তবে এই উৎসব উদ্‌যাপনের যে প্রদীপ, তার নিচেও আছে অন্ধকার। গল্পটি পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা বঞ্চিত মানুষের। যেখানে যোগ আছে বাংলাদেশেরও। সেই বঞ্চিত মানুষদের অনুপ্রেরণা জোগাতে আয়োজন করা হয়েছিল ‘দ্য স্ট্রিট চাইল্ড ওয়ার্ল্ড কাপ’ বা পথশিশুদের বিশ্বকাপের।

২০১০ সাল থেকে মূল বিশ্বকাপের সঙ্গেই আয়োজিত হয়ে আসছে এই টুর্নামেন্ট। যেখানে আছে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বও। এবার ২৫টি দেশের সঙ্গে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশও।

পথশিশুদের এই বিশ্বকাপে বড় কিছু করতে পারেনি বাংলাদেশের মেয়েরা, শিরোপা জিতেছে ফুটবলের দেশ ব্রাজিল। তবে কাতারের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই দলের যাওয়াই যে শিরোপা জয়ের চেয়ে বড় কিছু ছিল!

বিশ্বকাপের এই আয়োজনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ দলের গল্প ভিডিও চিত্রে তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা। সঙ্গে তারা শুনিয়েছে ইতি নামের এক পথশিশুর এ পর্যায়ে উঠে আসার কাহিনিও। ইতি নামের মেয়েটি শুনিয়েছে ভিক্ষাবৃত্তি ও মাদকাসক্তি থেকে কাতারের বিশ্বকাপ মঞ্চে উঠে আসার পেছনের গল্প। যে গল্প হার মানায় রূপকথাকেও।

মাত্র আট বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিল ইতি। কীভাবে ছোট্ট মেয়েটি কঠিন পথে যাত্রা শুরু করেছিল, নিজের সেই গল্প জানাতে গিয়ে ইতি বলেছে, ‘পরিবারে কেউ আমাকে ভালোবাসত না। সে জন্য আমি ঢাকায় চলে আসি। আমি ভিক্ষা করে বেঁচে ছিলাম। আমি সারা দিন ট্রেনে ভিক্ষা করে কাটাতাম। কেউ দিত, কেউ দিত না। ভিক্ষার কারণে প্রায়ই মারও খেতে হতো। এরপর দুই বছর ধরে লিডোর (পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা এনজিও) সঙ্গে থাকি আমি। এখানেই পড়াশোনা ও খেলাধুলা করছি।’

ইতির বয়স এখন ১৩ বছর। বাংলাদেশের ফুটপাতে অবহেলার ফুল হয়ে পড়ে থাকা সেই মেয়েই নিজের অন্ধকার জীবনের গল্প শুনিয়েছে এভাবে, ‘আমি মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম। অনেক দিন ধরে নেশায় জড়িয়ে ছিলাম। এরপর কোভিডের সময় ভিক্ষা করার সুযোগও ছিল না। ট্রেনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমার জীবনের কোনো আশাও ছিল না।’

তবে ইতি এখানে কেবলই একটি দৃষ্টান্ত। তাঁর সঙ্গে কাতারে যাওয়া বাকি ১১ জনের গল্পও ইতির মতোই লড়াইয়ের। তাদের সেই নিরাশার জীবনও বদলে গেছে, কাতারের বিশ্বমঞ্চের সবুজ গালিচায় ফুটবলের ফুল ফুটিয়েছে ইতিরা। তাদের সেই যাত্রায় বড় ভূমিকা এনজিও সংস্থা লিডোর। যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবলের দলও গঠন করা হয়। পরের গল্পটি বিশ্বকাপে খেলার।

কীভাবে সেই দল গঠিত হলো, তা জানাতে গিয়ে লিডোর প্রতিষ্ঠাতা ফরহাদ হোসেন ভিডিও চিত্রটিতে বলেছেন, ‘আমাদের সংগঠনের মূল কাজই হচ্ছে শিশুদের একটা জায়গা দেওয়া। পাশাপাশি একটা শিশু যেন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে, তা নিশ্চিত করা। এরপর আমরা পথশিশুদের বিশ্বকাপের আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা বলল, “যদি তোমরা দল গঠন করতে পার, তাহলে আমরা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুযোগ দিতে পারি।” এরপরই আমরা দলটিকে দোহায় পথশিশুদের বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত করি।’

দলের সঙ্গে কাজ করা কোচ বলেছেন, `১০ মাস ধরে আমরা দলটির সঙ্গে কাজ করছি। তারা একেবারে শূন্যে ছিল। এখানে তাদের আমি অনেকটাই প্রস্তুত করতে পারছি।'

বিশ্বকাপের আগে দেশে প্রস্তুতি নিয়েছে ইতিরা। তবে বিশ্বকাপে বেশি দূর যেতে পারেনি। হারের হতাশায় কান্নায় বুকও ভাসিয়েছে তারা। পরে ইতি অবশ্য বলেছে হারজিত নয়, যাত্রাটাই ছিল বিজয়ের, ‘আমি বিমানে উঠতে পারব, কাতারের মতো দেশে যেতে পারব, এটা স্বপ্নের মতো ছিল। এখন আমি কাতারে বিশ্বকাপে নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছি। জেতা কিংবা হারা কোনো ব্যাপার না। নিজের এই যাত্রায় আমি আনন্দিত।’