ভিনিসিয়ুসই কেন বারবার বর্ণবাদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়েন
মঙ্গলবার রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের বেনফিকা-রিয়াল মাদ্রিদ ম্যাচে একটাই গোল হয়েছে। গোলটি ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের। তবে রিয়ালের জয়ের পর ২৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড গোলের কারণে নয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বর্ণবাদকেন্দ্রিক ঘটনায়।
ম্যাচের মাঝে ভিনিসিয়ুস রেফারিকে জানান, বেনফিকার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি তাঁকে ‘বানর’ বলে সম্বোধন করেছেন। এ ঘটনায় খেলা বন্ধ থাকে প্রায় ১০ মিনিট। ম্যাচের পরেও এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় বয়ে যায়। প্রেস্তিয়ান্নি অবশ্য বর্ণবাদী শব্দ ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ভিনিসিয়ুস ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গো থেকে রিয়ালে যোগ দেন ২০১৮ সালে। তখন থেকে বর্ণবাদী আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছেন তিনি, যার বেশির ভাগই স্পেনের ভেতরে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আতলেতিকো মাদ্রিদের সমর্থকেরা রিয়াল মাদ্রিদের অনুশীলন মাঠের কাছাকাছি একটি সেতুতে ভিনিসিয়ুসের কুশপুত্তলিকা ঝুলিয়ে দেন।
চার মাস পর ভ্যালেন্সিয়ার মেস্তায়া স্টেডিয়ামে তাঁকে গালাগাল করা সমর্থকদের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি হন ভিনিসিয়ুস। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। পরে ভিনিকে আক্রমণের দায়ে স্পেনের একটি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন ভ্যালেন্সিয়ার তিন সমর্থক। ২০২৪ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ভিনি লেখেন, ‘আমি বর্ণবাদের শিকার নই। আমি বর্ণবাদীদের আতঙ্ক। স্পেনের ইতিহাসে এই প্রথম ফৌজদারি দণ্ড আমার জন্য নয়। এটি সব কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জন্য।’
২০২৫ সালে ২০২২ সালের এক ঘটনায় রিয়াল ভায়াদোলিদের পাঁচ সমর্থককে আদালত ‘হেট ক্রাইমের’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন, যা ফুটবল স্টেডিয়ামে অপমানজনক মন্তব্যের ঘটনায় স্পেনে এ ধরনের প্রথম রায় ছিল। এ ছাড়া সর্বশেষ জানুয়ারিতে কোপা দেল রের ম্যাচের দিন ভিনিকে নিয়ে আলবাসেতের দর্শক নিজেদের স্টেডিয়ামের বাইরে বর্ণবাদী স্লোগান দেন।
তবে এ ঘটনাগুলো ছিল ভিনি বনাম দর্শকের মধ্যে। এবারই প্রথম কোনো খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ তুলেছেন ভিনি। প্রেস্তিয়ান্নি জার্সিতে মুখ ঢেকে ওই শব্দটি বলেছিলেন ইঙ্গিত করে ভিনিসিয়ুস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন,‘বর্ণবাদীরা মূলত কাপুরুষ। তারা কতটা দুর্বল, তা দেখাতে নিজেদের জার্সি মুখে ঢোকাতে হয়।’ ভিনিসিয়ুসের সতীর্থ কিলিয়ান এমবাপ্পে তো প্রেস্তিয়ান্নিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বহিষ্কারের দাবিই জানিয়েছেন সাংবাদিকদের মাধ্যমে, ‘এই লোকটির আর কখনো চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার যোগ্যতা নেই—এটাই আমার মতামত।’
ভিনিই কেন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু
অনেকেই প্রশ্ন করেন, কেন ভিনিসিয়ুসই এত ঘন ঘন বর্ণবাদী আক্রমণের লক্ষ্য হন, রিয়াল মাদ্রিদের অন্য খেলোয়াড়েরা কেন নন? রিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচের পর বেনফিকা কোচ জোসে মরিনিও ভিনিসিয়ুসের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে বলেন, ‘কিছু একটা ভুল আছে, কারণ সে যেখানেই খেলতে যায়, প্রতিটি স্টেডিয়ামেই এমন কিছু ঘটে। যে স্টেডিয়ামে ভিনিসিয়ুস খেলে, সব সময় কিছু না কিছু ঘটে।’
এটা নিঃসন্দেহ যে ভিনিসিয়ুসের খেলার ধরন ও আচরণ উসকানিমূলক, যদিও এ সবকিছুই বর্ণবাদী অপমানের ন্যায্যতা দেয় না। এমবাপ্পে রিয়ালে যোগ দেওয়ার আগপর্যন্ত কয়েক বছর ধরে ভিনিসিয়ুসই ছিলেন দলটির আক্রমণভাগের প্রধান অস্ত্র। এখনো তিনি রিয়ালের সেরা ড্রিবলার। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের বারবার চ্যালেঞ্জ করা, কখনো ড্রিবলিং দক্ষতায় তাঁদের বিব্রত করা—এর ফলে তিনি বেশি ফাউলের শিকার হন। গ্যালারির প্রতিপক্ষ দর্শকও তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন, যাঁদের অনেকে আবার ফাউলের শিকার হয়ে পড়ে গেলে মনে করেন এই ব্রাজিলিয়ান ডাইভ দিয়েছেন।
আবেগ প্রকাশের দিক থেকে ভিনিসিয়ুস সংযত নন, সব সময়ই প্রাণবন্ত। রেফারিদের কাছে তিনি যে জোরালো ভাষায় ও আচরণে অভিযোগ ও আবেদন করেন, তা প্রতিপক্ষের সমর্থক ও খেলোয়াড়দের অসন্তুষ্ট করে তোলে। কখনো কখনো ভিনিই স্বাগতিক সমর্থকদের দেশে সরাসরি ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে নিজের সাফল্য বা তাঁদের ব্যর্থতা তুলে ধরেন।
কিছু সমর্থক তাঁকে উত্তেজিত, বিচলিত ও মনোযোগচ্যুত করে তাঁর খেলা নষ্ট করতে বর্ণবাদী ভাষা প্রয়োগকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন।
ভিনিসিয়ুসের গোল উদ্যাপনও অনেক সময় সমালোচনার জন্ম দেয়, বেনফিকার বিপক্ষে যেমন গোল করার পর স্বাগতিক সমর্থকদের সামনে কর্নার ফ্ল্যাগের সঙ্গে নাচ শুরু করেন। ওই সময় তাঁর দিকে মাঠে কিছু একটা নিক্ষেপ করা হয় আর সে ঘটনার পরই তাঁর সঙ্গে প্রেস্তিয়ান্নির বাগ্বিতণ্ডা হয়।
এমবাপ্পে এক্স পোস্টে ভিনির উদ্যাপনের প্রসঙ্গটি টেনে বলেন, ‘নাচো ভিনি, আর দয়া করে কখনো থেমো না। ওরা কখনো আমাদের বলে দিতে পারবে না আমরা কী করতে পারি বা পারি না।’