আলোনসোকে যেসব কারণে ছাঁটাই করল রিয়াল মাদ্রিদ
‘আজ যে কোচকে নিয়ে সমর্থকেরা উল্লাস করে তার অমরত্ব চাইছে, পরের রোববার সেই একই কোচকেই তারা মরতে বলবে’—ফুটবল কোচদের চাকরি নিয়ে ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইয়ে আক্ষেপ করে কথাটা লিখেছিলেন উরুগুয়ের বিখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো। বলা হয়, কোচদের বাক্স–পেটরা গোছানোই থাকে, কে জানে কখন আবার বিদায়ঘণ্টা বাজে! কোচের চাকরিতে নির্মম এই বাস্তবতা গতকাল রাতে হয়তো কঠিনভাবে উপলব্ধি করেছেন জাবি আলোনসো।
‘এলাম, দেখলাম এবং জয় করলাম’ ভঙ্গিতে কোচিং দুনিয়ায় জাবির আবির্ভাব, মাত্র সাত মাসের মাথায় বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব থেকে ছাঁটাই হয়ে মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখলেন তিনি। বুঝলেন, কোচের চাকরি মানে কাঁটার মুকুট পরে ডাগআউটে দাঁড়ানোর বিয়োগান্ত এক গল্পও, যেখানে শেষটা বেশির ভাগ সময় হতাশা মোড়ানোই হয়। প্রশ্ন হলো, বায়ার লেভারকুসেনের মতো দলকে ইতিহাস গড়ে যিনি শিরোপা জিতিয়েছিলেন, তিনি রিয়ালে এসে কোথায় ভুল করলেন? যেখানে পরিবেশটা ছিল তাঁর কাছে হাতে তালুর মতো চেনা। নাকি খুব দ্রুতই তাঁকে ছাঁটাই করে অন্যায় করেছে রিয়াল?
খেলোয়াড় হিসেবে আক্ষেপ বলে কোনো শব্দ নেই আলোনসোর প্রোফাইলে। বিশ্বকাপ, ইউরো, চ্যাম্পিয়নস লিগসহ সম্ভাব্য যা যা জিততে পারতেন সবই জিতেছেন তিনি। অবসর নিয়েছেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারদের একজন হিসেবে। এরপর নেমেছেন কোচিংয়ে। রিয়াল সোসিয়েদাদের বি দল দিয়ে শুরু করে ২০২২ সালে দায়িত্ব নেন লেভারকুসেনের।
পরের গল্পটা রীতিমতো রূপকথা! আলোনসোর লেভারকুসেনের দায়িত্ব নেওয়ার সময়টাও একেবারে পক্ষে ছিল না। সে সময় জেরার্দো সিওয়ানের অধীন ৮ ম্যাচের মাত্র ১টি জিতে অবনমনের শঙ্কায় কাঁপছিল বুন্দেসলিগার ক্লাবটি। এরপরও চ্যালেঞ্জটা নেন আলোনসো। অবনমন অঞ্চল থেকে লেভারকুসেনকে টেনে তোলেন লিগ টেবিলে ৬ নম্বরে। শুরুতে অনেকে এ অর্জনকে আকস্মিক চমক হিসেবে দেখলেও পরের মৌসুমে যা ঘটেছে, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য।
কখনো ট্রফি না জেতা লেভারকুসেন অপরাজিত থেকে বুন্দেসলিগার শিরোপাসহ ঘরোয়া ট্রেবল জেতে। ইউরোপা লিগে হার মানতে হয় ফাইনালে। সব মিলিয়ে বিস্ময়কর এক মৌসুম পার করেছিল আলোনসোর লেভারকুসেন। পরের মৌসুমে অবশ্য আর কোনো সাফল্য আসেনি। আর মৌসুম শেষে আলোনসো প্রত্যাশিতভাবে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে, যেখানে বিদায়ী কোচ কার্লো আনচেলত্তির স্থলাভিষিক্ত হন তিনি।
রিয়ালে শুরুতেই আলোনসো বিতর্কে আসেন লুকা মদরিচকে বাদ দিয়ে। যেভাবে কিংবদন্তি মদরিচকে ক্লাব ছাড়তে হয়েছিল, তা অনেকের দৃষ্টিতে অন্যায়। এরপরও সবার দৃষ্টি ছিল মাঠের পারফরম্যান্সে। পরিসংখ্যান বলছে, আলোনসোর অধীন রিয়ালের পারফরম্যান্স একেবারে খারাপ ছিল না। ৩৪ ম্যাচে, ২৪ জয়, ৬ হার ও ৪ ড্র।। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বার্সেলোনায় ৩৪ ম্যাচ পর কোচ হান্সি ফ্লিকের পারফরম্যান্সও ছিল একই রকম। ফ্লিক পরবর্তী সময়ে ঘরোয়া ‘ট্রেবল’সহ চারটি শিরোপা জিতেছেন। রিয়াল কি তবে একটু তাড়াহুড়াই করে বসল?
এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া কঠিন। কারণ, রিয়ালে আলোনসোর সময়টা ছিল বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ। ম্যাচের ফলে যা দেখা যাচ্ছে এবং ফলের বাইরের চিত্রটা মোটেই এক রকম নয়। লেভারকুসেনে আলোনসো নিজের কোচিং–দর্শনে বাজিমাত করেছিলেন, রিয়ালে যেটা প্রায় ছিলই না। ম্যাচ জেতার জন্য আলোনসোকে নির্ভর করতে হয়েছে বিশেষ কোনো মুহূর্ত কিংবা বিশেষ কোনো খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত দক্ষতায়। আরও সহজ করে বললে কিলিয়ান এমবাপ্পের ওপর।
আলোনসোর পুরো সময়টাতে রিয়াল স্বরূপে খেলতে পেরেছেন শুধু এমবাপ্পেই। রদ্রিগো কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রসহ বাকি তারকাদের প্রায় সবাই ঢাকা ছিলেন নিজেদের ছায়াতেই। এই খেলোয়াড়দের কাছ থেকে নিজেদের সেরাটা বের করে আনার মুনশিয়ানা দেখাতে পারেননি আলোনসো। ফলে দলগত ঐক্য ও কৌশলগত দর্শন সেভাবে ফুটেও ওঠেনি। বিশেষত ‘জাবিবল’ নামের যে কোচিং–দর্শনকে আলোনসো পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, রিয়ালে তা শুধু খাতা–কলমেই রয়ে যায়। গত সাত মাসে রিয়ালের আলোনসোর কৌশল বেশ রহস্যময় এক ঘটনা হয়েই থাকবে।
মাঠের এলোমেলো কৌশল ও পরিকল্পনার বাইরে রিয়ালের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোনসোর বোঝাপড়ার ঘাটতিও ছিল দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
এই সময়ে রিয়াল বেশির ভাগ ম্যাচ জিতেছে ঠিকই, কিন্তু পুরো সময়ে রিয়ালকে রিয়াল মনে হয়নি এবং আলোনসোকে মনে হয়নি আলনসো। তাঁর কাছ থেকে যে ‘ট্যাকটিক্যাল বিপ্লব’ দেখার প্রত্যাশা সমর্থকরা করেছিলেন, সেটার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি মাঠে। রিয়ালে আলোনসোর নিজেকে গুটিয়ে রাখা নিয়ে ক্লাব কিংবদন্তি গুটি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, জাবি আলোনসো একদিন আফসোস করবেন। কারও বাধা আসুক বা না আসুক, নিজের ভাবনাগুলো শেষ পর্যন্ত জোরের সঙ্গে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা উচিত ছিল তাঁর।’
এ সময়ে বড় ম্যাচ জেতার ক্ষেত্রেও রিয়ালের বেশ ঘাটতি ছিল। আলোনসোর অধীন রিয়াল যে ছয়টি ম্যাচ হেরেছে, তার ৫টিই বড় দলের বিপক্ষে, যেখানে সর্বশেষ স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে বার্সেলোনার কাছে হেরেছে রিয়াল। এ ছাড়া অন্য দলগুলোর মধ্যে রিয়াল হেরেছে পিএসজি, লিভারপুল, আতলেতিকো মাদ্রিদ, সেল্তা ভিগো এবং ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে।
এই নামগুলোই বড় দলের বিপক্ষে রিয়ালের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। পাশাপাপশি জয়ের পরিসংখ্যান যে সঠিক বার্তা দিচ্ছে না, তা–ও এখানে একরকম স্পষ্ট। বড় দলগুলোর বিপক্ষে রিয়ালের এমন ব্যর্থতার মূল কারণগুলোর অন্যতম নড়বড়ে রক্ষণ। আলোনসোর আক্রমণাত্মক ও হাইলাইন ডিফেন্সের ফুটবল বড় দলগুলোর বিপক্ষে বারবার ঝুঁকিতে ফেলেছে দলকে। এ ছাড়া প্রতি–আক্রমণেও বেশ ভুগেছে রিয়াল।
মাঠের এলোমেলো কৌশল ও পরিকল্পনার বাইরে রিয়ালের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোনসোর বোঝাপড়ার ঘাটতিও ছিল দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে আলোনসোর বিরোধ রিয়ালকে পুরো সময়ে ভুগিয়েছে। শুধু ভিনিসিয়ুসই নন, রিয়ালের বেশ কজন খেলোয়াড় আলোনসোর ওপর খুশি ছিলেন না।
এমনকি অনেকেই ছাঁটাইয়ের পর আলোনসোকে বিদায়ী বার্তা পর্যন্ত দেননি। ক্লাব ছাড়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়াতেও বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন আলোনসো। স্পেনের রেডিও লা কাদেনা সের জানিয়েছে, আলোনসো ছাঁটাই হওয়ার পর বলেছেন, ‘আপনি খেলোয়াড়দের হাতে এত ক্ষমতা দিতে পারেন না। ক্লাব যদি সব সময় খেলোয়াড়দের পক্ষ নেয়, তবে ড্রেসিংরুম পরিচালনা করা কঠিন।’ এ ছাড়া রিয়ালে নিজের গড়া দলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে ব্যর্থ হন আলোনসো। এটিও মাঠের লড়াইয়ে রিয়ালকে বেশ ভুগিয়েছে।
জাবির ছাঁটাই হওয়ার আরেকটি বড় কারণ, দলকে ভবিষ্যৎ দেখাতে না পারা। মৌসুমের প্রথম শিরোপা লড়াইয়ে রোববার হেরে গেছে রিয়াল। গত মৌসুমে সব হারানো রিয়ালের জন্য এটি বড় ধরনের ব্যর্থতা। এমনকি সামনে থাকা ট্রফিগুলোও যে রিয়াল জিততে পারে, সে আশাও দেখাতে পারেননি তিনি। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মোমেন্টাম হারানো নিশ্চিতভাবেই রিয়াল কর্তৃপক্ষকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল, যার শেষটা হয়েছে ক্লাব থেকে ছাঁটাইয়ের মধ্য দিয়ে।
আলোনসোর কোচিং ক্যারিয়ার অবশ্য কেবলই শুরু হয়েছে। আর এই পেশায় হুটহাট ছাঁটাইয়ের ঘটনা খুব অস্বাভাবিক কিছুও নয়। তবে যাঁরা আলোনসোর হাত ধরে রিয়ালে বিপ্লব দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁদের রিয়াল–আলোনসো জুটির পরিণতিটা হতাশাজনক এক অধ্যায় হয়ে থাকবে।