পোস্টের নিচে অজেয় রুপনার নতুন ইতিহাস
একজন ফুটবলারের জন্য পুরো লিগ অপরাজিত থাকা গর্বের হতে পারে, কিন্তু একজন গোলকিপারের জন্য পুরো লিগে ‘ক্লিন শিট’ রাখা বা একটি গোলও না খাওয়া অনেকটা স্বপ্নের মতো। অবিশ্বাস্য সেই কাজই করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলকিপার রুপনা চাকমা।
পরশু কমলাপুর স্টেডিয়ামে শেষ হওয়া নারী ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী স্টারসের হয়ে ৯টি ম্যাচ খেলে একটি গোলও হজম করেননি তিনি। এই অনন্য কীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে রুপনা জিতে নিয়েছেন লিগের সেরা গোলকিপারের পুরস্কার।
কয়েক বছর ধরে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের ১ নম্বর গোলকিপার রুপনা। তাঁর ঝুলিতে আছে ২০২২ ও ২০২৪ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা গোলকিপার হওয়ার গৌরব। ২০২২ সাফে ৫ ম্যাচে খেয়েছিলেন মাত্র ১টি গোল, ২০২৪ সালে ৫ ম্যাচে ৪টি।
এবারের লিগে রাজশাহী ১০ ম্যাচে ৯০ গোল করে কোনো গোল খায়নি। দুর্বল কাচারিপাড়ার সঙ্গে রুপনাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়। সে ম্যাচে খেলেন জাতীয় দলের দ্বিতীয় গোলকিপার স্বর্না রানী মন্ডল। এ ছাড়া দু-তিনটি ম্যাচে রুপনাকে শেষ দিকে তুলে অন্যদের সুযোগ দেয় রাজশাহী।
লিগটা ছিল দেশসেরা রুপনার নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। তাতে জয়ী হয়ে উচ্ছ্বসিত রুপনা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এর আগে বসুন্ধরা কিংসের হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন দলের অংশ ছিলাম। কিংসের হয়ে এক লিগে ১টি গোল খেয়েছিলাম। গত লিগে চ্যাম্পিয়ন নাসরিন স্পোর্টিংয়ের হয়ে হজম করি ১টি গোল। এবার কোনো গোলই খাইনি। যদিও এই লিগটা কঠিনই হয়েছে। তবে আমার পণ ছিল, কোনো গোল খাব না।’
মাঠে শিউলি আজিম, ঋতুপর্ণা, আলপি আক্তারদের সঙ্গে দুজন নেপালি খেলোয়াড়ও সঙ্গী ছিলেন রুপনার। রক্ষণভাগ শক্তিশালী হওয়ায় চাপ কিছুটা কম থাকলেও চ্যালেঞ্জ ছিল না, তা বলা যাবে না। রুপনার মতে, ফরাশগঞ্জ ও সেনাবাহিনী ছিল বেশ শক্তিশালী। এই দুই দলের সঙ্গেই রাজশাহীর লড়াই হয়েছে।
ফরাশগঞ্জের বিপক্ষে রাজশাহী জেতে ১-০ গোলে ও পরশু শেষ ম্যাচে সেনাবাহিনীর বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে। এবারের লিগে বেশ কয়েকটি ভালো ‘সেভ’ করেছেন রুপনা। বিশেষ করে ফরাশগঞ্জ ম্যাচে কয়েকটি ‘সেভ’ হয়েছে দুর্দান্ত। পুরো লিগে তাঁর বিরুদ্ধে পেনাল্টি হয়েছে একটি, সেটিও ফিরিয়ে দেন এই গোলরক্ষক।
রাঙামাটির কুতুকছড়ির সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই অদম্য তরুণী জন্মের আগেই কৃষক বাবা গাজামনি চাকমাকে হারান। চার ভাই–বোনের মধ্যে সবার ছোট রুপনা নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বড় হয়েছেন। ২০২২ সালে সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে বাড়ি পেয়েছেন রুপনা। ফুটবলের হাতেখড়ি গ্রামের ঘাগড়া স্কুলে শান্তিমনি চাকমা নামের একজন কোচের অধীনে।
শুরুটা স্ট্রাইকার হিসেবে হলেও একদিন কোচ তাঁকে গোলকিপার হওয়ার প্রস্তাব দিলে রাজি হয়ে যান রুপনা। গোলকিপিং নিয়ে রুপনার উপলব্ধি, ‘গোলকিপিং একটি বড় দায়িত্বের জায়গা, যেখানে একটি ভুল যেমন দলকে ডুবিয়ে দিতে পারে, তেমনি একটি ভালো সেভ দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।’
গত বছর ভুটানের লিগে ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেডের হয়ে খেলেন কৃষ্ণা-মাসুরাদের সঙ্গে। সেখানেও পোস্টের নিচে তিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক। সাবিনা-মনিকা চাকমাদের দল পারো এফসির কাছে গোল হজম করার স্মৃতি মনে আছে, তবে রুপনা মনে করতে পারছেন না, অন্য দলের বিপক্ষে গোল খেয়েছেন কি না। তাঁর স্বপ্ন অবশ্য এখন আরও বড়, ‘ভুটান, নেপাল ছাড়া এশিয়ার অন্য কোনো দেশের লিগে সুযোগ পেলে অনেক ভালো লাগবে। আমার স্বপ্ন বড় কোনো লিগে খেলা।’
আপাতত সামনে মেয়েদের জাতীয় দলের গোলরক্ষক হিসেবেই পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে খেলতে ২০ বা ২১ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়া যাবে বাংলাদেশ নারী দল। তবে চীন, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পরাশক্তিদের মুখোমুখি হওয়ার আগে রুপনা সাহস হারাচ্ছেন না, ‘আমি প্রস্তুত। চেষ্টা করব নিজের সেরাটা দিতে।’