বিশ্বকাপের মিথ: দুটি টিকে গেল, দুটি ফাইনালের অপেক্ষায়
বিশ্বকাপ শুধু চ্যাম্পিয়নই ঠিক করে না, চার বছর ধরে চলে আসা নানা বিশ্বাস, পরিসংখ্যান আর অলিখিত নিয়মেরও বিচার করে। কোনোটি ভেঙে যায়, কোনোটি আরও শক্ত হয়। প্রায় শেষ হতে চলা ২০২৬ বিশ্বকাপও ব্যতিক্রম নয়। টুর্নামেন্টের ফাইনালের আগেই কয়েকটি বহুল আলোচিত ‘মিথ’ টিকে গেছে। আবার কয়েকটির ভাগ্য ঝুলে আছে ১৯ জুলাইয়ের আর্জেন্টিনা–স্পেন ফাইনালের ওপর।
যে দুটি বহুল আলোচিত ‘মিথ’ এরই মধ্যে সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে, তার একটি বর্তমান ব্যালন ডি’অরজয়ীকে ঘিরে। ১৯৫৮ সালে পুরস্কারটি প্রবর্তনের পর থেকে বিশ্বকাপে বর্তমান ব্যালন ডি’অরজয়ী খেলোয়াড় কখনো শিরোপা জেতেননি। এবারের বিশ্বকাপে সেই তকমা ছিল উসমান দেম্বেলের। কিন্তু ফ্রান্স সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ায় দেম্বেলের সঙ্গেও বদলায়নি ইতিহাস। সেই মিথও অটুট থাকল।
আরেকটি ‘মিথ’ বিদেশি কোচের হাতে বিশ্বকাপ না ওঠার। ১৯৩০ থেকে ২০২২—২২টি আসরের প্রতিটিতেই চ্যাম্পিয়ন দলের কোচ ছিলেন সেই দেশেরই নাগরিক। এবার সেই ধারায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিলেন ব্রাজিলের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি আর ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ টমাস টুখেল।
শেষ ষোলোয় নরওয়ের কাছে হেরেই ব্রাজিলের বিদায় ঘটেছে। বাকি ছিল টুখেলের ইংল্যান্ড। বুধবার রাতে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ইংল্যান্ডের হারে তিনিও বিদায় নিয়েছেন। অর্থাৎ টানা ২৩তম বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হবে স্বদেশি কোচের দল। ফাইনালে থাকা লিওনেল স্কালোনি ও লুইস দে লা ফুয়েন্তে—দুজনই নিজ নিজ দেশের নাগরিক।
তবে সবচেয়ে আলোচিত ‘মিথ’টির নিষ্পত্তি এখনো বাকি।
ফিফা র্যাঙ্কিং চালু হওয়ার পর ১৯৯৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত কোনো আসরেই টুর্নামেন্ট শুরুর দিনের এক নম্বর দল চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। এবার ১১ জুন বিশ্বকাপ শুরুর দিন শীর্ষে ছিল আর্জেন্টিনা। মাঝে একটু বদল এসেছিল। আগে ফিফা র্যাঙ্কিং হালনাগাদ হতো টুর্নামেন্টের আগে ও পরে। এবার হচ্ছে প্রতিটি ম্যাচের পর।
যে কারণেই টুর্নামেন্টের মাঝপথে ফ্রান্স এক নম্বরে উঠে গিয়েছিল। ফাইনাল নিশ্চিত করার পর গতকাল আবারও শীর্ষস্থান ফিরে পেয়েছে আর্জেন্টিনা। আগামীকাল ফ্রান্স-ইংল্যান্ডের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের পর আরেক দফা র্যাঙ্কিং হালনাগাদ হবে। তাতে এক নম্বর জায়গা থেকে সরে গেলে আর্জেন্টিনা হয়তো খুশিই হবে। আর র্যাঙ্কিং না বদলালে রোববার লিওনেল মেসিরা নামবেন একটা ‘মিথ’ ভেঙে দিতে—এক নম্বরও দলও শিরোপা জিততে পারে।
আরেকটি বড়সড় ‘মিথ’ ভাঙার সুযোগ থাকছে স্পেনের সামনেও। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত আগের তিনটি বিশ্বকাপ—১৯৭০, ১৯৮৬ ও ১৯৯৪ জিতেছে লাতিন আমেরিকার দল (যথাক্রমে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল)। এবারও ফাইনালে আছে লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা। স্পেন জিতলে ভাঙবে উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে ইউরোপীয়দের না জেতার বহুল আলোচিত সেই মিথ, আর আর্জেন্টিনা জিতলে প্রবণতাটি আরও একবার সত্যি বলে প্রমাণিত হবে।
বিশ্বকাপের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই। কখনো এটি রূপকথা নতুন করে লেখে, কখনো পুরোনো মিথকে আরও দৃঢ় করে। ২০২৬-এর ফাইনাল তাই শুধু একটি শিরোপাই নির্ধারণ করবে না, বিশ্বকাপের কয়েকটি বহুল আলোচিত মিথেরও শেষ পরীক্ষা নেবে।