বিশ্বকাপ কে জিতবে—এটা কোনো প্রশ্ন হলো!

২০২৬ বিশ্বকাপ ট্রফিএএফপি

শুরুতেই একটা সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ। বিশ্বকাপ কে জিতবে—এই প্রশ্নের উত্তর আশা করে যদি এই লেখা পড়তে শুরু করে থাকেন, তাহলে আর না এগোনোই ভালো। অনেক কিছুই লিখব বলে ঠিক করে রেখেছি, শুধু ওই প্রশ্নটার উত্তর ছাড়া। কেন, কী কারণে এই প্রতিজ্ঞা?

একটা কারণ তো সেই কবেই বলে গেছেন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ নিলস বোর। বাংলা করলে যা অনেকটা এমন হয়—পূর্বাভাস দেওয়ার কাজটা খুব কঠিন, বিশেষ করে তা যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে হয়।

তা পূর্বাভাস মানেই তো ভবিষ্যতের কিছু আগাম বলা, তাহলে নিলস বোরের মতো জ্ঞানী মানুষ এমন ফালতু একটা কথা কীভাবে বলেন? আপনি যদি এ প্রশ্ন করে বসেন, আমি কোনো উত্তর দেব না। শুধু আপনার রসবোধ, বলা ভালো, সেটির অভাব নিয়ে একটু মন খারাপ করব।

সবার অবশ্য সবকিছু থাকেও না। তিনবার ফাইনাল খেলেও নেদারল্যান্ডসের যেমন একটা বিশ্বকাপও নেই। নিশ্বাসদূরত্বে গিয়েও শূন্য হাতে ফেরার হ্যাটট্রিকে শুধু ডাচদেরই একক অধিকার। ২০১০ বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত ‘রেকর্ড’টিতে হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়ার অংশীদারত্ব ছিল। প্রথম সাতটি বিশ্বকাপের মধ্যেই এই দুই দেশের দুবার করে ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে।

সেই স্মৃতি মনে করে মন খারাপ করার বদলে একটু গৌরবই বোধ করে এই দুই দেশের মানুষ। কথাটা অনুমান করে বলা নয়; বরং বছর দুয়েক আগে এই দুই দেশে ঘুরতে গিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসঞ্জাত। অনেকটা জমিদার বংশের হতদরিদ্র উত্তরপুরুষের বর্তমান দুরবস্থা থেকে মন ফেরাতে পুরোনো ঐতিহ্যের ঢেঁকুর তোলার মতো।

কথাটা অবশ্য দুই দেশের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’ নামে খ্যাত পুসকাস-হিদেকুটি-ককসিসদের হাঙ্গেরিয়ান ফুটবল এখন কঙ্কালসার, ১৯৮৬ সালের পর যাদের বিশ্বকাপেই যাওয়া হয়নি। যেখানে ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যাওয়ার পরও চেকদের অবস্থা অতটা খারাপ নয়। একবার ইউরোর ফাইনাল খেলেছে। গত চারটি আসরে প্রবেশাধিকার না পাওয়ার পর এবার আবার ফিরছে বিশ্বকাপেও। এখন যদিও চেকোস্লোভাকিয়ার বদলে তাদের ডাকতে হয় চেক প্রজাতন্ত্র বা হালে চেকিয়া নামে।

বিশ্বকাপে ফিরেছে চেক প্রজাতন্ত্র
এক্স

তা যে নামেই ডাকুন না কেন, চেকদের নেদারল্যান্ডসের তিন ফাইনালে হারার রেকর্ড ছোঁয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এই দেখুন, ভবিষ্যদ্বাণী করব না প্রতিজ্ঞা করেও ঠিকই তা করে ফেললাম। যদিও এসব ছুটকো–ছাটকা ভবিষ্যদ্বাণী করতে কাউকে অক্টোপাস পল হতে হয় না। আমিই যেমন কোন কোন দল বিশ্বকাপ জিতবে না, এক শ ভাগ গ্যারান্টিসহ এখনই তা লিখে দিতে পারি। কুরাসাও জিতবে না, হাইতি না, কেপ ভার্দে, কাতার, কঙ্গো, স্কটল্যান্ড, জাপান, উজবেকিস্তান, ইরান না...এবার মনে হয় থামা উচিত।

এই প্রথম ৪৮ দেশের বিশ্বকাপ, বলতে গেলে বিশ্বের এক–চতুর্থাংশ দেশই আছে প্রথমবারের মতো তিন দেশে আয়োজিত এই ফুটবলযজ্ঞে। বিশ্বকাপ জেতার ক্ষীণতম সম্ভাবনাও নেই, এমন দলের সংখ্যাও তাই ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। যে দলগুলোর নাম বলতে ফুটবল–বিশেষজ্ঞ হতে হয় না।

শুধু সহজতম এই প্রশ্নের কথা বলছি কেন, বিশ্বকাপ কে জিতবে—মিলিয়ন ডলারের এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার লোকেরও তো অভাব নেই। বলছি মিলিয়ন ডলারের, আসলে তো ৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।

১৯ জুলাই নিউইয়র্ক/নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিজয়ী দল এই ধরাধামের সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রফিটা তো হাতে নেবেই, সঙ্গে কিঞ্চিৎ অর্থযোগও ঘটবে। যেটির পরিমাণ ‘মাত্র’ ৫০ মিলিয়ন ডলার। টাকায় রূপান্তর করতে গিয়ে দেখলাম, অঙ্কটা ৬১৩ কোটি টাকার বেশি।

গত বিশ্বকাপে ট্রফি উঠেছিল মেসির হাতে
ফিফা

ওই ট্রফির এমনই মহিমা যে বিশাল অঙ্কের প্রাইজমানির ব্যাপারটা বলতে গেলে সেভাবে আলোচনাতেই আসে না। আলোচনা এখন যা হচ্ছে, তার সবই ওই একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। জ্যোতিষীরাও ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। তা তো করবেনই, এটাই তাঁদের কাজ। অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ—কেউই বাদ থাকছেন না।

ব্যাপারটা শুধু মনুষ্যকুলে সীমাবদ্ধ থাকলেও হতো। বেশ কয়েকটি বিশ্বকাপ ধরে পশুপাখিও শামিল হচ্ছে এই ভবিষ্যদ্বাণী-ভবিষ্যদ্বাণী খেলায়। এবার যাতে নবতম সংযোজন এআই, কোনো প্রশ্নের উত্তরই যার অজানা নয়। আর এ তো নিছকই একটা বিশ্বকাপ!

কথায়–কথায় অনেক দূর চলে এসেছি। লেখার শুরুতেই ভবিষ্যদ্বাণী করব না বলে ঘোষণা দেওয়ার কারণটা মনে হয় আরও আগেই ব্যাখ্যা করা উচিত ছিল। নিলস বোরের কথাটা রসিকতা করে বলা। আসলে বিশ্বকাপ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে না চাওয়ার পেছনে এর চেয়েও গুরুতর একটা কারণ আছে। কে হায় সাধ করে হাড়িকাঠে গলা পেতে দিতে চায়! যদিও অনেকগুলো বিশ্বকাপ ধরেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমি এই কাজ করে আসছি।

ভবিষ্যদ্বাণী কখনো ঠিক হয়েছে, কখনো হয়নি। তারপরও কেন যেন মিলে যাওয়া ভবিষ্যদ্বাণীগুলোই মানুষ বেশি মনে রেখেছে। যে কারণে গত কয়েকটি বিশ্বকাপের আগে একটা অভিজ্ঞতা বলতে গেলে নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। পরিচিতজনদের মধ্যে বিভিন্ন দলের সমর্থক বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে তাঁর প্রিয় দলের নামটা বলতে এমনভাবে অনুরোধ করেন যেন আমি বললেই সেই দল চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে!

আরও পড়ুন

বেশ কবারই তা হয়েছেও। ২০০৬ বিশ্বকাপ নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ সংখ্যাতেই ‘ব্রাজিল না জিতলে কে? ইতালি?’ ভবিষ্যদ্বাণী যেমন মিলে গিয়েছিল। পরের বিশ্বকাপে যা লিখেছিলাম, তা যত না ভবিষ্যদ্বাণী, তার চেয়ে বেশি আমার ব্যক্তিগত একটা চাওয়া। স্পেন আর নেদারল্যান্ডস ফুটবলকে এত কিছু দিয়েছে, অথচ বিশ্বকাপ তাদের কিছুই ফেরত দেয়নি—এই আক্ষেপ থেকে চাওয়াটার লিখিত রূপ ছিল: আহা, ফাইনালটা যদি স্পেন-হল্যান্ড হতো! সত্যি সত্যিই যে তা হয়েছিল, সেটি তো জানেনই।

২০১৪ বিশ্বকাপ শুরুর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমার মন বলছিল, এবার জার্মানি। কিন্তু খেলাটা দক্ষিণ আমেরিকায় (ব্রাজিলে) বলে ইতিহাস একটু ঝামেলা করতে থাকায় সরাসরি তা লেখা হয়নি। তবে আকারে-ইঙ্গিত থেকে বুদ্ধিমান পাঠকের তা বুঝে নেওয়া কঠিন কিছু ছিল না।

২০১৪ বিশ্বকাপ জিতেছে জার্মানি
ইনস্টাগ্রাম

টানা তিন বিশ্বকাপে ‘সাফল্যের’ বাড়তি চাপের কারণেই কি না, পরের দুটি বিশ্বকাপে আমার ভবিষ্যদ্বাণী ডাহা ফেল মেরেছে।

২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানি এমন দারুণ খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল যে আমার মনে হয়েছিল, ফুটবলে জার্মান-রাজ অনেক দিন চলবে। ২০১৮ বিশ্বকাপের বিশেষ সংখ্যায় পেলে-ম্যারাডোনা-রোমারিও-জাভি-কানের কলামের পাশে আমার ছোট্ট লেখাটার তাই শিরোনাম করেছিলাম—পোজ্জো হবেন লো?

লো মানে সেই বিশ্বকাপে জার্মানির কোচ ইওয়াখিম লো। আর পোজ্জো হলেন ভিত্তরিও পোজ্জো—দুবার বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র কোচ। সেটিও পরপর দুবার। ১৯৩৪ সালে নিজেদের দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইতালির জয়ে অবশ্য মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী সরকার একটু কলকাঠি নেড়েছিল বলে সর্বজনীন বিশ্বাস। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ১৯৩৮ বিশ্বকাপে সেই সুযোগ ছিল না। তবে ফাইনালের আগে ইতালিয়ান অধিনায়ক জিওসেপ্পে মিয়াজ্জার কাছে মুসোলিনির তিন শব্দের একটা বার্তা গিয়েছিল বলে জানা যায়—উইন অর ডাই।

লো পোজ্জো হবেন ভবিষ্যদ্বাণীর অর্থ তো বুঝতেই পারছেন। আমার মনে হয়েছিল, ২০১৮ বিশ্বকাপটাও জার্মানিই জিতবে। জার্মানি আমার ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে সামান্য একটু খারাপ করে। ২০০২ বিশ্বকাপ থেকে শুরু চ্যাম্পিয়নদের শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ার ধারা অব্যাহত রেখে প্রথম রাউন্ডেই আউট হয়ে যায়।

২০২২ বিশ্বকাপে আমি নেইমারের হাতে বিশ্বকাপ দেখেছিলাম। আমাকে বিব্রত করতেই কিনা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে যায় ব্রাজিল। ট্রফি হাতে নেওয়ার বদলে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়েন নেইমার।

কাঁদছেন নেইমার, সান্ত্বনা দিচ্ছেন দানি আলভেজ
রয়টার্স

কাতার বিশ্বকাপে নেইমারের মতো আরেকজনও কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছিলেন। আরেকজন সব পাওয়ার আনন্দে হাসতে হাসতে। সেই দুজন মানে রোনালদো ও মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপেও খেলবেন—২০২২ বিশ্বকাপের পর কেউই এমন ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না। তাঁরা দুজনও হয়তো নয়।

বিশ্বকাপ অনেক বিস্ময়ই উপহার দেবে। তবে সেটি তো খেলা শুরু হওয়ার পর। এর আগেই আমার কাছে বড় বিস্ময় বলে মনে হচ্ছে মেসি-রোনালদোর টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলা। এই কীর্তিতে মেক্সিকোর গোলকিপার গিয়ের্মো ওচোয়াও তাঁদের সঙ্গী। তবে সেটি একই রকম বিস্ময় জাগায় না। গোলকিপার আর ফরোয়ার্ডের হিসাব তো আর এক নয়। ওচোয়ার চেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ জিতেছেন ইতালিয়ান গোলকিপার দিনো জফ।

আরও পড়ুন

২০২২ বিশ্বকাপ ঘুচিয়ে দিয়েছিল মেসির শেষ অপূর্ণতাও। তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপ কি তা-ই হতে যাচ্ছে? নাকি ইওয়াখিম লো যা পারেননি, দিদিয়ের দেশম আবারও ফ্রান্সকে ট্রফি এনে দিয়ে নিঃসঙ্গতা ঘোচাবেন ভিত্তরিও পোজ্জোর? যে সুযোগ লিওনেল স্কালোনিরও আছে।

ইতালি আর ব্রাজিল ছাড়া আর কোনো দেশ বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারেনি। স্কালোনির আর্জেন্টিনা কি তা পারবে? ব্রাজিলের পাঁচ বিশ্বকাপ জয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ বিরতি পড়েছিল ২৪ বছরের। সেটি ছোঁয়া হয়ে গেছে এরই মধ্যে।

এবার কি পারবেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
এএফপি

এবার যেহেতু ব্রাজিলের সম্ভাবনা নিয়ে তেমন জোরালো আশাবাদ নেই, সেটিই কি দেখা দেবে আশীর্বাদ হয়ে? নাকি ফ্রান্সের সঙ্গে ফেবারিট হিসেবে যে স্পেনের নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, ১৬ বছর পর আবারও তাদের হাসি দেখবে বিশ্বকাপ?

শুধু যে প্রশ্নই করে যাচ্ছি, উত্তর কই? ওই যে শুরুতেই বলেছি, এই লেখায় কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। প্রথম ১৫টি বিশ্বকাপ ঘুরেফিরে ছয় দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে দেখেছে। পরের চারটি পেয়েছে নতুন দুই চ্যাম্পিয়ন। ফ্রান্স আর স্পেনের জয়ে এই দুই দেশের কাছে ফুটবল তার দায় চুকিয়েছে। একটা দলের কাছেই তা শুধু চুকাতে বাকি।

সাফল্য অনেকেই পায়, কোনো কোনো দল ফুটবলকে বদলে দেয়। টোটাল ফুটবলে যা দিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। সত্তরের দশকে ইয়োহান ক্রুইফের নেদারল্যান্ডস বা আশি-নব্বইয়ের দশকের খুলিত-বাস্তেন-রাইকার্ডদের নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে এই নেদারল্যান্ডসের কোনো তুলনাই চলে না। তারপরও কে জানে, বিশ্বকাপ যদি তিন-তিনবার শূন্য হাতে ফেরানো দলটির কাছে দায় শোধ করার তাড়না বোধ করে!
ভুল বুঝবেন না যেন, আমি কিন্তু কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করছি না।

আরও পড়ুন