বিশ্বকাপে নেইমার: শিশুর প্রার্থনা, বাবার খোলাচিঠি ও স্পষ্টবাদী আনচেলত্তি

নেইমারকে আবারও হলুদ জার্সিতে দেখার অপেক্ষায় ব্রাজিলিয়ানরাএএফপি

বের্নার্দোর বয়স মাত্র তিন বছর। ফুটবল এ বয়সে তার অতটা বোঝার কথা নয়। বড়জোর বলে লাথি মেরে মজা পেতে পারে। কিন্তু এ বয়সেই সে নেইমারের জন্য অনুভব করেছে হৃদয়ের টান। তাই চলে গিয়েছিল ফোর্তালেজার গির্জায়। সেখানে সে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে নেইমারের সুযোগ পাওয়ার প্রার্থনা করেছে, ওদিকে বাকি দুনিয়া তাকে ভাইরাল করে দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

শেষ পর্যন্ত বের্নার্দোর মনের আশা পূরণ হয়েছে। নেইমারকে নিয়েই গতকাল রাতে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। মা–বাবাকে নিয়ে সেই দল ঘোষণা টিভিতে দেখেছে বের্নার্দো। শুধু বের্নার্দো কেন, ব্রাজিলের এবার বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণায় চোখ ছিল বের্নার্দোর মতো ছোট-বড় আরও অনেক ফুটবলপ্রেমীর; যেন ২০০২ ফিরে এসেছিল!

২৪ বছর আগে সেবার আলোচনায় ছিলেন রোমারিও। তাঁকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রাখা হবে কি না, এ নিয়ে বিভক্ত হয়েছিল ব্রাজিল। সেই আলোচনা কিংবা বিতর্কে যোগ দিয়েছিলেন স্বয়ং দেশের প্রেসিডেন্টও। এবারও ঠিক তা–ই। নেইমারকে নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয় ব্রাজিল, দেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত এ বিষয়ে মুখ খুলেছিলেন আর বের্নার্দোর মতো ভক্তদের কেউ কেউ ছুটে গিয়েছিলেন প্রার্থনালয়ে, কেউ মনে মনেই ধরনা দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তার দুয়ারে।

বিশ্বকাপে যে নেইমারকে দেখতেই হবে!

আনচেলত্তির মাধ্যমে সে আশা পূরণের পর বের্নার্দোর মা অরিডসন পাইভা সংবাদমাধ্যম গ্লোবোকে বলেন, ‘আমাদের পুরো পরিবার ফুটবলপ্রেমী এবং সে (বের্নার্দো) এই খেলার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ওর আঁকাআঁকির সবকিছুজুড়ে ফুটবল। ফুটবলই ওর দুনিয়া...ভিডিওটি যে এত সাড়া ফেলবে সেটা আমরা মোটেও আশা করিনি।’

ফোর্তালেজা থেকে ব্রাজিলের তেরেসিনা শহরে তাকানো যাক। এটা ব্রাজিলের পিয়াউই রাজ্যের রাজধানী। সেখানকার পানশালা ‘ফাচেইরো’ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, আনচেলত্তির বিশ্বকাপ দলে নেইমার থাকলে উপস্থিত সবার মধ্যে বিনা মূল্যে দুই রাউন্ড করে বিয়ার বিতরণ করা হবে। আনচেলত্তি নেইমারের নাম ঘোষণার পর ফাচেইরো পানশালার পরিস্থিতিটা কেমন হয়েছিল, সেটা আন্দাজ করা যায়।

আচ্ছা, সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন সম্ভবত নেইমার নিজেই। সেই যে ২০২৩ সালের মন্তেভিদিওতে ব্রাজিলের হয়ে সর্বশেষ ম্যাচ খেললেন, সেই ম্যাচে চোটে পড়ার পর এখনো দেশের হয়ে মাঠে নামতে পারেননি। ৩৪ বছর বয়স বলছে, এটাই হতে পারে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। সেখানে খেলতে নেইমার কতটা উন্মুখ ছিলেন, সেটা বোঝা যায় বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তাঁর সুযোগ পাওয়ার পর প্রকাশিত একটি খোলাচিঠিতে।

বাবার সঙ্গে নেইমার
রয়টার্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেইমারের বাবা লিখেছেন এই চিঠি, ‘মন্তেভিদিওতে সেই চোটের পর থেকে যে যন্ত্রণা আর সংশয় আমাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে, তা নিয়ে চাইলে আমি অনেক কিছুই লিখতে পারতাম, বাবা। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় মুখ বুজে আমাদের যেসব মন্তব্য শুনতে বা পড়তে হয়েছে, সেগুলোও মনে করিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আজ আনন্দের দিন...। এই মুহূর্তে শুধু সেসব শিশুর হাসিমুখই আমার চোখে ভাসছে, যারা যেখানেই তোমাকে দেখেছে, তোমার নাম ধরে চিৎকার করেছে। আমরা জানি, এই মুহূর্তটির জন্য তুমি কতটা উন্মুখ ছিলে, কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছ। সব কষ্ট, সন্দেহ ও নীরবতা পেরিয়ে ঈশ্বর এত দূর আমাদের সাহায্য করেছেন। অভিনন্দন, বাবা! আরেকটি বিশ্বকাপে আমি তোমার পাশেই থাকব!’

সেই বিশ্বকাপ শুরু হবে আগামী ১১ জুন। আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। নেইমারকে বিশ্বকাপ দলে রাখার ব্যাখ্যায় সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিলের কোচ আনচেলত্তি বলেন, ‘বদলি নামানোর কথা ভেবে নয়, দক্ষতা দিয়ে দলে সে কিছু যোগ করতে পারবে, সে জন্য নেওয়া হয়েছে। সে এক মিনিট, পাঁচ মিনিট, নাকি আদৌ খেলবে না, নাকি পুরো ৯০ মিনিটই মাঠে থাকবে কিংবা পেনাল্টি নেবে...কত মিনিট খেলবে? আমি জানি না।’

আনচেলত্তি এরপর বলেন, ‘তবে মাঠে যতটুকু সময় থাকুক না কেন, সেই সময়ের কার্যকারিতা কতটুকু, সেটাই আসল। আমি মনে করি, মাঠে দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স এবং নেইমার মাঠে থাকা অবস্থায় কার্যকারিতার ওপর আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করেন আনচেলত্তি
এএফপি

আনচেলত্তি কোনো রাখঢাক না রেখে সোজাসাপটাই বলেন, ‘আমি একদম পরিষ্কার, সৎ ও সোজাসাপটাভাবে বলতে চাই, নেইমার যদি খেলার যোগ্য হয়, তবেই সে খেলবে। অনুশীলনে কেমন করছে, সেটা তা নির্ধারণ করবে। আমার মনে হয়, সব প্রত্যাশার চাপ কেবল একজন খেলোয়াড়ের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।’

নেইমারের ক্যারিয়ারে এটা হবে চতুর্থ বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের মাত্র আটজন খেলোয়াড় চারটি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছেন—পেলে, কাস্তিলিও, নিল্টন স্যান্টোস, কাফু, রোনালদো, এমারসন লিয়াও, দালমা স্যান্টোস ও থিয়াগো সিলভা। নেইমার এই তালিকায় নাম লেখানোর সুযোগ পেয়েছেন কারও বাদ পড়ার মধ্য দিয়ে। মানে, আনচেলত্তি নেইমারকে বিশ্বকাপ দলে জায়গা দিতে নিশ্চয়ই অন্য কাউকে বাদ দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের মতে, সে খেলোয়াড়টি চেলসি ফরোয়ার্ড জোয়াও পেদ্রো।

ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড জোয়াও পেদ্রো
ইনস্টাগ্রাম/ জোয়াও পেদ্রো

নেইমারকে শুভকামনা জানিয়ে টিএনটি স্পোর্টসকে পেদ্রো বলেন, ‘নেইমার বিশ্বকাপে থাকবে। নেইমার তো নেইমারই। আর্জেন্টিনার জন্য যেমন লিওনেল মেসি, ব্রাজিলের জন্যও তেমনি নেইমার। নেইমার আমার আদর্শ।’

৩ বছর বয়সী বের্নার্দো থেকে ২৪ বছর বয়সী পেদ্রো—নেইমার আসলে বেশির ভাগ ব্রাজিলিয়ানেরই হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন আরও অনেক আগেই। এখন প্রতিদান দিতে পারেন কি না, সেটাই দেখার অপেক্ষা। ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তিদের কাতারে নাম লেখাতে সম্ভবত এটাই তাঁর শেষ সুযোগ।