ফুটবল আছে, দল আছে—তবু খেলতে পারছে না আদু
প্রতি সপ্তাহেই একই দৃশ্য।
১২ বছর বয়সী এক কিশোর নিজের ফুটবল বুটের ফিতা বাঁধে, মাঠে নামে, অন্য সব শিশুর মতোই অনুশীলন করে। দৌড়ায়, পাস দেয়, গোল করে—সবকিছুতেই যেন দলের একজন স্বাভাবিক খেলোয়াড়।
কিন্তু রোববার এলেই দৃশ্য বদলে যায়।
ম্যাচের দিন তাকে মাঠে নামতে দেওয়া হয় না। গ্যালারিতে বসে থাকতে হয়। মাঠে বসে অন্যদের খেলা দেখাটা যন্ত্রণা হয়ে ওঠায় ইদানীং সে বাড়িতেই থাকে।
ছেলেটির নাম ‘আদু’। ক্যামেরুন থেকে আসা এই কিশোরের আসল প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। সে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উত্তর তেনেরিফের একটি ছোট ফুটবল ক্লাবে খেলে। বলা ভালো খেলার চেষ্টা করে। কারণ, অনুশীলনে মাঠে নামতে পারলেও অফিশিয়াল ম্যাচে তার জায়গা নেই।
আদুর পালক মা–বাবা আনা ও এদুয়ার্দো। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের এই দম্পতির সঙ্গে সে প্রায় দুই বছর ধরে আছে। তাঁদের ভাষায়, ফুটবল আদুর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই সে বল খোঁজে। হাতে যদি মাত্র ১০ মিনিট সময়ও থাকে, তবু সে বল নিয়ে খেলবে। যদি খেলতে না পারে, তবে ফুটবলের ভিডিও দেখবে। স্কুলে টিফিনের সময়টায়ও সে ফুটবল খেলে; কিন্তু সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যখন ম্যাচগুলো হয়, সেটা তাঁর জন্য কঠিন সময়। কষ্টের সময়।
শুরুতে আদু সতীর্থদের খেলা দেখতে মাঠে যেত। পরে ধীরে ধীরে সে আর যেতে চায় না। কারণ, নিজের দল খেলছে; কিন্তু সে খেলতে পারছে না। বার্তা সংস্থা ইএফইকে আনুর পালক মা–বাবা বলেন, ‘সে অনুশীলনে সব সময় থাকে; কিন্তু ম্যাচে নামতে পারে না। এখন সে বাড়িতে থাকতে পছন্দ করে, ম্যাচের ফল পরে জেনে নেয়।’
এই পরিস্থিতি শুধু আদুর জন্যই নয়, দলের অন্য খেলোয়াড়দের কাছেও অস্বাভাবিক। অনুশীলনে তারা আদুকে দেখে; কিন্তু ম্যাচে তাকে দেখতে পায় না। তার কোচ, সতীর্থ এবং অন্যরা প্রায় প্রতিদিন একই প্রশ্ন করে, ‘তোমার রেজিস্ট্রেশন কি হয়েছে?’
কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না।
এই সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে ফিফার একটি নিয়ম। ‘রেগুলেশনস অন দ্য স্ট্যাটাস অ্যান্ড ট্রান্সফার প্লেয়ার্স’ নির্দেশিকার ধারা ১৯–এ অপ্রাপ্তবয়স্ক খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক দলবদলের কথা বলা আছে। এই নিয়ম অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ফুটবলার এক দেশ থেকে অন্য দেশের ক্লাবে গিয়ে খেলতে পারবে না।
এমন নিয়মের পেছনে তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। একসময় ইউরোপের বড় বড় ক্লাব আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অল্প বয়সী শিশুদের তুলে আনত। তাদের মধ্যে কেউ ভবিষ্যতে বড় খেলোয়াড় হলে লাভ, না হলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হতো। যাদের ছেড়ে দিত, অনেকে রাস্তায় পড়ে থাকত। এটা একধরনের মানব পাচার এবং বাণিজ্যিক শোষণ বলে সমালোচনা ওঠে। মানবাধিকারকর্মীরা একে ‘ফুট–বলিং’ বা শিশুদের পাচার বলেও অভিহিত করেন।
এই মানব পাচার ও শোষণ ঠেকাতে ফিফা কঠোরভাবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের আন্তর্জাতিক দলবদল নিষিদ্ধ করে। কাগজে-কলমে এটি শিশুদের সুরক্ষার জন্য তৈরি একটি নিয়ম; কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি সাধারণ শিশুদের জন্যই নতুন সমস্যা তৈরি করছে।
ফিফার এই নিয়ম মূলত রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনার মতো বড় পেশাদার ক্লাবগুলোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল (২০১৪ সালে বার্সেলোনা আর ২০১৬ সালে রিয়ালকে এ জন্য ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছিল); কিন্তু বাস্তবে এখন এটি স্পেনের ছোট ছোট স্থানীয় ক্লাবের ওপরও একইভাবে প্রযোজ্য। ফলে আদুর মতো শিশুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ‘আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আর সেই ট্রান্সফার অনুমোদনের জন্য প্রয়োজন হয় দিস্তা দিস্তা নথিপত্র।
এই নথিপত্র জোগাড় করা রীতিমতো সপ্তচূড়া ছোঁয়ার মতো। একজন বিদেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক ফুটবলারের রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ফিফা কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে চায়। প্রথমত, মা–বাবার অবস্থান। শিশুটি যদি শুধু ফুটবল খেলার জন্য দেশ বদল করে থাকে, তাহলে খেলতে পারবে না। প্রমাণ করতে হবে যে মা–বাবা চাকরির জন্য বা অন্য কোনো কারণে বর্তমান দেশটিতে এসেছেন।
আদুর পালক পরিবার ক্লাব এবং তেনেরিফে ফেডারেশনের চাওয়া সব নথি জমা দিয়েছে; কিন্তু প্রতিটি ধাপ শেষ হলে নতুন একটি শর্ত সামনে আসে।
দ্বিতীয়ত, আবাসিক দূরত্ব। শিশুটির বাড়ি ও ক্লাবের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে হতে হবে। তৃতীয়ত, আইনি অভিভাবকত্ব। আদুর মতো অনেক শিশু স্প্যানিশ পরিবারের কাছে পালক সন্তান হিসেবে থাকে অথবা সরকারি তত্ত্বাবধানে থাকে; কিন্তু অনেক সময় ফিফা এই স্থানীয় অভিভাবকত্বকে যথেষ্ট মনে করে না। তারা আসল মা-বাবার আইনি অনুমতি বা নথি চায়, যা অনেক ক্ষেত্রে সংগ্রহ করা অসম্ভব। বিশেষ করে যেসব শিশু যুদ্ধ, দারিদ্র্য বা অভিবাসনের ঝুঁকিপূর্ণ পথ পেরিয়ে ভিনদেশে এসেছে।
আদুর মতো অনেকেই ছোট নৌকায়, স্থানীয়ভাবে যাকে ‘কায়াকো’ বলা হয়, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে স্পেনে পৌঁছায়। এদের কেউ ফুটবল খেলতে আসেনি। এসেছে জীবন বাঁচাতে; কিন্তু স্পেনে এসে তারা স্থানীয় শিশুদের মতো ফুটবল খেলতে চাইলে সেটিও আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার হিসেবে ধরা হয়। ফলে শুরু হয় জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
এই দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে আদু নিজেই একটি চিঠি লিখেছে ফিফার কাছে।
ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সে লিখেছে ‘আমি ১২ বছর বয়সী একজন আফ্রিকান ছেলে। আমি দুই বছর ধরে আমার নতুন পালক পরিবারের সঙ্গে আছি। আমি বাড়িতে, বন্ধুদের সঙ্গে এবং স্কুলে খুব খুশি। আমি ফুটবল খুব পছন্দ করি, কোনো অনুশীলন মিস করি না; কিন্তু আমি অন্য দেশের হওয়ার কারণে তারা আমাকে খেলতে দেয় না।’
চিঠির শেষের অংশে লেখা, ‘আমি আমার সতীর্থদের খেলা দেখতে যেতে চাই না; কারণ এতে আমার দুঃখ লাগে, বিরক্তও হই। সবাই আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি কবে খেলতে পারব; কিন্তু আমি জানি না। আমি শুধু অন্য বাচ্চাদের মতো খেলতে চাই।’
এই চিঠি নতুন কিছু নয়। তিন বছর আগে সুলেমান নামে আরেক শিশুর লেখা একটি চিঠি শত শত শিশুর সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রেখেছিল। তাই আদুর পরিবার এখনো আশা ছাড়েনি।
আদুর পালক পরিবার ক্লাব এবং তেনেরিফে ফেডারেশনের চাওয়া সব নথি জমা দিয়েছে; কিন্তু প্রতিটি ধাপ শেষ হলে নতুন একটি শর্ত সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আবার গিয়ে আটকে যায় ফিফার আন্তর্জাতিক নিয়মে। ফলে আদুর রেজিস্ট্রেশন এখনো ঝুলে আছে। পালক বাবা এদুয়ার্দোর ভাষায়, ‘তিন বছরে সে তিনটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে পেরেছে; কিন্তু অনুশীলন করেছে প্রায় ২৫০ বার।’
বর্তমানে ফিফা বলছে, এই শিশুরা যদি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে, তবেই তাদের খেলার অনুমতি দেওয়া সম্ভব; কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশুর আইনি অবস্থান শরণার্থী হিসেবে নির্ধারিত নয়। ফলে এই প্রক্রিয়াও আবার নতুন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করছে।
এই সমস্যা শুধু আদুর নয়, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে একই পরিস্থিতিতে আছে আরও অনেক আফ্রিকান শিশু। তারা সবাই স্থানীয় ক্লাবে অনুশীলন করে; কিন্তু অফিশিয়াল লিগে খেলতে পারে না।
এতে ক্লাবগুলোরও সমস্যা হয়। কারণ মাঠে নামানোর মতো খেলোয়াড় থাকলেও কাগজে-কলমে তাদের ব্যবহার করা যায় না। ফলে কখনো কখনো খেলোয়াড়ের অভাবে নিচের ক্যাটাগরি থেকে খেলোয়াড় আনতে হয়।
আদুর কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়। এদুয়ার্দো বলেন, এটি আদুর জন্য ‘একটি স্বস্তির পথ’। অভিবাসনের কঠিন বাস্তবতা, নতুন দেশ, নতুন জীবন—সবকিছুর মধ্যে ফুটবল তাকে মানসিকভাবে স্থির রাখে। তাই পরিবার চেষ্টা করেছিল তাকে বাস্কেটবল বা অ্যাথলেটিকসের দিকে আগ্রহী করতে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত উত্তর একটাই—সে ফুটবলই ভালোবাসে।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে আদুর পরিবার এখন আর তাঁকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চায় না। ‘আমরা তাকে বলতে চাই না যে সে আগামী সপ্তাহে খেলতে পারবে, তারপর আবার তিন মাস কেটে যাক’ বলছিলেন আনা ও এদুয়ার্দো।
তবু আনা ও এদুয়ার্দো একটি দিনের অপেক্ষায়। যেদিন আদু প্রথমবার তার ক্লাবের হয়ে অফিশিয়াল ম্যাচ খেলবে। তাঁদের কাছে সে দিনটি হবে উৎসবের, ‘ফলাফল কোনো বিষয় নয়। সে দিনটা হবে শুধুই উৎসবের।’
কারণ, সেদিন একটি শিশু অন্য সব শিশুর মতো মাঠে নামতে পারবে।