নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল শেষ। বিশ্বজয়ী স্পেনের খেলোয়াড়েরা মাঠে পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ কেউ টিভিতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। তখনই মাঠের এক দিকে আলোকচিত্রীদের ছোট্ট জটলা। তিন বছরের একটি ছেলে ফুটবল নিয়ে কারিকুরি করার চেষ্টা করছে, তাকে ঘিরে আছে বেশ কিছু ক্যামেরা; কিন্তু শিশুটি কে? তার প্রতি সবার এত মনোযোগই–বা কেন!
যাঁরা এবার বিশ্বকাপ ফুটবল দেখেছেন, তাঁরা জানেন, পপকালচারের ভাষায় এই শিশু ‘ইন্টারনেট সেনসেশন’। তার পরিচয়ও অনেকেরই জানা থাকার কথা। স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী ১৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামালের ভাই সে। বিশ্বকাপজুড়েই সে এমন ‘ভাইরাল’ কাণ্ডকীর্তি করেছে, পরশুর ম্যাচের পর টিভি সেটের সামনে থাকলে অনেকেই হয়তো বলে ফেলেছেন, ‘আরে, এটা ইয়ামালের সেই ভাইটা না!’
ম্যাচ শেষে মাঠে ঢুকে তিন বছরের কেইন এক ছুটে চলে গেছে ১৯ বছর বয়সী ভাইয়ের কাছে, উঠে পড়ে তাঁর কোলে। এরপর ভাই যখন সতীর্থ-বান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, সে শুরু করেছে দুষ্টুমি। কখনো নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে গিয়ে তাঁদের হ্যাট নিজের মাথায় পরেছে, কখনো আলোকচিত্রীর ক্যামেরার সামনে ‘পোজ’ দিয়েছে ডিগবাজি খেয়ে। কখনো আবার এক সমবয়সীকে জুটিয়ে তাকে ‘নাটমেগ’ করে ছুটছে বল নিয়ে, পরেছে নিজের মাথার চেয়ে তিন গুণ বড় বেসবল ক্যাপও।
ম্যাচ শেষে স্মৃতিস্মারক হিসেবে যখন অনেকে ফুটবল নেটের জাল কেটে নিয়ে যাচ্ছিলেন, কেইনও তখন সেখান থেকে একটুকরা জাল নিয়ে মালা হিসেবে পরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে ভাই ও অন্যদের। এক হাতে বিশ্বকাপ ট্রফির রেপ্লিকা; আর অন্য হাতে নিজের শরীরের কাছাকাছি সমান ফুটবল নিয়ে জিব বের করে পোজও দিয়েছে। এসবই মনে করিয়ে দেয় তার বয়স তিন বছর। তবে ক্যামেরা যখন তার দিকে ঘোরে, তখন তার ‘হুংকার’ দেখে বয়স অনুমান করাটা একটু কঠিনই হয়ে পড়ে।
ইয়ামালের ভাইয়ের ভাইরাল হওয়াটা অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। দুই বছর আগে যখন স্পেন ইউরো জিতল, তখন সে ঠিকমতো হাঁটতেও পারত না; কিন্তু তখন থেকেই কেইন ভাইয়ের কোলে চড়ে নিত্যনতুন ‘মিম’ উপহার দিত নেটিজেনদের। এই বিশ্বকাপে জিব বের করা ছবির পেছনেও একটা মজার কাহিনি আছে। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের ম্যাচের সময় সে এ কাজটি করেছিল। সেই ম্যাচ শেষে ইয়ামাল হাসতে হাসতে বলেছেন, ‘আমি ফিজিওর কাছে ছিলাম। তখন ও মায়ের ফোন থেকে আমাকে কল করে বলেছিল, “আগামীকাল আমি জিব বের করব।” তাই বড় পর্দায় ওকে সেটা করতে দেখে আমার খুব হাসি পেয়েছিল।’
কেইনকে দেখে যে কারও শিশুতোষ চলচ্চিত্র বেবিস ডে আউট বা হোম অ্যালোন–এর কথাও মনে পড়ে যেতে পারে, যেখানে বুদ্ধি খাটিয়ে দুষ্টুদের শিক্ষা দিয়েছিল দুই শিশু। কেইনকে অবশ্য তেমন ‘দুষ্টের দমন’ করতে হয়নি, তবে তার জনপ্রিয়তা এখন ওই দুই সিনেমার ওই দুই শিশুর মতোই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন তাকে নিয়ে একটি লাইন ছড়িয়ে গেছে, ‘এই পৃথিবীটা কেইনের, আর আমরা শুধু সেখানে বাস করছি।’ ইয়ামালের পরিবার জানিয়েছে, এর মধ্যেই নাকি কেইনের কাছে বাণিজ্যিক পণ্যের দূত হওয়ার প্রস্তাবও চলে এসেছে!
২০২২ সালে জন্ম কেইনের। ইয়ামাল আর তার বাবা আলাদা হলেও মা একই। ইয়ামালের মা শেইলা এবানা একজন টিকটকার, তাঁর ভ্লগেও খুঁজে পাওয়া যায় এই শিশুসন্তানকে। কেইন আবার বড় ভাই ইয়ামালের ভীষণ ন্যাওটা। ইয়ামাল নিয়মিতই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে টিকটক নাচ কিংবা বাড়ির বাগানে ফুটবল খেলার ভিডিও আপলোড করেন। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তার নাচ; কিংবা মিষ্টি উচ্চারণে নিজের প্রিয় বার্সেলোনা খেলোয়াড়দের নাম বলার ভিডিও—সবই আগে থেকে ভাইরাল।
বার্সেলোনা লা লিগা জয়ের পর ইয়ামালের সঙ্গে ট্রফি উদ্যাপনেও দেখা গেছে কেইনকে। ইয়ামালও ভাইকে ভালোবাসেন ভীষণ, ‘আমার ছোট ভাইকে এতটা খুশি দেখলে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। আমার ভাই আমার কাছে সবকিছু। আমি তাকে ভীষণ ভালোবাসি। অনেক সময় মনে হয়, সে যেন আমারই ছেলে।’
শুধু ভাই নয়, ইয়ামাল এই অল্প বয়সেই পরিবারের বাকিদের স্বপ্নও পূরণ করছেন। নিজের বেড়ে ওঠার দিনগুলোর কথা ইয়ামাল ভোলেননি এখনো, ‘আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। আমার বাবাকেও জীবিকার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। কখনো কখনো তিনি রাস্তায় পড়ে থাকা জিনিস কুড়িয়ে এনে বিক্রি করতেন, যাতে আমাদের জন্য খাবার জোগাড় করা যায়।’
বড় হলে নিশ্চয়ই কেইনকে সেই গল্প শোনাবেন ইয়ামাল। সমান্তরালে নতুন নতুন গল্প তৈরি হতে থাকবে কেইনকে নিয়েও। তিন বছর বয়সেই যাকে চিনে গেছে বিশ্ব, সে কি আর এখানেই থেমে থাকবে!