খিড়কি খুলে সবাই মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম বিশ্বকাপকে বরণও করেছেন। শুধু একটি দরজা বন্ধ। তা আর কখনোই খুলবে না। সে এমন এক দরজা—যার চৌকাঠে ফুটবলের ভক্ত থেকে বিপ্লবী, এমনকি দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ মানুষটিও হয়তো নিশ্চিন্তে পড়ে থাকতে পারেন। আর তিনি হয়তো দরজা খুলে সেই পোড়ামুখোকে বুকে টেনে হাতে বলটা দিয়ে বলবেন, এই নাও ওষুধ! পৃথিবীর সমস্ত জরা–ব্যাধি, দুঃখ–শোক আর পাপ–তাপ ভোলার ওষুধ!

এই দৃশ্যপট আসলে কল্পনার।

কল্পনায় তাঁকে নিয়ে এই ছবিটা আঁকার সাহস তিনি নিজেই গেছেন। ফুটবল নিয়ে যাঁর আবেগের উচ্চতা এভারেস্টকেও পেছনে ফেলবে, যাঁর চোখে বলে লাথি মারাটাই জন্ম নেওয়ার সার্থকতা আর পৃথিবীর আপামর দুঃখী জনতার পাশে দাঁড়িয়ে যিনি অহর্নিশ ‘এস্টাবলিশমেন্ট’কে প্রশ্ন করে গেছেন, খুঁচিয়েছেন—সেই দরজায় যে আজ মৃত্যুর তালা!

চাবিটা যেহেতু নেই, তাই কাতার বিশ্বকাপকে খালি হাতেই সেই দরজা থেকে ফিরতে হয়েছে। বিশ্বকাপের রূপ–রং–রসে কোথায় যেন একটা দুঃখবোধ থেকে যাচ্ছে। এ এমন এক দুঃখ, যা চিরন্তন। তবু মেনে নেওয়া কষ্টের। সেই ৮২ সালের আসর থেকেই তাঁকে ছাড়া বিশ্বকাপের চলে না। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপজয়ী মহানায়কদের কাতারে যেমন বসেছেন, একাই দেশকে বিশ্বকাপ জেতানোর সংক্ষিপ্ত থেকে সংক্ষিপ্ততম তালিকায় যে দুজনকে (৬২ আসরে গারিঞ্চা) প্রায় কোনো তর্ক ছাড়াই রাখা যায়, তিনি তাঁদের একজন। আর সমর্থক হিসেবে?

গত বিশ্বকাপের মুহূর্ত মনে করা যায়।

রাশিয়ার সেন্ট পিটাসবার্গে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্তও ১–১ গোলে সমতায় আর্জেন্টিনা। খুবই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, জিততেই হবে। পরের মিনিটেই মার্কোস রোহোর গোল এবং ক্যামেরা চলে গেল গ্যালারির একটি বক্সে—যেখানে চোখেমুখে আবেগ ঢেলে শিশুর মতো চিৎকার করছিলেন তিনি। কখনো আবার দুই চোখ উল্টে ওপরে তাকিয়ে এমন ভাব করছিলেন যেন, আর্জেন্টিনাকে জেতানোর জন্য ডাকিনীবিদ্যার চর্চা করছেন।

বক্স থেকে দুই হাত মাঠের দিকে বাড়িয়ে এতটা আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে খেয়ালও করেননি পেছন থেকে একটু ধাক্কা লাগলেই পড়ে যেতে পারেন। সেই ভয়ে পেছন থেকে দুজন তাঁকে ধরেও রেখেছিলেন। তারপর এক সময় শোনা গেল অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আহা! দেশের সমর্থনে এভাবে অসুস্থ হওয়াতেই যেন কত সুখ! বুকে সুখের ব্যথা বাজে!

আর সেই সুখের ব্যথার মোড়কে ফুটবলকে সমর্থন দেওয়ার যে ‘পাঠ’ তিনি সেদিন দিয়েছিলেন, তা সবার জন্যই এক রকম শিক্ষা। আর্জেন্টিনা থেকে গোটা কাতার বিশ্বকাপই এবার তেমন সব পাঠ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর বচনগুলো?

হ্যাঁ, সেসব তর্ক–বিতর্কমাখা অমৃতের স্বাদও আর মিলবে না। তরুণ মজুমদারের ‘আলোর পিপাসা’ সিনেমায় সেই ব্রাক্ষ্মণ বলেছিলেন, মানুষ নাকি অমৃতের সন্তান। বিশ্বকাপ হচ্ছে এবার সেই অমৃতের সন্তানকে ছাড়াই। এই দুঃখের আর্তনাদে হাত পাততে হয় কাজী নজরুল ইসলামের লেখায়—

‘তোদের মাঝারে লভিয়া জনম ঘুরিতেছে পথহারা,
আত্মা আমার জেগে আছে যেন মেলি অনন্ত আঁখি,
মাহেন্দ্রক্ষণ উদয় উষার–আরও কতদিন বাকি?
জাগো অমৃতের সন্তান...।’

আর জাগবেন না। কিন্তু মানুষ তাঁর জন্য আজও জেগে। যদি কাল সকালে শোনা যেত, তিনি আছেন! এমন আশায়? কে জানে!

টিভি পর্দায় কিংবা ইন্টারনেট ছাড়া এই পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই তাঁকে দেখেনি। তবু প্রতিটি জন্মদিনে কিংবা অমরত্ব পেতে যেসব গোল করেছেন, বাঁ পায়ের তুলিতে যেসব ছবি সবুজ থেকে সবুজের আঙিনায় এঁকেছেন, সেসব দিন টুইটারে চলে এলে লোকে তাঁকে স্মরণ করেন। চোখের পানি হয়তো সবাই ফেলেন না, কিন্তু অজান্তেই মনের মধ্যে যে হাহাকারের উদয় হয়, সেটুকুই ভালোবাসা। নির্জলা ভালোবাসা।

একবার ভেবে দেখুন তো, সমর্থকদের অবস্থাই যদি এমন হয়, তাহলে এই বিশ্বকাপের লগ্নে তাঁর কাছের মানুষদের অবস্থাটা কেমন হবে! আসলে বিশ্বের তাবৎ ফুটবলপ্রেমীই তো তাঁর কাছের মানুষ।

কিন্তু এর চেয়েও কাছের মানুষ তাঁরা, যাঁরা তাঁর সঙ্গে খেলেছেন কিংবা প্রতিপক্ষ হওয়ার মোড়কের ভেতরে বন্ধুত্বের বিনিসুঁতোর মালা গেঁথেছেন। লোথার ম্যাথাউস তাঁর তেমনই কাছের মানুষ। বিচ্ছেদের ব্যথাটা আর সহ্য করতে না পেরেই বুঝি জার্মান কিংবদন্তি গত ১১ নভেম্বর ফেসবুকে স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলেন এক বাক্যে—যেন বাক্য যত বড় হবে ব্যথাও বাড়বে!

ম্যাথাউস তাই সম্ভবত এক বাক্যের মধ্যেই সব ব্যথা ধরার চেষ্টা করেছেন, ‘তোমাকে ছাড়া প্রথম বিশ্বকাপ।’

হ্যাঁ ডিয়েগো ম্যারাডোনা, আপনাকে ছাড়া প্রথম বিশ্বকাপ। কাতার বিশ্বকাপে এর চেয়ে নির্মম উপলব্ধি আর কী হতে পারে! টের পাচ্ছে আর্জেন্টিনা। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হারের পর মেসিদের ঘুরে দাঁড়াতে দরকার এখন প্রেরণা, উদ্দীপনা আর আশা–ভরসা। কিন্তু কে দেবে আশা, কে দেবে ভরসা ; আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভক্তটি–ই যে মুখ লুকিয়েছেন মৃত্যুকপাটের ওপাশে। আর তাই ম্যারাডোনাকে মনে পড়ে, মন পোড়ে।

এই উপলব্ধি শুধু ম্যাথাউস কেন, পেলেরও মর্মে মর্মে অনুধাবন করার কথা! দুজনের মধ্যে কে সর্বকালের সেরা—এ নিয়ে এক সময় বিস্তর বচসা হয়েছে। যেন টম অ্যান্ড জেরি! বাচ্চারা এই কার্টূনে দুটি চরিত্রের একে–অপরের বিরুদ্ধে লড়াই দেখে যেমন মজা পায়, লোকেও তেমনি ম্যারাডোনা–পেলের মধ্যে সেরার বাহাস দেখে মজা পেয়েছেন। পক্ষে–বিপক্ষে তর্কও হয়। এখনো চলে। শুধু পেলের তর্ক করার কেউ নেই।

পেলে জানেন, এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পক্ষে গলা ফাটালে আর্জেন্টিনা থেকে কেউ বলবে না, আরে রোসো! আমাদের মেসি আছে।

পেলের আছেন নেইমার। জার্মানির আছেন মারিও গোটশে...টমাস মুলার। তবু পেলে কিংবা ম্যাথাউস হয়তো তাঁদের হয়ে আগের মতো আর গলা ফাটাবেন না। পেলে এখন নিঃসঙ্গ শেরপার মতোই একা, ম্যাথাউসের তবু দু–একজন দোসর আছেন, তবু কেন তাঁর ম্যারাডোনাকে স্মরণ? দুটি গল্প শুনুন—

ম্যারাডোনোর ‘সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছিলেন তাঁকে গোটা ক্যারিয়ারে কড়া মার্কিংয়ে রাখা ম্যাথাউস। কথাটা আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি নিজেই বলে গেছেন। ২৫ বছর বয়সে এই ম্যাথাউস খেলতেন বায়ার্ন মিউনিখে। ম্যারাডোনা তখন নাপোলিতে। দূরে থাকলেও বন্ধুত্ব ছিল দুজনের। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারের পর ম্যারাডোনার সঙ্গে জার্সি অদলবদল করেছিলেন, চার বছর পর ১৯৯০ বিশ্বকাপে সেই ম্যারাডোনাই হারলেন ম্যাথাউসের কাছে। এই হারজিতের মধ্যে জমে উঠেছিল বন্ধুত্ব। আর বন্ধুত্বের দাবি মেনেই ’৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা যে জার্সিটি পরে অমরত্বের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন, তা আর্জেন্টাইনদের হাতে ফেরত দিয়েছেন গত সেপ্টেম্বরে।

ম্যাথাউস বলেছিলেন, ‘গত ৩৬ বছরে এমন কিছু ভাবিনি (ম্যারাডোনার জার্সি বিক্রি করা)। বরং আর্জেন্টিনার মানুষকে জার্সিটি ফিরিয়ে দিয়ে ভালো লাগছে।’
১৯৮৬ বিশ্বকাপের পর এই ম্যাথাউসকে নাপোলিতে ভেড়াতে ইতালি থেকে চারজন লোক পাঠিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। ম্যাথাউস অবশ্য সেই চারজন লোককে সরাসরি ‘মাফিয়া’ বলেননি।

তাঁর মুখেই শুনুন সেই ঘটনা, ‘সেদিন ছিল শনিবার, কোলনে বুন্দেসলিগায় ম্যাচ ছিল। সেখান থেকে মিউনিখে উড়াল দিয়ে রাত ১০টা নাগাদ একটি ইতালিয়ান হোটেলে ঢুকি। আমার ব্যবস্থাপক দল সেখানে ম্যারাডোনার পাঠানো লোকজনের সঙ্গে রাতভর খাওয়াদাওয়া ও পানাহার করছিল। তারা কী চায়, সেটা আমাকে জানাল। ডিয়েগো আমাকে চায়। নাপোলির সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি করতে বলা হলো। শুধু সই করার ফি হিসেবেই ১ মিলিয়ন ডয়েচ মার্ক (জার্মানির তৎকালীন মুদ্রা) দেওয়া হতো, আর টাকাভর্তি সেই ব্যাগটা ছিল টেবিলের পাশেই। আমি (নাপোলিতে) যোগ দিলে টাকাটা পাব, না দিলেও পাব। তবে টাকাটা নেওয়ার পর অন্য কোনো ইতালিয়ান ক্লাবে খেলতে পারব না।’

ম্যাথাউস ভেবেছিলেন, টাকাটা তাঁর বেতনের চার গুণ। কিন্তু তিনি যে ধরনের মানুষ, ম্যারাডোনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তা মেলেনি। ম্যাথাউস তাই না করে দেন। জার্মান কিংবদন্তি পরে বায়ার্ন ছেড়ে ইন্টার মিলানে যোগ দিলেও নাপোলির ‘ঈশ্বর’–এর সঙ্গে বন্ধুত্ব অটুট ছিল। আর বন্ধুত্ব কী জিনিস, তা সবাই জানেন।

একটা মানুষ, যিনি আনন্দ–বিতর্ক ও অমিত প্রতিভা মিলিয়ে নিজ জীবনকে পরতে পরতে উপভোগ করেছেন, মাদকের ভয়াল থাবায় ডুবেও বাঁচার মতো বেঁচেছেন—তাঁকে মিস করবে না কে!

জার্মানি প্রথম ম্যাচে হারের পর ম্যাথাউসেরও কি তাঁকে মনে পড়েনি? ম্যারাডোনার মতো কেউ তাঁদেরও থাকলে জার্মানদের এখন প্রেরণার অভাব হতো না। শুধু খেলা কেন, দৈনন্দিন জীবনেও তো সবারই এমন কাউকে প্রয়োজন হয়। বিপদে যে সব সময় পাশে দাঁড়ায়, পৃথিবীর আপামর সাধারন মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ‘এস্টাবলিশমেন্ট’কে চোখ রাঙায়!

ম্যারাডোনাকে তাই আমরা মিস করি—ম্যাথাউস থেকে আপনি, আমি, আমরা সবাই!