আবেগ দিয়ে নেইমারের বিশ্বকাপ–ভাগ্য ঠিক করবেন না আনচেলত্তি
ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি আগামী সোমবার বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করবেন। ব্রাজিলজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন—নেইমার কি বিশ্বকাপ দলে থাকবেন?
৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। কিন্তু চোটের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই আর সান্তোসে ফেরার পর আশানুরূপ পারফর্ম করতে না পারায় আগামী ১১ জুন শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে তাঁর জায়গা পাওয়া নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ দল কেমন হবে, সেটা নিয়ে এখন চূড়ান্ত হিসাব মেলাচ্ছেন আনচেলত্তি। একদিকে যেমন আছে নেইমারের মতো তারকার প্রতি আবেগ, অন্যদিকে আছে ফিটনেসের কঠোর বাস্তবমুখী দাবি—আনচেলত্তি এখন এই দুয়ের সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে গতকাল মঙ্গলবার দেওয়া সাক্ষাৎকারে আনচেলত্তি এ নিয়ে বলেন, ‘দল নির্বাচনের সময় অনেক কিছু মাথায় রাখতে হয়। যে প্রতিভা নেইমার দেখিয়েছেন, তাতে এ দেশের জন্য তিনি অবশ্যই একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। কিন্তু তিনি বেশ কিছু সমস্যায় ভুগেছেন এবং ফেরার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন। ইদানীং তাঁর খেলায় উন্নতি হয়েছে এবং নিয়মিত খেলছেনও। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমার জন্য মোটেও সহজ নয়। আমাদের খুব সতর্কভাবে এর ভালো-মন্দ দিকগুলো খতিয়ে দেখতে হবে।’
রিও ডি জেনিরোর বাররা দা তিজুকা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের (সিবিএফ) সদর দপ্তরে রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দেন আনচেলত্তি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল এই কোচ অত্যন্ত শান্ত মেজাজেই নেইমারকে দলে রাখা বা না রাখার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে নিজের ভাবনার কথা জানান।
আনচেলত্তি ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের সব কটিতেই শিরোপা জেতা একমাত্র কোচ। খেলোয়াড় হিসেবে দুবার ও কোচ হিসেবে রেকর্ড পাঁচবার চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি জিতেছেন এই ইতালিয়ান।
নেইমার ‘সবার প্রিয়’
পেশাদার ক্যারিয়ারে অজস্র কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেও দল নির্বাচন নিয়ে সম্ভবত এমন জটিলতায় আগে কখনো পড়েননি আনচেলত্তি। সতীর্থরা প্রকাশ্যেই নেইমারকে দলে নেওয়ার জোরালো দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে সমর্থকেরা দুই ভাগে বিভক্ত—একাংশ এখনো প্রিয় তারকার জাদুকরি ফুটবল দেখতে উন্মুখ, অন্য অংশের শঙ্কা, নেইমারের শরীর কি তাঁর সৃষ্টিশীল মস্তিষ্কের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে?
আনচেলত্তি বলেন, ‘আমি খুব ভালো করেই জানি নেইমার কতটা জনপ্রিয়। শুধু সাধারণ মানুষই নন, সতীর্থদের কাছেও তিনি সমান প্রিয়।’
ব্রাজিলের এই কোচ ব্যাখ্যা করেন, ‘(দলে জায়গা পেতে জনপ্রিয়তা) এটিও একটি বড় প্রভাবক। কারণ, নেইমারকে দলে নিলে কেমন পরিবেশ তৈরি হবে, তা মাথায় রাখতে হচ্ছে। এমন নয়, তাকে নিলে ড্রেসিংরুমে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে সবার খুব পছন্দের ও ভালোবাসার মানুষ।’
খেলোয়াড়দের দাবির প্রসঙ্গে আনচেলত্তি বলেন, ‘খেলোয়াড়েরা তাঁদের মতামত দেবে—এটাই স্বাভাবিক। যাঁরা আমাকে পরামর্শ দিচ্ছেন, তাঁদের সবার কাছেই আমি কৃতজ্ঞ। তবে দিন শেষে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সঠিক ব্যক্তি হলাম আমি।’
নেইমারকে বিশ্বকাপ দলে নিতে সতীর্থদের আবদার কি আনচেলত্তিকে প্রভাবিত করছে? এমন প্রশ্নে আনচেলত্তির উত্তর, সতীর্থদের কথায় একটি বিষয় পরিষ্কার—নেইমার দলে থাকা মানে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ নষ্ট হওয়া নয়। আনচেলত্তির দুশ্চিন্তা ড্রেসিংরুম নিয়ে নয়, বরং বাইরের আলোচনা নিয়ে।
আনচেলত্তি বলেন, ‘দলের ভেতরের পরিবেশে কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি না। আমাদের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ খুব ইতিবাচক ও স্বচ্ছ। দলে যে খেলোয়াড়ই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত এই ইতিবাচকতা বজায় থাকবে। কিন্তু বাইরের পরিবেশ বা সংবাদমাধ্যম কী বলছে, তা তো আর আমার নিয়ন্ত্রণে নেই।’
ফিটনেসে উন্নতি
বড় প্রশ্ন হলো—নেইমার কি আধুনিক ফুটবলের কৌশলে মানিয়ে নিতে পারবেন? আনচেলত্তি এমন চারজন ফরোয়ার্ড চান, যাঁরা দৌড়াতে পারবেন, প্রেসিং করবেন এবং প্রয়োজনে নিচে নেমে রক্ষণ সামলাবেন। চোটে ভুগে নিয়মিত খেলতে না পারা একজন খেলোয়াড়ের জন্য যা বেশ কঠিন।
অবশ্য ইতালিয়ান এই কোচ নেইমারের উন্নতির আভাসও দিয়েছেন। তাঁর মতে, নেইমারের ফিটনেসে সাম্প্রতিক সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।
নেইমারের সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে আনচেলত্তি বলেন, ‘গত কয়েক ম্যাচে নেইমারের ফিটনেসে অনেক উন্নতি হয়েছে। সে বেশ কিছু ভালো ম্যাচ খেলেছে এবং খেলার উচ্চ তীব্রতা ধরে রাখতে পারছে। তবে একেক ম্যাচের ধরন একেক রকম হয়...।’
নেইমারকে দলে নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে একান্তই তাঁর নিজের, সেটিও পরিষ্কার করে দিয়েছেন আনচেলত্তি। তাঁর ভাষায়, ‘নেইমারকে দলে রাখতে কেউ আমাকে চাপ দেয়নি। আমার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। আমি শতভাগ পেশাদারের জায়গা থেকেই সিদ্ধান্ত নেব। ফুটবলার হিসেবে নেইমার কেমন পারফর্ম করছেন, কেবল সেটিই বিবেচনায় নেওয়া হবে; অন্য কিছু নয়।’
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জন্য নিখুঁত দল গড়া সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নে আনচেলত্তির উত্তর, ‘নিখুঁত দল গড়া কি সম্ভব? অসম্ভব! তবে আমি এটুকু নিশ্চিত, অন্য কেউ দল গড়লে যে ভুল হতো, আমার দলে ভুলের পরিমাণ তার চেয়ে অনেক কম হবে।’
আনচেলত্তির বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নেওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়েছেন নেইমার। ব্রাজিলের ৫৫ জনের প্রাথমিক স্কোয়াডে তাঁকে রেখেছেন আনচেলত্তি। বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপে ব্রাজিলের প্রতিদ্বন্দ্বী মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ড। ১৩ জুন নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কোর মুখোমুখি হয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ব্রাজিল।