জুয়ায় নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্রাজিল ফুটবলে বড় ধাক্কা
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে যেন আচমকা ঝড়। মাঠে নয়, মাঠের বাইরের এক সিদ্ধান্তে। দেশটির প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা গত শুক্রবার অনলাইন বেটিং কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এক অধ্যাদেশে সই করেছেন। আর তাতেই টলতে শুরু করেছে ক্লাবগুলোর অর্থনীতির ভিত।
ধারণা করা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ আমেরিকার ক্লাব ফুটবলে ব্রাজিলের যে একচ্ছত্র আধিপত্য, তার বড় অংশই গড়া এই বেটিং স্পনসরদের টাকায়। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের শীর্ষ যে ক্লাব টুর্নামেন্ট, সেই কোপা লিবার্তাদোরেসের সর্বশেষ সাতটি ট্রফিই গেছে ব্রাজিলের ক্লাবগুলোর ঘরে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এক ঘোষণায় বদলে দিয়েছেন দৃশ্যপট। বেটিংকে তিনি তুলনা করেছেন ক্যানসারের সঙ্গে।
ঝুঁকির অঙ্কটা বেশ বড়। ব্রাজিলের শীর্ষ লিগ ব্রাসিলেইরো সিরি আ-র ২০টি ক্লাবের মধ্যে ১৪টিরই প্রধান স্পনসর কোনো না কোনো বেটিং কোম্পানি। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গালাপাগোস ক্যাপিটালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ক্লাবগুলোর মোট বাণিজ্যিক আয়ের প্রায় ৩৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২০ কোটি ডলার এসেছে এই খাত থেকে।
বর্তমান লিবার্তাদোরেস ও লিগ চ্যাম্পিয়ন ফ্ল্যামেঙ্গোর কথাই ধরা যাক। বেটানোর সঙ্গে তাদের বার্ষিক চুক্তির মূল্য ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে যা রেকর্ড। এই অঙ্ক দিয়েই এ বছর মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতাকে ওয়েস্ট হামের কাছ থেকে কিনেছে ক্লাবটি। নিষেধাজ্ঞার পর এক পডকাস্টে ফ্ল্যামেঙ্গোর সভাপতি লুইজ এদুয়ার্দো বাতিস্তা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমি পাকেতার টাকা দেব কীভাবে?’ তাঁর দাবি, এই সিদ্ধান্ত ক্লাবের ভবিষ্যৎ আয়, চলমান চুক্তি এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকেই ঝুঁকিতে ফেলেছে।
লুলার নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ৫ অক্টোবরের পর সব বেটিং বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলতে হবে। ক্লাবগুলো সমাধান খুঁজছে। কিন্তু সরকারের সঙ্গে তাদের চলতি সপ্তাহের বৈঠক স্থগিত হয়ে গেছে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত। এদিকে এই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার বা না দেওয়ার জন্য সিনেটের হাতে সময় আছে ১২০ দিন। বেটিং খাতের প্রধান সংগঠনগুলো এরই মধ্যে একে অসাংবিধানিক দাবি করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। লুলা অবশ্য নিজের অবস্থানে অনড়। তাঁর সাফ কথা, ‘হয় আমি জুয়া শেষ করব, নতুবা জুয়া ব্রাজিলকে শেষ করে দেবে।’
প্রেসিডেন্ট অবশ্য দাবি করছেন, ক্লাবগুলোর মোট আয়ের মাত্র ৭ শতাংশ আসে এই বেটিং কোম্পানিগুলো থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ঝুঁকি দুটি। প্রথমত বাণিজ্যিক সম্পদের মূল্য কমে যাওয়া। দ্বিতীয়ত আইনি জটিলতা। স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রি ইনস্টিটিউট ‘সাও দু এস্পোর্তে’র বিশেষজ্ঞ ফাবিয়ানা বেন্তেস বলেছেন, ঋণগ্রস্ত ও অনিশ্চয়তায় থাকা কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারলে তার মূল্য কমে যায়ই।
ক্রুজেইরোর মালিক পেদ্রো লরেনসো বলেন, ক্ষতির অঙ্ক এখনই নির্ধারণ করা কঠিন। তবে সেটি ‘অনেক বড়’ হবে, এটা নিশ্চিত। ফ্লুমিনেন্সের সভাপতি মাতেউস মন্তেনেগ্রো বলেছেন, নতুন স্পনসর খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না। তাঁর কথা, ‘সব ক্লাব একসঙ্গে বাজারে নামলে স্বাভাবিকভাবেই দর কমে যাবে।’ অবশ্য মিনাস জেরাইস অঙ্গরাজ্য সরকার ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ক্লাবগুলোকে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
লিবার্তাদোরেসের সর্বশেষ ১৪টি ফাইনালের ১২টিতেই খেলেছে কোনো না কোনো ব্রাজিলিয়ান দল। ট্রান্সফারমার্কেটের হিসাব বলে, দক্ষিণ আমেরিকার ১০টি দামি ক্লাবের ৯টিই ব্রাজিলের।
ফ্ল্যামেঙ্গো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অনলাইন বেটিং থেকে আসা এই অর্থই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলকে দক্ষিণ আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। ২০১৯ সাল থেকে সরকারি ব্যাংক কাইসা একোনোমিকা ফেদেরালের জায়গায় অঢেল টাকা নিয়ে এগিয়ে আসে এই জুয়ার কোম্পানিগুলো। এরপর থেকে লিবার্তাদোরেসের সর্বশেষ ১৪টি ফাইনালের ১২টিতেই খেলেছে কোনো না কোনো ব্রাজিলিয়ান দল। ট্রান্সফারমার্কেটের হিসাব বলে, দক্ষিণ আমেরিকার ১০টি দামি ক্লাবের ৯টিই ব্রাজিলের।
এখন বেটিং স্পনসরদের কাছ থেকে টাকা আসা বন্ধ হয়ে গেলে ব্রাজিলিয়ান ক্লাবগুলোর এই আধিপত্য থাকে কি না, সেটাই দেখার অপেক্ষা।