চিরনিদ্রায় ‘টেলিগ্রাম যুগের’ সেই শেষ নায়ক: মাঠের ধুলা ছেড়ে অনন্তলোকে রণজিৎ দাস

২০০৬ সালে গ্রামীণফোন-প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পেয়েছিলেন রণজিৎ দাস। ২০২২ সালের ২৯ মার্চ সিলেটে নিজ বাড়িতে সেই সম্মাননা স্মারক হাতেছবি: আনিস মাহমুদ

গতকাল ভোরের আলো ফুটেছিল বিষাদ মেখে। ফুটবল-ভলিবল মাঠ কাঁপানো মোস্তফা কামালের বিদায়ের শোক কাটতে না কাটতেই এল আরও এক দুঃসংবাদ। সিলেটের নির্জন পাহাড়ি রাস্তার ঢালে, নিজের প্রিয় ‘কমলাকান্ত ভবন’ শূন্য করে চিরতরে চোখ বুজলেন ৯৩ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলকিপার রণজিৎ দাস। আজ সোমবার সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সিলেটের একটি হাসপাতালে।

শেষ হলো একটি যুগের। যে মানুষটি পঞ্চাশের দশকে ঢাকার মাঠ মাতিয়েছেন ফুটবল-হকি খেলে, তিনি গত কয়েক বছর ছিলেন বড় বেশি নিঃশব্দে। স্মৃতি হারিয়েছিলেন, কথাও বলতে পারতেন না।

সিলেটের করের পাড়ায় রণজিৎ দাসের বাড়িতে মানুষের আনাগোনা ছিল সব সময়। গত কয়েক বছর সেই কোলাহলের মধ্যে নীরবে বসে থাকতেন তিনি। অথচ মাঠের রণজিৎ দাস ছিলেন এর উল্টো। ১৯৫৫ সালে ইস্পাহানি ক্লাব দিয়ে ফুটবল যাত্রা শুরু, তারপর আজাদ স্পোর্টিংয়ের সেই সোনালি দিন। ১৯৫৮ সালে তাঁর অধিনায়কত্বেই আজাদ স্পোর্টিং জিতেছিল লিগ শিরোপা।

দৈনিক পাকিস্তানে ছাপা হওয়া এই ছবি আতিকুল্লাহ হকি প্রতিযোগিতায় যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ন্যাশনাল ব্যাংক দলের। যেখানে আছেন গোলরক্ষক রণজিৎ দাসও
রণজিৎ দাসের অ্যালবাম থেকে

মোহামেডানের সাদা-কালো জার্সিতেও ছড়িয়েছেন মুগ্ধতা। ১৯৫৭ সালে কলকাতা মোহামেডানের হয়ে অল ইন্ডিয়া ডুরান্ড কাপে খেলেছেন। তাঁর খেলার ফর্দ করতে গেলে তা সহজে শেষ হবে না। খেলা ছেড়ে হয়েছেন কোচ। আজাদ স্পোর্টিং ফুটবল দলকে কোচিং করিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। আজ যখন ক্রীড়াঙ্গন একের পর এক নক্ষত্র হারাচ্ছে, তখন রণজিৎ দাসের চলে যাওয়া সেই শূন্যতা আরও বাড়িয়ে দিল।

আরও পড়ুন
খেলোয়াড়ি জীবনে রণজিৎ দাস
রণজিৎ দাসের অ্যালবাম থেকে

১৯৩২ সালের ২৯ অক্টোবর জন্ম। ছিলেন 'মাল্টি-ট্যালেন্টেড' ক্রীড়াবিদ। ফুটবল থেকে হকি—সবখানেই ছিল তাঁর পদচারণ। পূর্ব পাকিস্তান ফুটবল দলের গোলপোস্ট আগলেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। পূর্ব পাকিস্তান হকি দলের অধিনায়ক ছিলেন তরুণ গোলকিপার রণজিৎ দাস। দাপিয়ে হকি খেলেছেন ষাটের দশকে।

তবে মনের এক কোণে আজীবন একটা ক্ষত বয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। উচ্চতা কিছুটা কম হওয়ার কারণে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ পাননি। আক্ষেপ করে একবার এই প্রতিবেদককেই বলেছিলেন, ‘উচ্চতা কম ছিল বলেই হয়তো হলো না।’

কিন্তু তাঁর সেই আক্ষেপ ঘুচিয়েছিল ২০০৬ সালে প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা। সম্মাননা নেওয়ার পরও প্রায়ই এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যখন সিলেট থেকে ঢাকায় আসতেন, তাঁর চোখে-মুখে ফুটে উঠত তৃপ্তির হাসি। প্রথম আলোর স্বীকৃতি পাওয়ার পরের বছরই জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পান, যা তাঁর আরও আগেই পাওয়া উচিত ছিল।

২০০৬ সালে প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা ট্রফি হাতে রণজিৎ দাস
প্রথম আলো

শেষ জীবনে স্ত্রী রেখা দাসই ছিলেন তাঁর অবলম্বন। যে মানুষটি একসময় মাঠের সব অজানা গল্প অনর্গল বলে যেতেন, নিজেকে বলতেন ‘টেলিগ্রাম যুগের মানুষ’, সেই মানুষটি শেষ সময়ে এসে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে কিংবদন্তি জাকারিয়া পিন্টু চলে গেছেন, তার আগে জহিরুল হক, আর আজ রণজিৎ দাস। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের মহিরুহগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন।

সিলেটের সেই পাহাড়ি রাস্তার ঢালে এখন আর কেউ ফুটবল-হকির গল্প শোনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না। রণজিৎ দাস নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া বীরত্বগাথা এ দেশের ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে।