প্রিমিয়ার লিগে নতুন সমীকরণ, ৪ কারণে বদলে যাচ্ছে শিরোপার হিসাব-নিকাশ

প্রিমিয়ার লিগ ট্রফিপ্রিমিয়ার লিগ

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের পরিচিত শব্দগুলোর একটি ‘বিগ সিক্স’। শীর্ষ ছয় দল বোঝাতেই এ দুটি শব্দের ব্যবহার। কিন্তু নামটা যতই ছয় দলের হোক, গত কয়েক মৌসুমে শিরোপার লড়াই ঘুরপাক খেয়েছে মূলত দুই-তিন দলের মধ্যে। পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কখনো লিভারপুল, কখনো আর্সেনাল।

অন্যদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি ও টটেনহাম ব্যস্ত ছিল নিজেদের সংকট সামলাতে। তবে ২০২৬-২৭ মৌসুমের আগে বদলে যাচ্ছে পুরোনো সমীকরণ। চেলসি ও টটেনহাম দলবদলে রেকর্ড গড়েছে, সিটি ও লিভারপুলে এসেছেন নতুন কোচ আর চ্যাম্পিয়ন আর্সেনালকে মৌসুম শুরু করতে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এক খেলোয়াড়কে ছাড়া। সব মিলিয়ে বহুদিন পর প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা লড়াইটা আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত মনে হচ্ছে।

২০২৬-২৭ মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা লড়াইয়ে কেন তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা যেতে পারে, তার চারটি কারণ খুঁজে বের করেছে বিবিসি স্পোর্টস।

১. নতুন কোচ, নতুন প্রত্যাশা

প্রিমিয়ার লিগে সর্বশেষ ৯ মৌসুমে ছয়বারই চ্যাম্পিয়নস ম্যানচেস্টার সিটি। এমন দলকে ফেবারিট দৌড়ে রাখতেই হয়। তবে সিটি এবার তাদের ইতিহাসের সেরা কোচ পেপ গার্দিওলাকে ছাড়াই মাঠে নামছে। ৫৫ বছর বয়সী এই কোচ ১০ বছরে ১৭টি প্রথম সারির ট্রফি জিতে গত মৌসুম শেষে সিটি ছেড়েছেন। তাঁর জায়গায় ক্লাবের সাবেক সহকারী কোচ এনজো মারেসকাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত জানুয়ারিতে চেলসির কোচের পদ ছাড়ার পর থেকে মারেসকা কোনো দলের দায়িত্বে ছিলেন না।

এদিকে চেলসিও তাদের নতুন কোচ খুঁজে নিয়েছে। জানুয়ারিতে মারেসকার জায়গায় লিয়াম রোজেনিওরকে এনেছিল ব্লুজরা। তবে মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। বর্তমানে লিভারপুলের সাবেক ফুটবলার জাবি আলোনসো রয়েছেন চেলসির দায়িত্বে।

সাবেক লিভারপুল খেলোয়াড় জাবি আলোনসো এখন চেলসির কোচ
এএফপি

আলোনসো দুই বছর আগে বায়ার লেভারকুসেনের হয়ে অপরাজিত থেকে বুন্দেসলিগা জিতেছিলেন। তবে গত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদে তাঁর সময়টা খুব একটা ভালো কাটেনি। অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি ২০২৪-২৫ মৌসুমে লিভারপুলকে শিরোপা জেতানো আর্ন স্লটের স্থলাভিষিক্ত হবেন; কিন্তু লিভারপুল দায়িত্ব দিয়েছে আন্দনি ইরাওলাকে। গত মৌসুমে ষষ্ঠ হওয়া বোর্নমাউথের কোচ ছিলেন তিনি।

সব মিলিয়ে তিনটি বড় ক্লাব মাঠে নামছে নতুন তিনজন কোচের অধীন।

এ ছাড়া ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাইকেল ক্যারিক এবং টটেনহামের রবার্তো দি জেরবিকেও নতুনই বলা যায়। দুজনই গত মৌসুমের মাঝপথে দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে, বিগ সিক্সের পাঁচটি ক্লাবেই গত মৌসুমের শুরুর কোচ নেই। শুধু ২০১৯ সালে আর্সেনালের দায়িত্ব নেওয়া মিকেল আরতেতাই এখনো বহাল আছেন।

২. সালিবার অনুপস্থিতি কি আর্সেনালকে ভোগাবে

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন এবং একজন অভিজ্ঞ কোচ থাকায় প্রিমিয়ার লিগ জয়ের দৌড়ে আর্সেনালই এখন সবচেয়ে এগিয়ে।

তবে গানারদের একজন মূল খেলোয়াড়ের দীর্ঘমেয়াদি ইনজুরি আর্সেনালের টানা দ্বিতীয় ট্রফি জয়ের স্বপ্নে বাধা হতে পারে। ক্লাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার সময় পিঠে চোট পাওয়ায় ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা দীর্ঘ সময়ের জন্য মাঠের বাইরে থাকবেন।

উইলিয়াম সালিবাকে মৌসুমের শুরুতে পাচ্ছে না আর্সেনাল
ছবি: এক্স

২৫ বছর বয়সী সালিবা গত মৌসুমে আর্সেনালের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫০টি ম্যাচ খেলেছেন। সতীর্থ গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে তাঁর দুর্দান্ত রক্ষণভাগের জুটির কারণেই পুরো টুর্নামেন্টে আর্সেনাল সবচেয়ে কম গোল হজম করেছিল। এখন শিরোপা ধরে রাখার মৌসুমের শুরুতেই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ছে দলটি, প্রথম তিনটি ম্যাচের দুটিতেই প্রতিপক্ষ অ্যাস্টন ভিলা ও চেলসি।

পরিসংখ্যানও সালিবার গুরুত্বই বোঝায়। ২০২২ সালে অভিষেকের পর তাঁকে নিয়ে খেলা (মূল একাদশে) ১৩১ ম্যাচের ৬৮.৭ শতাংশ জিতেছে আর্সেনাল। অথচ তিনি না থাকা ২১ ম্যাচে জয়ের বিপরীতে হার ৪৭.৬ শতাংশ। ফলে মৌসুমের শুরুতেই তাঁর অনুপস্থিতি আরতেতার জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে।

৩. ইউরোপের বাড়তি চাপ, কার জন্য সুবিধা

গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড খেলেছিল মাত্র ৪০টি ম্যাচ, যা ১৯১৪-১৫ মৌসুমের পর তাদের সর্বনিম্ন। তুলনায় চেলসি খেলেছে ৫৯টি, টটেনহাম ৫২টি ম্যাচ। ইউনাইটেড লিগ শেষ করেছিল তৃতীয় হয়ে। অন্যদিকে চেলসি দশম আর টটেনহাম ১৭তম।

বেশি ম্যাচ খেললেই যে সফলতা কম আসবে, তা নয়। যেমন আর্সেনাল প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে, আবার চ্যাম্পিয়নস লিগ ও লিগ কাপের ফাইনালেও খেলেছে। তবে কম ম্যাচেরও কিছু বাড়তি সুবিধা থাকে। খেলোয়াড়দের বিশ্রামের সময় বাড়ে, একাদশে কম পরিবর্তন আনতে হয়, ইনজুরির ঝুঁকিও কমে। টটেনহামের গত মৌসুমই বড় উদাহরণ। মৌসুমজুড়ে ২৭ জন খেলোয়াড় চোটে পড়েছিলেন। এবার অবশ্য চেলসি ও টটেনহাম ইউরোপের কোনো প্রতিযোগিতায় নেই। বিপরীতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডসহ প্রিমিয়ার লিগের ৯টি ক্লাবকে সামলাতে হবে ইউরোপীয় সূচির বাড়তি চাপ।

সেই ধকলের কথা মাথায় রেখেই দল শক্তিশালী করেছে ইউনাইটেড। মিডফিল্ডে তারা দলে এনেছে আন্দ্রে সান্তোস ও ইউরি তিলেমান্সকে। তবে দীর্ঘ মৌসুমে এই সংযোজন যথেষ্ট হবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

৪. চেলসি ও টটেনহাম কি চমক দেখাতে পারবে

গত মৌসুমে চেলসি ও টটেনহাম—দুই দলের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। তেমন কিছু যাতে আবার না ঘটে, সে লক্ষ্যে এবারের ট্রান্সফার উইন্ডোতে মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করেছে দুই দল।

চেলসি এ গ্রীষ্মেই অ্যাস্টন ভিলা থেকে ১১ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ডে মরগান রজার্সকে কিনে ইংলিশ ফুটবলারের সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফির রেকর্ড গড়েছে। পাশাপাশি আতালান্তা থেকে এসেছেন মার্কো পালেস্ত্রা (৪ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড)। ড্যানি ওয়েলবেক, জর্ডান হেন্ডারসন ও ম্যাক্সাঁস লাক্রোয়ার সঙ্গেও চুক্তির আলোচনা চলছে।

মরগান রজার্সকে কিনেছে চেলসি
রয়টার্স

টটেনহামও পিছিয়ে নেই। এ গ্রীষ্মেই তারা ক্লাব রেকর্ড ২৩ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড খরচ করেছে। জুলাইয়ে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে স্পাররা পরপর দুইবার নিজেদের সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফির রেকর্ড ভেঙেছে। প্রথমে ৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডে ওয়েস্টহামের মিডফিল্ডার মাতেউস ফার্নান্দেসকে, পরদিনই ১০ কোটি পাউন্ডে নিউক্যাসল থেকে সান্দ্রো তোনালিকে সই করিয়েছে তারা। এ ছাড়া টটেনহাম ইয়ান পল ভ্যান হেককে (ব্রাইটন থেকে ৫ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড), মার্কোস সেনেসি, অ্যান্ড্রু রবার্টসন ও মার্টিন দুবরাভকাকে দলে যুক্ত করেছে।

নতুন কোচ, নতুন মুখ, ইউরোপীয় সূচির ভিন্নতা আর দলগুলোর বদলে যাওয়া বাস্তবতা—সব মিলিয়ে এবার প্রিমিয়ার লিগে আগেভাগে কোনো দলকে স্পষ্ট ফেবারিট বলা কঠিন। কয়েক মৌসুম পর ইংল্যান্ডের শিরোপা লড়াই হয়তো আবার ফিরতে যাচ্ছে সেই পুরোনো অনিশ্চয়তার রূপেই।