আর্জেন্টিনার মেধা, সামর্থ্য আর উইং প্লের কাছেই হারল ইংল্যান্ড

আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের লড়াই মানেই বাড়তি উত্তেজনা। তবে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল দুই দলের কৌশল আর মেধার পার্থক্য। প্রথমার্ধে প্রচুর ধাক্কাধাক্কি ও শরীরী লড়াই হয়েছে।

দুই দলের খেলোয়াড়দের মাথায় ১৯৮২ সালে ঐতিহাসিক ফকল্যান্ড যুদ্ধও কাজ করছিল নিশ্চিতভাবে, যে যুদ্ধে আর্জেন্টিনা হেরেছিল। একই সঙ্গে ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের কথাও মনে ছিল ইংল্যান্ডের। তবে রেফারি খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন ম্যাচটা।

অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো দুটি ইউরোপিয়ান দলের ফাইনাল হবে, কিন্তু তা হচ্ছে না। ফাইনালে মুখোমুখি হবে লাতিন আর ইউরোপের দুই পরাশক্তি। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা যোগ্যতর দল হিসেবেই টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে। দিন শেষে ইংল্যান্ড মূলত আর্জেন্টিনার মেধা, দক্ষতা ও সামর্থ্যের কাছেই হার মেনেছে।

দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করে খেলেছে। এই আধিপত্যের মূলে ছিল তাদের  উইং প্লে। ফুটবলে ফ্লাঙ্ক (উইং) থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণ থেকে প্রচুর গোল আসে এবং আর্জেন্টিনা সেটাই দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে।

লাওতারো মার্তিনেজের উচ্চতা বেশি না হলেও তিনি ইংল্যান্ডের দুজন লম্বা ডিফেন্ডারের মাঝখান থেকে দুর্দান্তভাবে লাফিয়ে নিখুঁত হেডারে জয়সূচক গোলটি করেন। সাধারণত বল যখন ওভাবে উইং থেকে আসে, তখন ডিফেন্ডার ও গোলকিপারের জন্য বলের ফ্লাইট বোঝা কঠিন হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

এই ম্যাচে লিওনেল মেসির ভূমিকা ছিল চতুর। প্রথমার্ধে খুব বেশি বল টাচ না করলেও দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর অবস্থান প্রতিপক্ষকে ব্যাকফুটে রাখে। মেসি একদম সাইড লাইনের কাছাকাছি রাইট ফ্লাঙ্কে বেশি অবস্থান করছিলেন, যাতে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ করতে আসতে সময় লাগে। মেসি সেখান থেকে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকেছেন এবং ম্যাচের দুটি গোলই এসেছে তাঁর অ্যাসিস্ট থেকে।

বক্সের বাইরে থেকে এনজো ফার্নান্দেজের অসাধারণ শটে সমতা ফেরানো গোলটা মনে রাখার মতো। ইংলিশ গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড আগেই কিছুটা বাঁ দিকে সরে গিয়েছিলেন, আর বলটি দারুণভাবে বাঁক খেয়ে জালে জড়ায়। ফলে পিকফোর্ড চেষ্টা করেও বলের নাগাল পাননি।

লাওতারো মার্তিনেজের গোল উদ্‌যাপন
রয়টার্স

পিছিয়ে পড়েও আর্জেন্টিনা হাল ছাড়েনি। গত ম্যাচেই তারা সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ১–১ সমতা থেকে একদম শেষ মুহূর্তে দুটি গোল করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। নকআউটের সবগুলো ম্যাচই তীব্র লড়াই করে শেষ মুহূর্তের গোলে জেতা আর্জেন্টিনার প্রবল আত্মবিশ্বাসেরই প্রমাণ।

আগের দিন প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে বলই ধরতে দেয়নি স্পেন, আর এই ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে হলো উল্টো। ৬০-৬৫ মিনিট পর ইংল্যান্ডের ক্লান্তির বিপরীতে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক শ্রেষ্ঠত্বই ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয়ার্ধে একটা সময় দেখা গেল ইংল্যান্ড আর দৌড়ে পারছে না, বলের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। তারা যেন বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল কখন ম্যাচটা শেষ হবে।

আরও পড়ুন

ম্যাচের প্রথমার্ধটা মূলত ছিল সমান সমান। ইংল্যান্ড লম্বা বলে খেলার পরিকল্পনা নিয়েছিল এবং পেছন থেকে গোলকিপার পিকফোর্ড লম্বা করে বলগুলো দুই ফ্লাঙ্কে ফেলছিলেন। এই পরিকল্পনা থেকে অ্যান্থনি গর্ডন ডান প্রান্ত থেকে আসা সার্ভিস থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু গোল করার পর থেকেই ইংল্যান্ড কেন জানি খুব রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে; তারা চাইল গোলটা শুধু ধরে রাখতে।

ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল ভালো ট্যাকটিশিয়ান হওয়া সত্ত্বেও কেন এমন হলো, তা বোঝা গেল না। তারা বেশি ডিপে গিয়ে ব্লক করা শুরু করল। আর্জেন্টিনার মতো কোয়ালিটি খেলোয়াড়সমৃদ্ধ দলের বিপক্ষে এভাবে বেশিক্ষণ টিকে থাকা যায় না। ইংল্যান্ডকে রক্ষণাত্মক হতে হয়েছে সম্ভবত নিজেদের হাতে সেভাবে কোয়ালিটি খেলোয়াড়ের অভাবের কারণে। আর এই রক্ষণাত্মক মানসিকতাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এর মাধ্যমে তারা আর্জেন্টিনার হাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজে থেকেই যেন ছেড়ে দেয়।

সমতা ফেরানো গোলের পর মেসি ও এনজো ফার্নান্দেজের উদ্‌যাপন
রয়টার্স

ইংল্যান্ড কোনোভাবেই আর্জেন্টিনার উইং থেকে আসা আক্রমণগুলো বন্ধ করতে পারছিল না। তাদের হারের অন্যতম বড় কারণ ছিল এই ফ্লাঙ্ক বা উইং বন্ধ করতে না পারা। ম্যাচ যত গড়িয়েছে, খেলা তত আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। একটি গোল করা ছাড়া ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ আর্জেন্টিনার গোলকিপার মার্তিনেজকে তেমন কোনো পরীক্ষাতেই ফেলতে পারেনি।

উচ্ছ্বসিত মেসি
রয়টার্স

ম্যাচে যখন আর্জেন্টিনা সমতা ফিরিয়ে আনে, তখন মানসিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে যায় ইংল্যান্ড। বোঝাই যাচ্ছিল, ইংল্যান্ড লিড ধরে রাখতে পারবে না।
গোলকিপার পিকফোর্ড বক্সের ভেতর একটা হেড আর একটা ফ্লিক সেভসহ দ্বিতীয়ার্ধে কয়েকটি ভালো সেভ করেন। পিকফোর্ড খুব কাছ থেকে বেশ কটি সেভ না করলে আমার তো মনে হয় ব্যবধান ৪-১ হতে পারত। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলটার আগে বল পোস্টেও লেগেছিল।

ইংল্যান্ডের জন্য এটি ছিল ১৯৬৬ সালের পর দীর্ঘ ৬০ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা খরা কাটানোর ভালো একটা সুযোগ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেরা রক্ষণাত্মক কৌশলে গিয়ে এবং আর্জেন্টিনার মেধার কাছে হেরে সেই সুযোগটি হারাল। অন্যদিকে বর্তমান ফর্ম ও আত্মবিশ্বাস দেখে মনে হচ্ছে, আর্জেন্টিনাই শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারে।

লেখক: সাবেক ফুটবলার ও কোচ