চোখ টিপেই কাজ সারতেন ব্রহ্মানন্দ

ট্রফি কেসের সামনে ব্রহ্মানন্দ সগুন কামত শঙ্খওয়ালকরপ্রথম আলো

মারগাঁও থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরত্ব। পানজি শহরের তালেইগাঁও গ্রামের সেন্ট মাইকেল চার্চের সামনের রাস্তা ধরে এগোলেই খোলা এক মাঠ। উল্টো দিকের ছিমছাম, শান্ত আবহে ঘেরা আবাসিক ভবনের এক ফ্ল্যাটের কলবেল বাজাতেই দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে ভারতীয় ফুটবলের জীবন্ত ইতিহাস—ব্রহ্মানন্দ সগুন কামত শঙ্খওয়ালকর।

স্ত্রী ও এক চিত্রশিল্পী কন্যাকে নিয়েই তাঁর নিভৃত সংসার। অন্য কন্যা থাকেন মারগাঁওয়ে। ট্রফি ও স্মারকে ঘেরা ড্রয়িংরুমে বসেই ৭২ বছর বয়সী কিংবদন্তি স্মৃতির ঝাঁপি উপুড় করলেন ৬ ফুট ১ ইঞ্চির এই দীর্ঘদেহী কিংবদন্তি গোলকিপার।

কণ্ঠে অহংকারের লেশমাত্র নেই, আছে প্রশান্তি। ১৯৫৪ সালের ৬ মার্চ এই তালেইগাঁও গ্রামেই তাঁর জন্ম, গোয়া তখনো পর্তুগিজ শাসনে। শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন, ‘ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময় দেখতাম পর্তুগিজ আর গোয়ানরা ফুটবল খেলত। তখনকার ফুটবল কৌশলটাই ছিল আলাদা। ৫ জন সেন্টার ফরোয়ার্ড, ২ জন মিডফিল্ডার আর ৩ জন ডিফেন্ডার। স্বাভাবিকভাবেই গোলকিপারদের ওপর অসম্ভব চাপ থাকত। তবু সেই ফুটবলটা ছিল দারুণ আকর্ষণীয়।’

বাবা সগুন কামত শঙ্খওয়ালকরের হাত ধরে মাঠে আসা ব্রহ্মানন্দ ছিলেন ৭ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে সবার ছোট। তিন ভাই ছিলেন ভালো ফুটবলার। ১৭ বছর বয়সে বিমানবাহিনীতে নাম লেখানোর প্রস্তাব পেলেও তার মাত্র ১১ দিন আগেই মা হারান ব্রহ্মানন্দ সগুন কামত শঙ্খওয়ালকর। সঙ্গে যে ক্লাবে খেলতেন, সেই পানভেল ক্লাবের সতীর্থদেরও অনুরোধ ছিল। তাই আর ফুটবল ছাড়েননি।

গ্লাভস হাতে ব্রহ্মানন্দ সগুন কামত শঙ্খওয়ালকর
সংগৃহীত ছবি

আদর্শ ছিলেন রাশিয়ার কিংবদন্তি লেভ ইয়াসিন। দিল্লির রাস্তা থেকে কেনা এক বইয়ে কিংবদন্তি রুশ গোলকিপারের এক গল্প তাঁকে ভীষণ প্রেরণা দেয়। গল্পটি বলতে বলতে তাঁর চোখ চকচক করে উঠল, ‘১৫ বছর বয়সে ডায়নামো মস্কোর কোচ অন্য ব্যস্ততায় সময়মতো অনুশীলনে আসতে পারেননি। কিন্তু ইয়াসিন ঠায় বসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছিলেন কোচের জন্য। এই গল্পটা আমাকে ভীষণ উজ্জ্বীবিত করত।’

১৯৭৩ সালে ভারতের কিংবদন্তি গোলকিপার পিটার থঙ্গরাজ তাঁকে প্রথম গোয়া দলে সুযোগ করে দিয়ে আলাদাভাবে অনুশীলন করান। এরপর জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ অর্থাৎ সন্তোষ ট্রফিতে গোয়ার জার্সিতে ১৭টি আসর খেলেন ব্রহ্মানন্দ। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে পরপর সন্তোষ ট্রফিতে দুবার চ্যাম্পিয়ন হয় গোয়া।

১৯৮৪ সালের চেন্নাই সন্তোষ ট্রফিতে পাঞ্জাবকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে ৫৭৬ মিনিট (ক্লিন শিট) কোনো গোল না খাওয়ার রেকর্ড গড়েন ব্রহ্মানন্দ। তবে রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন করতেই মৃদু হেসে তাঁর আপত্তি, ‘পুরো টুর্নামেন্টে আমরা ৮টি ম্যাচ খেলেছি এবং কোনো গোল খাইনি। সেই হিসাবে সেটা ৭২০ মিনিট! রেকর্ডটি এখনো সম্ভবত অক্ষত আছে।’

ব্রহ্মানন্দকে নিয়ে হেডিং
সংগৃহীত ছবি

সত্তর-আশির দশকে একটা কথা প্রচলিত ছিল যে কলকাতায় না খেললে তারকা হওয়া যায় না। কিন্তু কথাটাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গোয়ার সালগাওকরে ১৭ বছর খেলে ব্রহ্মানন্দ জয় করেছিলেন পুরো ভারতের মন। আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের হয়ে ১১৭টি ম্যাচে স্কোয়াডে থেকে মাঠে নামেন ৭০টিতে, যার মধ্যে ১৯৮৩-৮৬ সাল পর্যন্ত তিন বছর ছিলেন জাতীয় দলের অধিনায়ক।

এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন তাঁকে ‘প্লেয়ার অব দ্য ডিকেড (১৯৮৫-১৯৯৫)’-এর সম্মানে ভূষিত করে। প্রথম গোয়ান ক্রীড়াবিদ হিসেবে ১৯৯৭ সালে তিনি অর্জুন পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২২ সালে ভারত সরকার দিয়েছে সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার।

আরও পড়ুন
ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কার নিচ্ছেন ব্রহ্মানন্দ সগুন কামত শঙ্খওয়ালকর
সংগৃহীত ছবি

পেনাল্টি সেভে ওস্তাদ ব্রহ্মানন্দকে ডাকা হতো ‘দেয়াল’। একবার গোয়া ডার্বিতে এক তরুণ স্ট্রাইকারের বুলেট গতির শট আটকে ম্যাচ শেষে সেই তরুণের পিঠ চাপড়ে ব্রহ্মানন্দ বলেছিলেন, ‘তুমি যখন বলটা নিয়ে ডান দিকে ঘুরলে, তোমার পায়ের পজিশন আর চোখের নজর দেখেই বুঝে যাই কোন অ্যাঙ্গেলে শটটা মারবে। তাই কষ্ট করে লাফাতে যাইনি।’

কলকাতার দর্শকদের স্লেজিং ও গালিগালাজ সামলেও একবার ইডেন গার্ডেনে ম্যাচ জিতিয়ে ফেরেন ব্রহ্মানন্দ। খেলা শেষে সেই সমর্থকেরাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি পাথরের তৈরি?’ রসিক ব্রহ্মানন্দের জবাব ছিল, ‘তোমরা চিৎকার করে আমারই সুবিধা করে দিচ্ছিলে। আমার ডিফেন্ডাররা সতর্ক হয়ে যাচ্ছিল, ফলে আমার কাজও সহজ হয়ে যায়।’

পেনাল্টির সময় ব্রহ্মানন্দ গোললাইনে দাঁড়িয়ে মিষ্টি করে হেসে একটা চোখ টিপতেন। তাতেই নাকি কাজ হয়ে যেত। বিপক্ষ খেলোয়াড় এই কাণ্ড দেখে ঘাবড়ে গিয়ে নাকি দুর্বল শট মারতেন। ব্রহ্মানন্দ হাসতে হাসতে বলেন, ‘ফুটবলটা আনন্দের খেলা। একটু হাসলেই যদি বিপক্ষের মনোযোগে সমস্যা হয়, তাহলে হাসব না কেন!’

আরও পড়ুন

কলকাতার দর্শকদের ভালোবাসার গল্পও শোনালেন ব্রহ্মানন্দ। ১৯৮০ সালের ফেডারেশন কাপে মোহনবাগানের গৌতম সরকারের এক দুর্দান্ত শট ফ্লাইং সেভে গ্রিপ করেন ব্রহ্মানন্দ। পরদিন এক বাঙালি দর্শক হোটেলের রিসেপশনে তাঁর জন্য একটি চিঠি আর নিজের সই করা ‘ব্ল্যাংক চেক’ রেখে যান। অনুরোধ করেন টাকা তুলে ডিনার করার। ব্রহ্মানন্দ বললেন, ‘চেকটি আমি বাড়ি নিয়ে আসি এবং রিপ্লাই দিই, চেকটি আমি ভাঙব না, স্মৃতি হিসেবে রেখে দেব।’

ব্রহ্মানন্দ সগুন কামত শঙ্খওয়ালকরের পরিচিত ছবি
সংগৃহীত ছবি

আরেক ঘটনা। ১৯৮২ এশিয়াডের ক্যাম্পের জন্য গোয়া থেকে ট্রেনে কলকাতা যাওয়ার পথে চরম কষ্টে কাটে ৭ গোয়ান ফুটবলারের। ব্রহ্মানন্দ আবেগঘন হয়ে শোনালেন সেই রেলযাত্রায় এক বাঙালির আতিথেয়তার গল্প, ‘সেখানে এক বাঙালি আমার কথা জানতে পেরে নিজের জায়গাতে আমাকে ঘুমানোর জন্য জোরাজুরি করেন। অসম্ভব খাতির-যত্ন করেছিলেন।’

১৯৭৫ থেকে ১৯৮৬—এক দশকের বেশি সময় সামলেছেন জাতীয় দলের গোলপোস্ট। ১৯৯৫ সালে অবসর নিয়ে বর্তমানে গোয়া প্রফেশনাল লিগের ক্লাব জিইএনও এফসির ডিরেক্টর ও মেন্টর। সাইক্লিং তাঁর পুরোনো শখ। ৩৭ বছর বয়স থেকে ইয়োগা করেন, যেটি তাঁর সুস্থতার মূল চাবিকাঠি।

মাঠের সেই অপরাজেয় ‘দেয়াল’ আজও ভাঙেনি। তালেইগাঁওয়ের শান্ত ড্রয়িংরুমে বসে যাঁর উপস্থিতি মনে করিয়ে দিল—কিংবদন্তিরা কখনো ফুরিয়ে যান না।

আরও পড়ুন