রাগে কাকে লাঞ্ছিত করেছেন নেইমার, কে এই রবিনিও জুনিয়র
অথচ কথা ছিল গল্পটি মোড় নেবে অন্য পথে। যে পথে নেইমারের হাতে থাকবে আলো, আর রবিনিও জুনিয়র সে আলোয় পথ দেখে নিজেকে করবেন বিকশিত। শুরুটা এমনই ছিল। সান্তোসে নেইমারকেই আদর্শ মেনেছিলেন রবিনিও জুনিয়র। কিন্তু ঘটনাচক্রে রবিনিও জুনিয়র এখন তাঁর বাবার একসময়ের সেই জাতীয় দল সতীর্থেরই মুখোমুখি!
৩৪ বছর বয়সী নেইমারের সঙ্গে ১৮ বছর বয়সী রবিনিও জুনিয়রের সম্পর্ক এতটাই বাজে দিকে মোড় নিয়েছে যে ক্লাব যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে রবিনিও চুক্তি বাতিলের হুমকিও দিয়েছেন।
কারণটা এতক্ষণে সবার জানা। সান্তোসের অনুশীলনে তর্কাতর্কির জেরে নেইমারের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন রবিনিও জুনিয়র। গত রোববার সান্তোসের অনুশীলন গ্রাউন্ডে এ ঘটনা ঘটে। রবিনিও জুনিয়র ড্রিবল করে নেইমারকে পেরিয়ে যাওয়ার পর অসম্মানিতবোধ করেন ব্রাজিল তারকা। তাঁর অভিযোগ, নেইমার তাঁকে লক্ষ্য করে ‘অপমানজনক গালি’ দিয়েছেন, ল্যাং মেরেছেন এবং মুখে ‘জোরে চড়’ মেরেছেন।
সান্তোস এ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। নেইমারও নাকি এ ঘটনার পর রবিনিও জুনিয়রকে ফোন করেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ব্যাপারটি এখন কোথায় গিয়ে শেষ হয়, সেটাই দেখার অপেক্ষা।
তবে বয়স বিচারে দুই প্রজন্মের এ দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে সম্পর্কটা কিন্তু একসময় দারুণ ছিল। ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে গত জুলাইয়ে ফ্লামেঙ্গোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের একটি ছবি পিন করেন রবিনিও। সেখানে দেখা যায়, নেইমারের পাশে তিনি হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। এই পোস্টে নেইমারের মন্তব্য, ‘ভালো ছেলে...দারুণ এক গল্পের শুরু।’ প্রতি–উত্তরে রবিননিও জুনিয়র লেখেন, ‘একসঙ্গেই এগিয়ে যাব, আইডল।’
কিন্তু এখন অন্তত সম্পর্কের জায়গা থেকে দুজনের পথ আলাদা। এ ঘটনায় মূলত নেইমার আলোচনা–সমালোচনায় উঠে এলেও রবিনিও জুনিয়র কিছুটা আড়ালে পড়েছেন। নামটি শুনে কেউ কেউ হয়তো অবাক হয়ে ভাবতে পারেন, এই জুনিয়র কি তবে রবিনিওর ছেলে?
কে এই রবিনিও জুনিয়র
সবার আগে তাঁর বাবার পরিচয় দিতে হয়। ব্রাজিলের ফুটবলে ‘নতুন পেলে’ তকমা পেয়েছেন অনেকেই। তবে প্রত্যাশার জায়গা থেকে বিচার করলে আর কেউ রবিনিওর মতো আশার আলো ছড়াতে পারেননি। সেটা অমিত প্রতিভার কারণে। কিন্তু সান্তোস, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার সিটি, এসি মিলানের মতো ক্লাবে খেলেও রবিনিও তাঁর প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। ব্রাজিলের জার্সিতে ১০০ ম্যাচে ২৮ গোল করা ৪২ বছর বয়সী সাবেক এই ফরোয়ার্ডের সময়টা এখন জেলে কাটছে।
মিলানে থাকতে বড় ধরনের এক অপরাধ করে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনেন রবিনিও। ২০১৩ সালে এক আলবেনিয়ান নারীকে ইতালির একটি নৈশ ক্লাবে ধর্ষণ করেছিলেন রবিনিও। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দেশটির আদালত তাঁকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেন। কিন্তু রায়ের আগেই ইতালি ছেড়ে যাওয়ায় ব্রাজিল সরকারকে শাস্তি কার্যকরের আহ্বান জানান ইতালির সর্বোচ্চ আদালত। এরপর ২০২৪ সালের মার্চে রবিনিওকে গ্রেপ্তার করে ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ। এর পর থেকে তাঁর জীবন কাটছে সাও পাওলোর এক কারাগারে।
সাও পাওলোর পৌর শহর সান্তোসে ২০০৭ সালে জন্ম রবিনিও জুনিয়রের। এক ভাই ও এক বোন আছে তাঁর। পিতৃপ্রদত্ত নাম রবসন ডি সুজা জুনিয়র হলেও বাবার খ্যাতির কারণে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে রবিনিও জুনিয়র নামে তাঁর পরিচিতি। বাবার পথ অনুসরণ করেই ২০২২ সালে ১৫ বছর বয়সে সান্তোসের বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেন।
২০২৩ সালে সান্তোসের অনূর্ধ্ব–১৭ দলে ডাক পেলেও রবিনিও জুনিয়র এই দলে নিয়মিত হন পরের বছর। অনূর্ধ্ব–১৭ ক্যাটাগরিতে সে বছর ক্যাম্পেনেতো পলিস্তা জয়ের পথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৯ গোল করেন। গত বছর ডাক পেয়ে যান অনূর্ধ্ব–২০ দলে। তত দিনে রবিনিও জুনিয়র যে নতুন সম্ভাবনাময় তারকা হয়ে উঠছেন, সেটা বুঝে ফেলে সান্তোস। আর তাই সে বছরেরই ১৯ ফেব্রুয়ারি জুনিয়রকে মূল দলে নিবন্ধিত করে ব্রাজিলের ক্লাবটি।
সান্তোসের মূল দলে ৭ নম্বর জার্সিটি পান জুনিয়র। তাঁর বাবা এই জার্সিতেই সান্তোস মাতিয়েছেন একসময়। পেশাদার ফুটবলে গত বছর জুলাইয়ে অভিষেকের পর জুনিয়র এখন সান্তোসের মূল দলের স্থায়ী সদস্য। ফরোয়ার্ড হিসেবে তাঁর সামর্থ্য বুঝেই গত এপ্রিলে ১৮ বছর বয়সী রবিনিও জুনিয়রের সঙ্গে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করে সান্তোস।
তবে এ বছর ব্রাজিলিয়ান সিরি ‘আ’তে ১৪ ম্যাচ খেলা সান্তোসের হয়ে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন জুনিয়র। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৮ ম্যাচ খেললেও গোল পাননি। পরিসংখ্যানটি আশাব্যঞ্জক না হলেও ইউরোপের ক্লাব ফুটবল কিন্তু জুনিয়রকে নিয়ে আগ্রহী। গত জানুয়ারিতে ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘ইউওএল’ জানিয়েছিল, ইন্টার মিলান তাঁর প্রতি আগ্রহী। রবিনিও জুনিয়র নাকি তখন ইতালিয়ান ক্লাবটিতে গিয়ে ঘুরেও এসেছেন। গত বছর সেপ্টেম্বরে জানা যায়, লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার সিটিও চোখ রাখছে জুনিয়রের ওপর।
খেলোয়াড় হিসেবে রবিনিও কেমন, সেটা আন্দাজ করে নেওয়া যায় রবিনিও জুনিয়রের প্রথম কোচ রবসন ফার্নান্দেজ দি অলিভেরার মন্তব্যে। সান্তোসের বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেওয়ার আগে সেখানকার ক্লাব পোর্তুয়ারিসে কিছুদিন খেলেন রবিনিও। সেখানে তাঁকে ‘জুনিনিও’ নামে ডাকা হতো।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করে গত বছর অক্টোবরে ব্রাজিলের সাময়িকী ‘প্লাকার’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রবসন বলেন, ‘২০১২ সালের দিকে ৫-৬ বছর বয়সে জুনিয়র আমার কাছে আসে। সে অন্য দশটা বাচ্চার চেয়ে আলাদা ছিল। আমি সব সময় ওকে বলতাম, যতক্ষণ সম্ভব বল পায়ে রাখতে। ওর বল না ছাড়ার প্রবণতা দেখে অন্য বাচ্চাদের মা–বাবারা আমার ওপর বিরক্ত হতেন। কিন্তু আমি সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম, কারণ ওর মধ্যে আমি ব্যতিক্রমী কিছু দেখেছিলাম।’
রবসন যোগ করেন, ‘বাঁ পায়ের ছেলেটির ড্রিবলিং তাঁর বাবার চেয়েও অনেক বেশি নিখুঁত। সে অবিশ্বাস্য রকমের দক্ষ ছিল এবং বারবার চেষ্টা করার মতো অদম্য সাহস ছিল ওর মধ্যে।’
পোর্তুয়ারিসের বয়সভিত্তিক দলে কোচ হিসেবে রবসনের শেষ ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন রবিনিও জুনিয়র। রবসন বলেন, ‘সেই ম্যাচের পর আমি রবিনিওকে বলেছিলাম, “ছেলে তোমার চেয়েও বড় মাপের খেলোয়াড় হতে যাচ্ছে!”’
রবিনিও জুনিয়র কত দূর যেতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত ভুল কারণে যে তিনি সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন, তা পরিষ্কার।