছে। কর্নার থেকে হাসান আল–তাম্বাকতির হেড ঠেকান মুসলেরা। ফিরতি বলে আল–আমরির শট পৌঁঁছেছে জালে। ২টি গোলই হয়েছে গোলকিপার ঠেকানোর পর ফিরতি বলে।
সৌদি আরব কতটা মরিয়া হয়ে খেলেছে, সেটার একটি প্রমাণ দেবে পরিসংখ্যান। উরুগুয়ের বিপক্ষে ২১ বার বাতাসে ভাসা বল (এরিয়াল ডুয়েল) দখল করেছে তারা। উরুগুয়ে সেখানে পিছিয়ে (২০)। দক্ষিণ আমেরিকান দেশটির অবস্থা হয়েছিল স্পেনের মতো। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল পেতে ২৭টি শট নিয়েও পারেনি স্পেন। ফেদে ভালভের্দেরাও সমান ২৭টি শটের পরিশ্রমে একটি গোল তুলে নিয়ে উরুগুয়ে নদীর জল আর বাড়তে দেননি। একটি শট পোস্টে লাগায় তারা দুষতে পারেন দুর্ভাগ্যকেও।
তাতে অবশ্য সৌদি আরবের লড়াইয়ের মানহানি ঘটে না এতটুকুও; বরং আবারও বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে অঘটন ঘটানোর খুব কাছে গিয়েও ড্রয়ের আক্ষেপে তপ্ত বালুতে দু–এক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিতে পারেন দেশটির কেউ কেউ।
‘এইচ’ গ্রুপ এখন পুরো উন্মুক্ত। চারটি দলের সবারই সংগ্রহ ১ পয়েন্ট। জায়গাটা যুক্তরাষ্ট্র বলেই সম্ভবত এবার গ্রুপ পর্ব পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নটা আরও বেশি করে দেখছে সৌদি আরব। বিশ্বকাপে এর আগে ছয়বার খেলে তারা একবারই গ্রুপ পর্ব পেরোতে পেরেছে—১৯৯৪ বিশ্বকাপ এবং সেবারও আয়োজক ছিল যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এশিয়া মহাদেশের মান রাখায় আরও এক সাফল্যের পালক যোগ করতে পেরেছে সৌদি আরব। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) অধিভুক্ত দেশগুলো চলতি বিশ্বকাপে এখনো হারেনি। দুই জয় ও তিন ড্র। ওদিকে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশনের (কনমেবল) অধিভুক্ত দেশগুলোর কেউ এখনো জয়ের দেখা পায়নি।
ফুটবল ইতিহাসে ধারে–ভারে এ দুই ভুখণ্ডের মধ্যে কোন মহাদেশ যেন এগিয়ে?
যাকগে সে কথা। বরং নদীর গল্প হোক। সৌদি আরবে কোনো প্রাকৃতিক নদী নেই। স্থায়ী কিংবা প্রাকৃতিক নদীহীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ সৌদি আরব। ওদিকে উরুগুয়ের নামকরণ উরুগুয়ে নদীর নামে। যে নদীর নামকরণের নেপথ্যে রয়েছে সেই মহাদেশের আদিবাসী গুয়ারানিদের দেওয়া ‘উরু’ নামের এক কোয়েল পাখি। সেই নদীর জল বাড়ুক আর না বাড়ুক, জয় না পাওয়ায় সৌদির তপ্ত বালুতে যে একটু আক্ষেপ মিশে রইবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
যেমন সন্দেহ নেই, সৌদির ভীষণ শুষ্ক মাটিতে আজ আরেকটু হলেই আছাড় খেয়ে সেই ‘কোয়েল’ পাখির ‘প্রাণনাশ’ ঘটত!