আজ মেসিকে দেখবে ইংল্যান্ড, মেসি দেখবেন ইংল্যান্ডকে
সেঁত এতিয়েনের ওই ম্যাচটা দেখেছিল রোজারিওর সেই ১১ বছরের ছেলেটাও। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো, মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। বিকেলে বাড়িতে টেলিভিশনের সামনে বসে ছেলেটা দেখল দিয়েগো সিমিওনের চালাকি, ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড, মাইকেল ওয়েনের অবিশ্বাস্য এক গোল, তারপর টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়।
ম্যাচ শেষে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে যাওয়া ছেলেটি স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে পরে বলেছিল, ‘শুধু মনে আছে, ম্যাচটা শেষে আমরা রাস্তায় ফুটবল খেলতে চলে গিয়েছিলাম।’ ব্যস, এটুকুই। কোনো বাড়তি আবেগ নেই, নেই কোনো রংচংয়ে বর্ণনা।
ছেলেটার নাম লিওনেল মেসি। সময়ের চাকা ঘুরে আজ যখন তিনি ৩৯ বছরের এক ‘প্রবীণ সেনাপতি’, তখন আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আবার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।
ফুটবলের ইতিহাসে কাকতালীয় কত কিছুই ঘটে। কিন্তু এটা একটু অন্য রকম। এত বছর ধরে বিশ্বের প্রায় সব বড় দলই কোনো না কোনো সময়ে মুখোমুখি হয়েছে লিওনেল মেসির। অথচ মেসি আজ পর্যন্ত কখনো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর ২০৫টি ম্যাচের একটিও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নয়! আটলান্টার এই ম্যাচ তাই শুধু আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড নয়। এটা হতে যাচ্ছে একধরনের ‘প্রথম দর্শন’। ইংল্যান্ডের জন্য, মেসির জন্যও।
২৮ বছর আগের সেই কিশোর মেসির সঙ্গে আজকের এই ‘বুড়ো’ মেসির একটা মিল অবশ্য আছে। সেই ছেলেটাও খেলতে পছন্দ করত, এই মেসিও করেন। তিনি খেলতেন, এখনো খেলে যাচ্ছেন। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর, এই বয়সে এসেও যেখানেই খেলছেন, সেখানেই সবচেয়ে বড় নির্ভরতা হয়ে উঠছেন!
বার্সেলোনার সেই সোনালি যুগে একটা কথা খুব শোনা যেত—‘মেসিদিপেনদেনসিয়া’। মেসিনির্ভরতা। তখন ইনিয়েস্তা, জাভি কিংবা পরে নেইমারদের পাশে রেখেও এই শব্দটা উচ্চারিত হতো। আর আজ তাঁর এই ৩৯ বছর বয়সেও কথাটা যেন আরও বেশি সত্য।
সংখ্যা বলছে, এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মেসিনির্ভরতা ভয়ংকর রকমের। দলের ১৪ গোলের ৮টিই মেসির। বাকি গোলগুলোর বেশির ভাগেও তাঁর ছোঁয়া—অ্যাসিস্টে, কর্নারে কিংবা আক্রমণের শুরুতে। আর্জেন্টিনা এই পর্যন্ত এসেছেই আসলে মেসির কাঁধে চড়ে।
আর্জেন্টিনার এই দলটার অনেক দুর্বলতা অনেক ম্যাচে বেরিয়ে এসেছে। তারা হোঁচট খাচ্ছে, ধুঁকছে, আর প্রতি ম্যাচে কায়ক্লেশে বেঁচে ফিরছে। রক্ষণভাগে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ কিংবা ক্রিস্টিয়ান রোমেরোরা গোল করলেও ডিফেন্সে রেখে যাচ্ছেন ক্ষমার অযোগ্য ফাটল। মাঝমাঠের গতি শ্লথ, প্রতি-আক্রমণে দলটা বড্ড বেশি অরক্ষিত।
কিন্তু দিন শেষে সব সমালোচনা উবে যায় ওই একটা নামে। হোঁচট খেতে খেতেও তারা যখন সেমিফাইনালে পৌঁছায়, তখন বোঝা যায় এই দলের মিশনটা ফুটবলীয় সৌন্দর্যের নয়, মিশনটা হলো মেসির জন্য টিকে থাকা।
১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনা প্রায় একাই বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন আর্জেন্টিনাকে। ৫ গোল, ৫ অ্যাসিস্ট, অতিমানবীয় পারফরম্যান্স ছিল সেটা। আজকের মেসি হয়তো সেই ম্যারাডোনার মতো দৌড়াতে পারেন না। কিন্তু খেলার বোধ হয়তো তাঁর আরও গভীর। যে কারণে এই বয়সেও তাঁকে আটকে রাখা যাচ্ছে না। যে কথা অনেক আগেই চেলসির কোচ থাকার জোসে মরিনিও বলেছিলেন, ‘মেসিকে থামানো যায় না, শুধু ম্যাচটা তার জন্য কঠিন করে তোলা যায়।’
ইংল্যান্ডের হয়তো আজ সেই অভিজ্ঞতা হতে চলেছে। তারা আজ প্রথমবার বুঝবে, মেসির বিপক্ষে খেলা কেমন। হয়তো তারা তাঁকে থামাতে পারবে, হয়তো পারবে না।
কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত—আজকের রাতের পর, মেসি আর তাদের কাছে গল্প থাকবে না। বাস্তব হবে।