মেসি নাকি এমবাপ্পে কে জিতবেন গোল্ডেন বুট, বিশ্বকাপে কে কোন পুরস্কারের জন্য ফেবারিট
উত্তেজনা, রোমাঞ্চ ও নাটকীয়তার সব পর্ব পেরিয়ে আর মাত্র একটি ম্যাচের অপেক্ষা। এখন বাকি শুধু ফাইনাল। কে উঁচিয়ে ধরবে সোনালি ট্রফি—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে রোববার রাতে স্পেন–আর্জেন্টিনার ফাইনাল ম্যাচেই। তবে শিরোপার পাশাপাশি ফিফা আরও কয়েকটি ব্যক্তিগত ও দলীয় পুরস্কারও তুলে দেবে টুর্নামেন্ট শেষে।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, স্মরণীয় পারফরম্যান্স, গোলরক্ষকের অবদান, তরুণ ফুটবলারের উত্থান এবং মাঠে দলের শৃঙ্খলা—এসবের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয় বিশ্বকাপের বিভিন্ন পুরস্কার। এর কিছু পুরস্কারের বিজয়ী ফাইনালের পর ঠিক হলেও, কয়েকটির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ফাইনাল শুরুর আগেই। ফাইনালে ওঠা দুই দলের খেলোয়াড়রাই স্বাভাবিকভাবে বেশির ভাগ পুরস্কারের প্রধান দাবিদার। তবে অন্য দলগুলোর কয়েকজন ফুটবলারও আছেন আলোচনায়।
বিশ্বকাপ শেষে ফিফা যেসব পুরস্কার দেয়—
গোল্ডেন বুট—টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
গোল্ডেন বল—টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়।
গোল্ডেন গ্লাভস—সেরা গোলরক্ষক।
সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় (ইয়াং প্লেয়ার)—সেরা তরুণ ফুটবলার।
ফেয়ার প্লে পুরস্কার—সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ দল।
টুর্নামেন্টের সেরা গোল—বিশ্বকাপের সবচেয়ে দর্শনীয় গোল।
গোল্ডেন বুট কী, কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?
গোল্ডেন বুট দেওয়া হয় বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৮ গোল করে এই পুরস্কার জিতেছিলেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। টুর্নামেন্ট শেষে একাধিক খেলোয়াড়ের গোলসংখ্যা সমান হলে, বেশি অ্যাসিস্ট করা ফুটবলারকে এগিয়ে রেখে বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়। এরপরও সমতা থাকলে, কম সময় মাঠে খেলে গোল ও অ্যাসিস্ট করা খেলোয়াড়ই গোল্ডেন বুট জেতেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে কারা এগিয়ে?
এবার গোল্ডেন বুটের লড়াই জমে উঠেছে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মধ্যে। ফাইনালের আগে দুজনেরই গোল ৮টি। তবে অ্যাসিস্টে এগিয়ে আছেন মেসি। তাঁর অ্যাসিস্ট ৪টি, এমবাপ্পের ৩টি। ফলে টাইব্রেকারের হিসাবে এই মুহূর্তে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে আছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে কে কোথায়
লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা): ৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট
কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স): ৮ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট
আর্লিং হলান্ড (নরওয়ে): ৭ গোল
জুড বেলিংহাম (ইংল্যান্ড): ৬ গোল, ১ অ্যাসিস্ট
হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড): ৬ গোল, ১ অ্যাসিস্ট
উসমান দেম্বেলে (ফ্রান্স): ৫ গোল, ২ অ্যাসিস্ট
মিকেল ওইয়ারসাবাল (স্পেন): ৫ গোল, ১ অ্যাসিস্ট
গোল্ডেন বল কী, কারা এগিয়ে?
সর্বশেষ বিজয়ী: লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)
গোল্ডেন বল দেওয়া হয় বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়কে। বিশ্বকাপ চলাকালেই গোল্ডেন বলের জন্য খেলোয়াড় বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ (টিএসজি) সম্ভাব্য দাবিদারদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে। এরপর বিশ্বকাপ কাভার করা স্বীকৃত গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের ভোটে নির্ধারিত হয় বিজয়ী। ভোটে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হওয়া খেলোয়াড় পান যথাক্রমে সিলভার বল ও ব্রোঞ্জ বল।
১৯৭৮ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কার অনেকবারই এমন খেলোয়াড়ের হাতে উঠেছে, যাঁদের দল শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। উদাহরণ অনেক—২০০২ সালে অলিভার কান, ২০০৬ সালে জিনেদিন জিদান, ২০১০ সালে দিয়েগো ফোরলান, ২০১৪ সালে লিওনেল মেসি এবং ২০১৮ সালে লুকা মদরিচ ফাইনালে হেরেও গোল্ডেন বল পেয়েছেন। অলিভার কানই এখন পর্যন্ত এই পুরস্কার জেতা একমাত্র গোলরক্ষক। এর কোনো কোনোটি নিয়ে বিতর্কও হয়েছে।
মেসিই বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র ফুটবলার, যিনি দুইবার গোল্ডেন বল জিতেছেন। এবারও সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকার শীর্ষে আছেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্পেনের রদ্রি ও ওইয়ারসাবাল, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও সতীর্থ মাইকেল ওলিসে। এ ছাড়া সম্ভাব্য অন্য দাবিদারদের মধ্যে আছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহাম, নরওয়ের আর্লিং হলান্ড এবং কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া।
গোল্ডেন গ্লাভস কী, কারা এগিয়ে?
সর্বশেষ বিজয়ী: এমিলিয়ানো মার্তিনেজ (আর্জেন্টিনা)
গোল্ডেন গ্লাভস দেওয়া হয় বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষককে। গোলরক্ষকের ম্যাচে প্রভাব, গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং ক্লিন শিটের সংখ্যা বিবেচনায় এই পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে এই পুরস্কার চালু হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত এটি লেভ ইয়াশিন পুরস্কার নামে পরিচিত ছিল। সর্বশেষ পাঁচ বিশ্বকাপের চারটিতেই এই পুরস্কার জিতেছেন শিরোপাজয়ী দলের গোলরক্ষক।
এবারের বিশ্বকাপে গোলরক্ষকদের পারফরম্যান্স ছিল বিশেষভাবে আলোচিত। সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। এমনকি তাঁকে দলে ভেড়ানোর বিষয়েও আগ্রহ দেখাচ্ছে মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামি। তবে তাঁর দল শেষ ৩২ থেকে বিদায় নেওয়ায় ভোজিনিয়ার শেষ পর্যন্ত পুরস্কার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এ ছাড়া গোল্ডেন গ্লাভসের সম্ভাব্য দাবিদারদের মধ্যে সবার ওপরে রয়েছেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ৭ ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছেন তিনি। এ ছাড়া অন্যদের মধ্যে আছেন ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড, প্যারাগুয়ের অরলান্ডো গিল, পর্তুগালের দিওগো কস্তা, সুইজারল্যান্ডের গ্রেগর কোবেল, মরক্কোর ইয়াসিন বুনু এবং মিসরের মোস্তফা শোবেইর।
সেরা উদীয়মান পুরস্কার জয়ের দৌড়ে কারা এগিয়ে?
সর্বশেষ বিজয়ী: এনজো ফার্নান্দেজ (আর্জেন্টিনা)
২০০৬ সালে চালু হওয়া ইয়াং প্লেয়ার পুরস্কারটি দেওয়া হয় বিশ্বকাপের সেরা অনূর্ধ্ব–২১ বছর বয়সী ফুটবলারকে। ফিফার ভাষায়, এই পুরস্কার এমন একজন তরুণ খেলোয়াড়কে স্বীকৃতি দেয়, যাঁর পারফরম্যান্স, দক্ষতা ও প্রভাব টুর্নামেন্টে স্থায়ী ছাপ রেখে যান। এটি শুধু বর্তমান সাফল্যের স্বীকৃতিই নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও তুলে ধরে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এই পুরস্কার জিতেছিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী দলের মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। এবারের বিশ্বকাপে এই পুরস্কারের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন স্পেনের দুই তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল ও পাউ কুবারসি। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের হয়ে দুজনই ফাইনালে উঠেছেন।
এ ছাড়া ফ্রান্সের দেজিরে দুয়ে, ইংল্যান্ডের নিকো ও’রাইলি এবং মরক্কোর মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দিও এই পুরস্কারের দৌড়ে আছেন। বুয়াদ্দি এবারের বিশ্বকাপে নজরকাড়া পারফরম্যান্স করে দেখিয়েছেন।
ফেয়ার প্লে পুরস্কার কী, কারা এগিয়ে?
সর্বশেষ বিজয়ী: ইংল্যান্ড
ফেয়ার প্লে পুরস্কার দেওয়া হয় বিশ্বকাপে সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণ করা দলকে। ১৯৭০ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কারের জন্য শুধু গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে ওঠা দলগুলোকেই বিবেচনা করা হয়। বর্তমান ৪৮ দলের বিশ্বকাপে শেষ ৩২-এ ওঠা দলগুলো এই পুরস্কারের জন্য যোগ্য।
এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি চারবার ফেয়ার প্লে পুরস্কার জিতেছে ব্রাজিল। এরপর তিনবার করে জিতেছে ইংল্যান্ড ও স্পেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এই পুরস্কার জিতেছিল ইংল্যান্ড। এবারও ইউরোপের কোনো দলের হাতেই পুরস্কারটি উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দাবিদারদের তালিকায় রয়েছে স্পেন, ফ্রান্স ও নরওয়ে।
টুর্নামেন্টসেরা গোলের পুরস্কার কী, কারা লড়াইয়ে?
বিশ্বকাপের গোল অব দ্য টুর্নামেন্ট বা টুর্নামেন্টসেরা গোলের পুরস্কার নির্ধারণে ভোট দেন ফুটবলপ্রেমীরাই। কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনাল থেকে বাছাই করা ছয়টি গোলের মধ্য থেকে দর্শকদের ভোটে নির্বাচিত হবে সেরা গোল।
তবে শুধু টুর্নামেন্টসেরা গোলই নয়, প্রতিটি পর্ব শেষে সেই পর্বের সেরা গোলও আলাদাভাবে নির্বাচন করা হয়।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এই পুরস্কার জিতেছিলেন ব্রাজিলের রিচার্লিসন। সার্বিয়ার বিপক্ষে তাঁর দুর্দান্ত বাইসাইকেল কিকে করা গোলটি সেরা নির্বাচিত হয়েছিল।
এবার গ্রুপ পর্বের সেরা গোলের পুরস্কার জিতেছেন উজবেকিস্তানের এলদর শোমুরোদভ। শেষ ৩২-এর সেরা গোল নির্বাচিত হয়েছে কেপ ভার্দের সিডনি লোপেস কাবরালের করা গোল। আর শেষ ষোলোর সেরা গোলের পুরস্কার গেছে নরওয়ের আর্লিং হলান্ডের ঝুলিতে। ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর দেরিতে করা গোলেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে নরওয়ে।
টুর্নামেন্টসেরা গোলের চূড়ান্ত লড়াইয়ে আছেন ছয় ফুটবলার—
কিলিয়ান এমবাপ্পে—মরক্কোর বিপক্ষে (কোয়ার্টার ফাইনাল)
আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ—ইংল্যান্ডের বিপক্ষে (কোয়ার্টার ফাইনাল)
জুড বেলিংহাম—নরওয়ের বিপক্ষে (কোয়ার্টার ফাইনাল)
হুলিয়ান আলভারেজ—সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে (কোয়ার্টার ফাইনাল)
পেদ্রো পোরো—ফ্রান্সের বিপক্ষে (সেমিফাইনাল)
এনজো ফার্নান্দেজ—ইংল্যান্ডের বিপক্ষে (সেমিফাইনাল)
ফাইনালের আগেই এই পুরস্কারের ভোটগ্রহণ শেষ হবে। তাই দর্শকদের ভোটে নির্বাচিত টুর্নামেন্টসেরা গোলের বিজয়ীর নামও ঘোষণা করা হবে ফাইনাল শুরুর আগেই।