কেন এটিকেই বলা হচ্ছে ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ
ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ বললে কোন লিগের ছবি আপনার মনে সবার আগে ভেসে ওঠে?
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগই মনে হওয়ার কথা অনেকের। স্প্যানিশ লা লিগাও হতে পারে। কেউ কেউ আবার জার্মান বুন্দেসলিগার নাম বলতে পারেন। তবে এ তিনটি তো নয়ই, ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগ হিসেবে আরও যাদের বিবেচনা করা হয়, সেই ইতালিয়ান সিরি ‘আ’ বা ফ্রেঞ্চ লিগ ‘আ’ও ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ নয়। এমনকি এক সময়ের জনপ্রিয় ডাচ লিগ এরিডিভিসি বা উদীয়মান প্রতিভাবানে ভরা পর্তুগালের প্রিমেরা লিগের কথা কারও মনে উঁকি দিতে পারে।
তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা আর লিগের ভেতরের ভারসাম্যসহ বেশ কিছু মানদণ্ডে ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ পোল্যান্ডের এক্সট্রাক্লাসা। বিশ্লেষণভিত্তিক ফুটবল প্ল্যাটফর্ম অপটা অ্যানালিস্টের প্রতিবেদন বলছে, এক্সট্রাক্লাসা এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি দলই অন্য যেকোনো দলকে হারাতে পারে।
কেন সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ
পোলিশ লিগ ও ইউরোপের অন্যান্য লিগের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দ্য অ্যানালিস্ট দেখিয়েছে, মৌসুমের নির্দিষ্ট সময়ে পয়েন্ট তালিকায় দলগুলোর ভেতরে পয়েন্ট ব্যবধান, শক্তির ভারসাম্য ও সাম্প্রতিক ইতিহাস মিলিয়ে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে এক্সট্রাক্লাসা। প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা বুঝতে কয়েকটি বিষয় দেখা যেতে পারে।
১. শিরোপা দৌড়ে ১৫ দল!
ইউরোপের বড় লিগগুলোর দিকে তাকালে সাধারণত দেখা যায় মৌসুমের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে শিরোপার লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে দুই বা তিনটি দলের মধ্যে। কিন্তু এক্সট্রাক্লাসায় চিত্র ভিন্ন। পোলিশ ফুটবলের শীর্ষ লিগটিতে খেলে ১৮টি ক্লাব। এর মধ্যে ২৬ ম্যাচ শেষে ৪৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে লেচ পোজনান। শীর্ষ পাঁচের বাকি চার দল আছে পাঁচ পয়েন্টের মধ্যেই। আট পয়েন্ট ব্যবধানের মধ্যে আছে শীর্ষ আট দল।
অথচ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে শীর্ষে থাকা আর্সেনাল এখন দ্বিতীয় স্থানধারী ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে ১৫ পয়েন্টে এগিয়ে। লা লিগায় বার্সেলোনা রিয়ালের চেয়ে এগিয়ে ৪ পয়েন্টে, তবে অন্য দলগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কমপক্ষে ১৫ পয়েন্টের।
পোলিশ লিগে পয়েন্ট তালিকায় দলগুলোর স্বল্প ব্যবধান বোঝাচ্ছে, তাদের শক্তিমত্তা কাছাকাছি, ম্যাচে ফল অনুমান কঠিন এবং প্রতিটি ম্যাচই লিগ টেবিলের অবস্থান বদলে দিতে পারে।
২. পয়েন্ট হারায় সবাই
দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশি বলে সব দলই পয়েন্ট হারায়। পয়েন্ট তালিকায় যারা শীর্ষে, তারাও এরই মধ্যে ৩৪ পয়েন্ট হারিয়েছে। এই সবার পয়েন্ট হারানোর প্রবণতার কারণে ১৫ নম্বরে থাকা লেগিয়া ওয়ারশকেও এখন পর্যন্ত শিরোপা লড়াই থেকে ছিটকে দেওয়া যাচ্ছে না। গাণিতিক হিসাব-নিকাশে ৩০ পয়েন্টধারী দলটিও আছে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নের খাতায়।
৩. গোল পার্থক্যেও কাছাকাছি
শক্তির ভারসাম্যের আরেকটি সূচক হলো গোল পার্থক্য। বড় লিগগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় শীর্ষ দলগুলো +৩০ বা +৪০ গোলে এগিয়ে থাকে। নিচের দলগুলো বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থাকে। কিন্তু পোলিশ লিগে গোল পার্থক্য খুবই কম, অনেক দলেরই গোল ব্যবধান কাছাকাছি। যেমন শীর্ষে থাকা পোজনানের গোলব্যবধান ৯, দুইয়ে থাকা লুবিনের ১০, তিনে থাকা বিয়াউইস্তকের ৯, চারে থাকা গর্নিকের ৪, পাঁচে থাকা ভিসুয়া পুয়ৎস্কের ৩। যা বোঝাচ্ছে ম্যাচগুলো খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় এবং বড় ব্যবধানে জয় কম।
২৬ রাউন্ড শেষে এক্সট্রাক্লাসা পয়েন্ট তালিকা
৪. অননুমেয় চ্যাম্পিয়ন
পোলিশ লিগে কে চ্যাম্পিয়ন হবে, তা আগাম অনুমান করা খুবই কঠিন। লা লিগা, প্রিমিয়ার লিগ বা বুন্দেসলিগায় যেভাবে দুই-তিনটি দলের নাম অনায়াসে বলে দেওয়া যায়, সেটা এক্সট্রাক্লাসায় করা যায় না। কারণ, প্রায় প্রতিবছরই এখানে চ্যাম্পিয়ন বদলে যায়। সর্বশেষ সাত মৌসুমে যেমন ৫টি ভিন্ন দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে (পোজনান ও ওয়ারশ দুবার করে, একবার করে বিয়াউইস্তক, চেঁস্তোখোভা ও গ্লিউইস)।
অর্থাৎ বুন্দেসলিগায় বায়ার্ন মিউনিখ, লিগ আতে পিএসজি বা লা লিগায় রিয়াল বা বার্সার যে আধিপত্য দেখা যায়, তেমন কিছু এই লিগে নেই। এখানে একচেটিয়া আধিপত্য কারও নেই।
৫. মহাদেশেও উত্থানের পথে
পোলিশ ক্লাবগুলো ফুটবলের উন্নতি এখন ইউরোপীয় মঞ্চে দৃশ্যমান হচ্ছে। গত মৌসুমে জাগওয়েমবিয়ে বিয়াওয়িস্তক এবং লেগিয়া ওয়ারশ উয়েফা কনফারেন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। উয়েফার তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতাটিতে সর্বশেষ মৌসুমে খেলেছে চারটি পোলিশ ক্লাব। ২০২১-২২ মৌসুমে কনফারেন্স লিগ শুরু হওয়ার পর একমাত্র ইংলিশ ক্লাবগুলো ছাড়া আর কোনো দেশের ক্লাব পোলিশ ক্লাবগুলোর চেয়ে বেশি জয় পায়নি (পোল্যান্ড, ইতালি ও বেলজিয়াম—প্রতিটিরই জয় ৩৭টি করে, যেখানে ইংল্যান্ডের জয় ৪১টি)।