ফ্রাঙ্কো বারেসি: ঝড়ের সঙ্গে লড়ে যাওয়া এক লাল–নীল নাবিক
ইতালির লোম্বার্দি অঞ্চলের ছোট শহর ত্রাভালিয়াতো শান্ত পরিবেশ ও ঐতিহ্যবাহী উত্তর ইতালীয় জীবনধারার জন্য বিশেষ পরিচিত। শহরটি ব্রেসিয়ার খুব কাছাকাছি হওয়ায় রোমান নিদর্শন ও ঐতিহাসিক স্থাপনার দর্শন খুব সহজেই পাওয়া যায়। এমন এক শহরে ১৯৬০ সালের ৮ মে জন্মগ্রহণ করেন ফ্রাঙ্কো বারেসি, ইতালিয়ান ফুটবলের রমরমা সময়ে। তখনই দুটি বিশ্বকাপের মালিক ইতালি বারেসির জন্মের ঠিক ১০ বছর পর (১৯৭০) খেলবে তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল।
পেলে-রিভেলিনোদের পরাক্রমশালী ব্রাজিলের কাছে ফাইনালে হারলেও ইতালিয়ান ফুটবলে তখন বেড়ে উঠছিল আরেকটা প্রজন্ম। ইতালিয়ান ফুটবলের সেই ডিএনএন যাঁরা পরবর্তী সময়ে বহন করে নিয়ে গেছেন, তাঁদেরই একজন ছিলেন বারেসি। তবে নিজের ভেতরে লুকানো অসামান্য প্রতিভা স্বাভাবিকভাবে বারেসি নিজেও শুরুতে বুঝতে পারেননি। তাই জীবনে প্রথম ফুটবলে পা রাখার সময় বারেসির কল্পনাতেও ছিল না, একদিন তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হয়ে অবসরে যাবেন।
বারেসি ফুটবল খেলাটা শুরু করেছিলেন আনন্দ পেতে। ভালো লাগত বল নিয়ে আক্রমণে যেতে। কিন্তু কে জানত, অদৃষ্ট আড়ালে বসে ভিন্ন এক গল্পের জাল বুনছিল! হতে পারে, ’৭০–এর বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ৪ গোল খেয়ে হারের যন্ত্রণা বারেসির ভেতর রোপণ করে দিয়েছিল রক্ষণ সামলানোর অদম্য এক বীজ।
বাস্তবে বিষয়টা অবশ্য অন্যভাবে ঘটেছিল। কোচ ও পরামর্শকেরা বারেসরির মধ্যে এমন কিছু গুণ খুঁজে পেয়েছিলেন, যা তখন তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। আক্রমণপ্রবণ এক কিশোর থেকে কিংবদন্তি ডিফেন্ডারে রূপান্তরের এ গল্পই তাঁর জীবনের প্রতিচ্ছবি। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সাফল্য অর্জন করা। জীবনের লড়াইয়ের প্রতিফলনই যেন দেখা গেছে তাঁর রক্ষণে। ম্যারাডোনা, রোমারিও থেকে শুরু করে বিশ্বের সেরা সব ফরোয়ার্ডকে অসংখ্যবার থামিয়ে বারেসি গড়ে তুলেছিলেন এমন এক দেয়াল, যা ভাঙা ছিল প্রতিপক্ষের জন্য দুঃস্বপ্ন।
বারেসির বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুটা যে গভীর এক ব্যক্তিগত বেদনার গল্প দিয়ে হয়েছিল, সেখানে ফেরা যাক। বয়স ১৭ পেরোনোর আগেই মা–বাবা দুজনকেই হারান বারেসি। ১৩ বছর বয়সে মাকে এবং চার বছর পর বাবাকে। বড় ভাই জিউসেপ্পের হাত ধরে সেই কঠিন মুহূর্ত পার করেন বারেসি। তখনো কে জানত, যে ভাইয়ের হাত ধরে জীবনের ঝড় সামলাচ্ছেন, একদিন ফুটবল তাঁকে সেই ভাইয়ের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
দুই ভাইয়ের মাঝখানে কঠিন দেয়ালটা তুলে দিয়েছিল মিলানের দুই ক্লাব এসি মিলান ও ইন্টার মিলান। মাত্র ১২ বছর বয়সে এসি মিলানের বয়সভিত্তিক দলের হয়ে যাত্রা শুরু করেন বারেসি। অনাথ বারেসি মিলানকে একটি সাধারণ ক্লাবের বদলে পরিবার হিসেবেই বেছে নেন। সবচেয়ে কঠিন সময়ে এই ক্লাবই তাঁকে দিয়েছে আশ্রয়, শৃঙ্খলা ও নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা।
বারেসি বলেন, ‘এসি মিলান আমার জীবনের একধরনের ভরসা ছিল। আমার মনে হয়, আমি যদি নিজের শহরেই থেকে যেতাম, তাহলে হয়তো হতাশায় ডুবে যেতাম। কিন্তু নতুন পরিবেশ, নতুন শহর আমাকে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর শক্তি দিয়েছে। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় আমাকে অতীতের কষ্ট ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।’
সেই যে ১২ বছর বয়সে মিলানের হাত ধরেছিলেন, আর কখনো তা ছাড়েননি। ১৯৭২ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত ২৫ বছরের দীর্ঘ এক যাত্রায় মিলানের পোস্টার বয় ছিলেন বারেসি। মিলানের হয়ে বারেসির অর্জনের তালিকা রূপকথার গল্পের মতো। ২০ বছরের পুরো পেশাদার ক্যারিয়ার তিনি কাটিয়েছেন একমাত্র এসি মিলানেই। এই সময়ে জিতেছেন ছয়টি সিরি ‘আ’ শিরোপা, তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ/চ্যাম্পিয়নস লিগসহ দেশি-বিদেশি অসংখ্য ট্রফি।
এসি মিলানের সবচেয়ে কঠিন সময়েও ক্লাবের প্রতি তাঁর আনুগত্যে কোনো ভাটা পড়েনি। দল যখন সিরি ‘বি’তে নেমে গিয়েছিল, তখনো ক্লাব ছাড়েননি তিনি। সুখ-দুঃখে একই ক্লাবের পাশে থাকার এ অঙ্গীকারই তাঁকে মিলানের কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে।
বারেসি বলেন, ‘ক্লাবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ধীরে ধীরে খুব গভীর হয়ে উঠেছিল। সেই সম্পর্কের সঙ্গে ছিল কৃতজ্ঞতাও। অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকলেও আমি এসি মিলানের ওপরই বিশ্বাস রেখেছি। ক্লাব কঠিন সময় পার করলেও কখনো চলে যেতে চাইনি।’ তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এসি মিলান স্থায়ীভাবে তুলে রেখেছে বারেসির ৬ নম্বর জার্সি। ক্লাবের ইতিহাসে তাঁর অনন্য অবদানের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে আছে এই সম্মান।
মিলানের রক্ষণের অতন্দ্রপ্রহরী বারেসির জাতীয় দলের গল্পটা গর্ব ও আক্ষেপের। তিনি যে তিনটি বিশ্বকাপে খেলেছেন, প্রতিবারই দলকে নিয়ে শেষ করেছেন সেরা তিনের মধ্যে—১৯৮২ সালে চ্যাম্পিয়ন, ১৯৯০ সালে তৃতীয় এবং ১৯৯৪ সালে রানার্সআপ। এ এক বিরল অর্জন। তবে বিশ্বকাপে বারেসির শেষটা হয়েছে বেদনায়।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালই বারেসির মানসিক দৃঢ়তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। টুর্নামেন্ট চলাকালে মেনিসকাসে চোট পেয়েও মাত্র ২৪ দিনে সেরে উঠে ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে ইতালিকে নেতৃত্ব দেন। অসাধারণ খেললেও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে তাঁর পেনাল্টি মিস ইতালির হৃদয় ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও রবার্তো বাজ্জোর পেনাল্টি মিসের কারণে বারেসির ব্যর্থতার গল্পটা খানিকটা আড়ালেই থেকে গেছে।
বারেসি অবশ্য কখনো অতৃপ্ত ছিলেন না, ‘আমার বিশ্বাস, আমি খুব কম খেলোয়াড়ের একজন, হয়তো একমাত্র, যে তিনটি বিশ্বকাপে খেলেছে এবং প্রতিবারই সেরা তিনের মধ্যে শেষ করেছে। একটি প্রথম, একটি দ্বিতীয় ও একটি তৃতীয় স্থান—এটি সবার জন্যই একটি রেকর্ড।
যে ভাইয়ের সঙ্গে অল্প বয়সে মা–বাবাকে হারানোর ধাক্কা সামলেছেন, তাঁর বিপক্ষে মাঠে মুখোমুখি হওয়াটাও কম রোমাঞ্চকর ছিল না। বারেসি ছিলেন এসি মিলানের অধিনায়ক, জিউসেপ্পে নগরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টার মিলানের। মিলান ডার্বিতে দুই ভাইয়ের মুখোমুখি লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের সব সময় ভিন্ন এক মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে ডার্বি শুরুর আগে দুই ভাইয়ের অধিনায়কের স্মারক (পেন্যান্ট) বিনিময়ের দৃশ্য ইতালিয়ান ফুটবলের অন্যতম প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে আছে। এটি দেখিয়েছে, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও পারিবারিক বন্ধন ও পারস্পরিক সম্মান কীভাবে অটুট থাকে।
বারেসি ফুটবল ছেড়েছিলেন প্রায় ৩০ বছর আগে, কিন্তু এত দিনে একটুও ম্লান হননি। আজকের ফুটবলে, যেখানে ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ক আর বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে, সেখানে বারেসি আনুগত্য, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং নীরব মর্যাদার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে আছেন। আজও সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারের আলোচনায় শীর্ষ সারিতেই উচ্চারিত হয় বারেসির নাম, ডাচ কিংবদন্তি ফন বাস্তেন তাঁকে বলেছিলেন, ‘ডিফেন্ডারদের ইয়োহান ক্রুইফ।’
নিজের জীবনের মতো বারেসি ইতালির ফুটবলের উত্থান-পতনেরও সাক্ষী হয়েছেন। আজ তাঁর মৃত্যুর মুহূর্তে ‘আজ্জুরি’দের ফুটবল–ঐতিহ্য ধুলায় লুটাচ্ছে। এমন বিষণ্ন সময়ে বারেসির মৃত্যু ইতালির ফুটবল–গৌরবকে যেন আরও মলিন করে দিল।