কতটা জটিল বার্সার এই আর্থিক জটিলতা?

বার্সার সাবেক সভাপতি বার্তোমেউর সময়ে আর্থিক অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়েছে বার্সার। মেসির চুক্তি নবায়নে সেটিই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেছবি: এএফপি

সাদা চোখে দেখলে বার্সেলোনার আর্থিক জটিলতা বলতে বোঝায় দেনার দায় আর খেলোয়াড়দের উচ্চ বেতনের ভার। করোনা মহামারিতে ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়নি, ক্লাবের অফিশিয়াল স্টোর এবং বার্সা জাদুঘর দেখিয়ে আয়ের রাস্তাও বন্ধ হয়েছে। বার্সাকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে এই ব্যাপারগুলো।

জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর অধীন বার্সার আগের বোর্ডের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দলের প্রয়োজন না বুঝে বেশি বেতন আর একের পর এক চড়া দলবদল ফি–তে তারকা খেলোয়াড় কেনা বার্সাকে আগে থেকেই ক্ষতির মুখে ফেলেছে। এর মধ্যে করোনা মহামারি এসে পরিস্থিতি আরও জটিল করে দিয়েছে।

সে জটিলতার কারণেই শেষ পর্যন্ত বার্সা আর মেসির চুক্তি নবায়ন হলো না।

মেসির চুক্তি নবায়ন না হওয়ার কারণ হিসেবে বিবৃতিতে বার্সেলোনা জানিয়েছে, স্প্যানিশ লিগের বেঁধে দেওয়া বেতনের সীমার কারণেই মেসির চুক্তি নবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। একটা ক্লাবের সম্ভাব্য আয়ের ওপর নির্ভর করে বেতনের সীমা বেঁধে দেয় লা লিগা কর্তৃপক্ষ, করোনা পরিস্থিতিতে বার্সার পক্ষে সেটি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। সম্ভব করতে হলে প্রায় ২০ কোটি ইউরোর মতো বেতনের ভার কমাতে হতো।

কিন্তু  খেলোয়াড়দের বেতন কমানো, খেলোয়াড় বিক্রি করা কিংবা ধারে পাঠানোর মতো ব্যবস্থা নিয়েও লিগের বেঁধে দেওয়া বেতনের সীমার মধ্যে থেকে মেসিকে নিবন্ধন করানো সম্ভব হচ্ছে না বার্সার পক্ষে।

বার্সার আর্থিক পরিস্থিতি আসলে কতটা জটিল, সেটি কদিন আগে দারুণভাবে ব্যাখ্যা করেছে ফুটবলের আর্থিক দিক নিয়ে কাজ করা টুইটার অ্যাকাউন্ট সুইস র‍্যাম্বল। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক এই অ্যাকাউন্টের বিশ্লেষণে হিসাবের কারিগরি অনেক প্যাঁচ আছে। তবু প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য সেটি তুলে ধরা হলো।

মেসিকে ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সভাপতি পদে নির্বাচিত লাপোর্তা প্রতিশ্রুতি পূরণ করার শত চেষ্টা করেও পারলেন না
ছবি: টুইটার

২০ কোটি ইউরোর বেশি খরচ কমাতে না পারলে লা লিগা বার্সেলোনাকে তাদের নতুন খেলোয়াড়দের নিবন্ধন করতে দেবে না। এই নতুন খেলোয়াড়দের মধ্যে সের্হিও আগুয়েরো, এরিক গার্সিয়া, মেম্ফিস ডিপাই ও এমারসন রয়াল আছেন। এঁদের মূলত বিনা মূল্যেই কিনেছে বার্সা, কিন্তু এখনো দলবদলের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা যায়নি।

বার্সার আর্থিক জটিলতা মেসির প্রস্তাবিত পাঁচ বছরের নতুন চুক্তিকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। ক্লাব মেসির চুক্তির আর্থিক দিক নিয়ে সৃষ্টিশীল উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে, প্রথম বছরে বিশাল অঙ্কের বেতন কর্তন (গুঞ্জন সত্যি হলে ৫০ শতাংশ), যে ধাক্কা সামলাতে চুক্তিটাকে লম্বা করা হয়েছে, ভবিষ্যতে ‘শুভেচ্ছাদূত হিসেবে’ সম্ভাব্য কাজের বেতনও ধরা হয়েছে।

প্রতি মৌসুমেই লা লিগা খরচের সীমা বেঁধে দেওয়ার কঠোর নিয়ম তৈরি করে। প্রতিটি ক্লাব তাদের মূল দলের খেলোয়াড়, রিজার্ভ, একাডেমি, কোচ, ফিজিও ইত্যাদির ক্ষেত্রে কত খরচ করতে পারবে, সেটা ঠিক করে দেয় এই নিয়ম। যদিও (মূল দলের জন্য নির্ধারিত খরচের হারের মধ্যে) খেলোয়াড়ের বেতন আর দলবদলে কত খরচ করবে, সেটা ক্লাবই নির্ধারণ করবে।

বেতনের সীমাটা হচ্ছে আসলে আসন্ন মৌসুমে ক্লাবের সম্ভাব্য আয় থেকে এর পরিচালন ব্যয় ও দেনা পরিশোধের খরচ বাদ দিলে যে অঙ্ক থাকে, সেটি। উয়েফার আর্থিক সংগতির নীতি (ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে) যেখানে বিগত বছরগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখে, লা লিগার নিয়ম সেখানে অগ্রিম আরোপ করা, অর্থাৎ খরচের আগে নিয়ম দেখে নিতে হবে।

কোভিডের জন্য লা লিগা কিছু নিয়ম শিথিল করেছে, ২০২০–২১ মৌসুমে মূল দলের পেছনে খরচের ক্ষেত্রে সীমা কিছুটা ছাড়ালেও তার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়নি, যেটা গত মৌসুমে বার্সেলোনাকে সাহায্য করেছিল। তবে (লিগের) সভাপতি হাভিয়ের তেবাস পরিষ্কার করে দিয়েছেন, এই মৌসুমে ক্লাবগুলো একই কাজ করতে পারবে না।

২০১৯–২০ মৌসুমে বার্সেলোনার বেতনের সীমা ছিল ৬৭ কোটি ১০ লাখ ইউরো, সেটি ২০২০–২১ মৌসুমে নেমে এসেছে ৩৪ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। তাদের এই ৩২ কোটি ৪০ লাখ ইউরো বেতনের কর্তন লা লিগায় সবচেয়ে বেশি। আগে তাদের বেতনের সীমাটা সবার চেয়ে বেশি ছিল, পরে রিয়াল মাদ্রিদ (৪৭ কোটি ৩০ লাখ ইউরো) সেটি অতিক্রম করে গেছে।

তার ওপর বার্সেলোনার আসন্ন মৌসুমের বেতনের সীমা আরও কমিয়ে দিয়েছে লিগ কর্তৃপক্ষ। বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যমই অঙ্কটা বলছে ১৬ কোটি ইউরো, কেউ বলছে ২০ কোটি ইউরো। যা-ই হোক, এই বেতনের সীমা মানে বার্সাকে আরও বিশাল পরিমাণ বেতন কর্তন করতে হবে।

রোনালদোর পর এবার মেসিকেও হারাচ্ছে স্প্যানিশ লিগ?
ফাইল ছবি: রয়টার্স

তেবাস বলেছেন, ‘যখন কোনো ক্লাব বেতনের সীমার বেশি খরচ করে, তারা শুধু ওই খেলোয়াড়দেরই দলে নিবন্ধন করাতে পারবে, যাদের পেছনে সঞ্চয়ের ২৫ শতাংশ খরচ হবে।’ অর্থাৎ দলবদলে পাওয়া টাকার ২৫ শতাংশই শুধু কোনো দল নতুন খেলোয়াড়ের পেছনে খরচ করতে পারবে, বাকি ৭৫ শতাংশ কাজে লাগাতে হবে দেনা পরিশোধে।

তেবাস আরও বলেন, ‘যদি বার্সেলোনা একজন খেলোয়াড়কে ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ইউরোতে বিক্রি করে, সেখান থেকে তারা শুধু ২৫ মিলিয়ন বা ২.৫ কোটি ইউরো খরচ করতে পারবে। যদি কোনো খেলোয়াড়কে দলে আনে, যার পেছনে মৌসুমে আড়াই কোটি ইউরো খরচ হবে, সেটির বিপরীতে তাদের ১০ কোটি ইউরো আয় করতে হবে। সেই আয়টা খেলোয়াড় বিক্রি করেও হতে পারে কিংবা বেতন কমিয়ে।’

মেসির জন্য শর্ত শিথিল করা হবে না জানিয়ে তেবাস গত জুলাইয়ে বলেন, ‘বার্সা এই মুহূর্তে বেতনের সীমার বেশি খরচ করছে। বেতনের বিল কমানোর জন্য তারা যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেটা ঠিকপথেই আছে। কিন্তু মেসির জন্য কোনো বিশেষ নিয়ম করা হবে না। আশা করি তারা এই বেতনের সীমার মধ্যেই মেসির বেতনকে অন্তুর্ভুক্ত করতে পারবে, কিন্তু সেটি করার জন্য তাদের অন্য কোনো খেলোয়াড়কে বেতনের বিল থেকে বের করতে হবে।’

বার্সেলোনার বেতনের বিল শুধু স্পেনেই সবচেয়ে বেশি নয়, ইউরোপের অন্য যেকোনো ক্লাবের চেয়েও অনেক বেশি। বিশেষ করে ২০১৯ সালে তাদের ৫০ কোটি ১০ লাখ ইউরোর বেতনের বিল ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেতন দেওয়া ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের (৩৭ কোটি ৭০ লাখ ইউরো) চেয়ে ৩৩ শতাংশ বেশি। সাবেক সভাপতি জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর অধীনে বেতনের বিল চরমভাবে বেড়ে গিয়েছিল।

৫০ কোটি ১০ লাখ ইউরো থেকে ২০২০ সালে বেতনের বিল কমিয়ে ৪৪ কোটি ৩০ লাখ করলেও বার্সেলোনার বেতনের বিল তখনো ইউরোপে সবচেয়ে বেশি ছিল, দুই নম্বরে থাকা ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে ৪ কোটি ২০ লাখ ইউরো বেশি। তেবাস বলেছিলেন, ‘বেতনের সীমার দিক থেকে বার্সা সব সময়ই একেবারে সীমার চূড়ায় ছিল। মহামারি যখন আঘাত হানল, ওদের আর সেটি সামলে নেওয়ার মতো জায়গা ছিল না।’

মেসির (প্রস্তাবিত পাঁচ বছরের গুঞ্জনে বেতন অর্ধেক কমানোর) উদাহরণের পর বার্সেলোনা চেষ্টা করেছে তাদের খেলোয়াড়দের বেতন কর্তনে রাজি করাতে। জেরার্ড পিকে, মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেন, ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং, ক্লেমঁ লংলের মতো খেলোয়াড়েরা বেতন কমাতে রাজিও হয়েছেন, অন্যদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

মেসি ও নেইমার আবার সতীর্থ হবেন পিএসজির জার্সিতে?
ছবি: টুইটার

বার্সেলোনার আয়ের বিপরীতে বেতনের অনুপাত একেবারে বাজে ছিল না, কিন্তু এটা গত তিন বছরে ৫২ শতাংশ থেকে বেড়ে (খারাপ হয়ে) ৬২ শতাংশ হয়েছে। সেটাও ছিল কোভিডের আগের কথা, সে কারণে ২০২০–২১ মৌসুমে আয় ভীষণভাবে কমে যাওয়ায় সেটির প্রভাবও পড়েছে এই অনুপাতে।

কেউ কেউ ভাবতে পারেন না, মহাশক্তিশালী বার্সেলোনা কীভাবে এই দুরবস্থায় পড়ল, বিশেষ করে যেখানে ২০১৯–২০ মৌসুমে বিশ্বজুড়ে তাদের ৭১ কোটি ৫০ লাখ ইউরো আয় ডেলয়েট মানি লিগের (আয়-লাভের হিসাব করা প্রতিষ্ঠান) হিসাবে সবার ওপরে ছিল।
২০২০ সালে বার্সেলোনার আয় কমে গেছে ১২ কোটি ৬০ লাখ ইউরো, ইউরোপিয়ান সুপার লিগ প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া ১২ ক্লাবের মধ্যে যেটি ছিল ম্যানচেস্টার সিটির পর (১৩ কোটি ১০ লাখ ইউরো) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বিপরীত দিকে, রিয়াল মাদ্রিদের আয় কমেছে ৪ কোটি ২০ লাখ ইউরো।

কোভিডের কারণে ২০২০ সালে তাদের ২০ কোটি ৩০ লাখ ইউরো ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্সেলোনা। ২০২১ সালে আরও ২৬ কোটি ৭০ লাখ ইউরো ক্ষতি হবে বলে অনুমান করেছিল। তার মানে ২ বছরে ৪৭ কোটি ইউরো ক্ষতি। আরও বেশিও হতে পারে, কারণ এই অনুমানের ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয়েছে মৌসুমের শুরুর দিক থেকেই মাঠে দর্শক থাকবে।

বার্সেলোনার আয়ের হিসাবে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে আয়ও বড় ভূমিকা আছে। এই আয় কিছুটা বেড়েছে ২০১৯ সাল থেকে উয়েফা সূচকের হিসাবে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করায় (যে ব্যবস্থায় স্প্যানিশ ক্লাবগুলোর লাভ হয়েছে)। যা-ই হোক, ২০১৫ সাল থেকে কখনো চ্যাম্পিয়নস লিগে কোয়ার্টার ফাইনালের পরে যেতে পারেনি বার্সা, ২০২১ সালে শেষ ষোলো পর্যন্ত গেছে। যেটি চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে তাদের আয় কমিয়েছে।

এটাও হিসাবে রাখতে হবে যে বার্সেলোনার বাণিজ্যিক আয় কমেছে। সেটা কিছুটা হয়েছে তাদের খুচরা পণ্য বিক্রির অফিশিয়াল শপ বন্ধ থাকায়, চুক্তি সম্পন্ন করতে না পারায়, পাশাপাশি এটাও খবরে এসেছে যে রাকুটেনের সঙ্গে বার্সার জার্সি স্পনসরশিপের চুক্তি ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর ক্ষেত্রে বার্সার আয় ৫ কোটি ৫০ লাখ ইউরো থেকে ৩ কোটি ইউরোতে নেমেছে।

২০২০ সালে বার্সার কর–পূর্ববর্তী ক্ষতি হয়েছে ১২ কোটি ৮০ লাখ ইউরো, যেখানে রিয়াল মাদ্রিদ ২০ লাখ ইউরো লাভ করেছে। গত তিন বছরে রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে বার্সার লাভ ২০ কোটি ৩০ লাখ ইউরো কম হয়েছে।

শূন্য গ্যালারিতে বার্সার হয়ে সর্বশেষ ম্যাচটি খেললেন মেসি
ছবি: রয়টার্স

অন্য অনেক ক্লাবের মতো বার্সেলোনাও খেলোয়াড় বিক্রি করার আয়ের ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। গত তিন বছরে এই খাত থেকে তাদের ৩৮ কোটি ২০ লাখ ইউরো আয় হয়েছে, যার মধ্যে ২০১৮ সালে নেইমারকে আকর্ষণীয় দামে (২২ কোটি ২০ লাখ ইউরো) পিএসজির কাছে বিক্রি করার হিসাব আছে। যদিও ২০২০–২১ মৌসুমের বাজেটে এ খাত থেকে নেট আয় মাত্র ২ কোটি ৮০ লাখ দেখানো হয়েছে।

এটার মানে হচ্ছে ২০২০ সালে বার্সার নেট ক্ষতি ছিল ১৭ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর বিশাল অঙ্ক, গত তিন বছরে ক্ষতিটা দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ২০ লাখ ইউরো। সুপার লিগে খেলা ক্লাবগুলোর মধ্যে তিনটি ক্লাবের ক্ষতি এর চেয়ে বেশি ছিল (জুভেন্টাস, এসি মিলান ও ম্যান সিটি)। কিন্তু বার্সার সঙ্গে ওই তিন ক্লাবের পার্থক্য হচ্ছে, তিনটি ক্লাবই মালিকের কাছ থেকে পাওয়া অর্থে ক্ষতি সামলে নিয়েছে (বার্সার মালিকানা মডেল ভিন্ন, এখানে ক্লাবের কোনো মালিক নেই, সব সিদ্ধান্ত নেন ক্লাবের নিবন্ধিত সদস্য বা সোশিওরা)।

বার্সেলোনার খেলোয়াড়ের পেছনে অন্য খরচ, যেমন খেলোয়াড় কেনার অর্থ অবলোপন (খরচ একবারে না দেখিয়ে কয়েক বছরে বণ্টন করে দেওয়া), অবলোপনের বার্ষিক চার্জ গত তিন বছরে ১০ কোটি ইউরো বেড়ে ৬ কোটি ৭০ লাখ থেকে হয়েছে ১৭ কোটি ৪০ লাখ ইউরো। যেটা ইউরোপে সবচেয়ে বেশি।

বার্সেলোনা যদি কোনো রকমে বাজার মূল্যের চেয়ে কম দামে খেলোয়াড় বিক্রি করে কিংবা তাদের (ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে) চুক্তি বাতিল করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেলোয়াড়দের বের করতে চায়, তাহলে এই দিকটা ঝামেলা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, সে ক্ষেত্রে অবলোপনের বাকি বছরগুলোর বিপরীতে অর্থ ক্লাবকে একবারেই খরচ দেখাতে হবে। উদাহরণ হিসেবে, মিরালেম পিয়ানিচের দলবদলের খরচের (৬ কোটি ইউরো) মধ্যে ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো এখনো অবলোপনের জন্য বাকি আছে।

বার্সেলোনা দলবদলের বাজারে বড় খরচ করেছে, গত তিন বছরের গড় খরচ ৩২ কোটি ইউরো। যেটা কিনা এর আগের পাঁচ বছরের গড় খরচের (১০ কোটি ৩০ লাখ ইউরো) প্রায় তিন গুণ। এই তিন বছরে খেলোয়াড় বিক্রিও বেড়েছে, কিন্তু নেট খরচ (খেলোয়াড় কেনার খরচ থেকে খেলোয়াড় বিক্রির আয় বাদ দিলে যেটি থাকে) ৬ কোটি ৪০ লাখ ইউরো থেকে বেড়ে ১৩ কোটি ২০ লাখ ইউরো হয়েছে।

মেসির বার্সার সঙ্গে সম্পর্ক শেষের খবরে হতাশ বার্সা সমর্থক তরুণী
ছবি: রয়টার্স

বার্সার এই দলবদলের খরচের বেশির ভাগই হয়েছে ধারে। যে কারণে দলবদলের দেনা যেখানে ২০১৭ সালে ছিল ৬ কোটি ৪০ লাখ, ২০২০ সালে সেটি হয়েছে ৩২ কোটি ৩০ লাখ। এটাও ইউরোপে সবচেয়ে বেশি।

বার্সেলোনার মোট আর্থিক দেনা দুই বছরে ৬ কোটি ৮০ লাখ ইউরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ কোটি ইউরোতে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ধার আছে ২৭ কোটি ৯০ লাখ ইউরো, বন্ড বিক্রি করেছে ২০ কোটি ১০ লাখ ইউরোর। দেনার যে সংজ্ঞা উয়েফা দিয়েছে, সেটির হিসাবে (আর্থিক দেনা, দলবদলের দেনা) বার্সেলোনার দেনার পরিমাণ ৮০ কোটি ৩০ লাখ ইউরো, যা ইউরোপে টটেনহামের (১১০ কোটি) পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। যদিও লন্ডনের ক্লাব টটেনহাম ওই দেনার টাকা দিয়ে আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তুলেছে অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম।
বকেয়া বেতন, কর কর্তৃপক্ষের কাছে দেনা ও অন্যান্য দেনাও হিসাবে নিলে বার্সার মোট দেনার পরিমাণ ১২০ কোটি ইউরো।

দেনা নিয়ে অন্য যে কারও চেয়ে বার্সেলোনা বেশি বিপদে পড়ার কারণ হলো এই দেনার বেশির ভাগই স্বল্পমেয়াদি, অর্থাৎ আগামী ১২ মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। ব্যাংক থেকে ধারের ২৬ কোটি ৮০ লাখসহ স্বল্পমেয়াদি দেনার অঙ্কটা ৭৩ কোটি ১০ লাখ ইউরো। যে কারণে বার্সেলোনার দেউলিয়া হওয়ার শঙ্কাও জেগেছিল। লাপোর্তা সভাপতি হয়ে আসার পর অবশ্য গত জুনে আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাখসের কাছ থেকে ৫২ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর দীর্ঘমেয়াদি ধার নিয়েছে বার্সা (৩ শতাংশ সুদে, ১৫ বছরের মেয়াদ), যে অর্থ দিয়ে স্বল্পমেয়াদি দেনা শোধ করা হবে।

দেনার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বার্সাকে প্রতিবছরে বড় অঙ্কের সুদও দিতে হচ্ছে। ২০১৮ সালে সুদের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ইউরো, ২০২০ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখ ইউরো! ইউরোপে এটিই সর্বোচ্চ। ২০২১ সালে সুদের অঙ্কটা ৩ কোটি ৪০ লাখ ইউরো হবে বলে বাজেটে ধরা হয়েছে।

মেসির সঙ্গে বার্সার চুক্তি হচ্ছে না - বার্সার এমন বিবৃতির পর ক্লাবের প্রবেশদ্বারে সমর্থকেরা জড়ো হন
ছবি: রয়টার্স

দেনা শোধে টাকা আনতে বার্সেলোনাকে খেলোয়াড় বিক্রি করতে হবে, অথবা তাদের ধারে পাঠিয়ে কিংবা চুক্তি বাতিল করে বেতনের বিল কমাতে হবে। এর মধ্যে ফিরপো, তোদিবো, আলেনিয়া, ত্রিনকাওয়ের (ধার) মতো খেলোয়াড়দের বেতনের বিল থেকে বের করেছে বার্সা।

কুতিনিও, দেম্বেলেকেও বিক্রি করতে চায় বার্সা, কিন্তু দুজনই এই মুহূর্তে চোটে। ফলে তাঁদের জন্য যে খরচ হয়েছে, তার ধারেকাছের কোনো অঙ্ক পাওয়া যাবে না এ দুজনকে বিক্রি করে। (বেতনের বিল কমানোর জন্য) বিনা মূল্যে পিয়ানিচ, উমতিতিকে ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছে বার্সা।

তার মানে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে খেলোয়াড়দের বার্সা বিক্রি করতে চায়, তাঁদের বিক্রি করে খুব বেশি অর্থ পাবে না ক্লাবটি। আবার যাঁদের ক্লাবে রাখতে চায়, তাঁদের ঘিরেই দলবদলে অন্য ক্লাবগুলোর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।

আর্থিকভাবে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ার কারণেই বার্সা আরও বেশি ইউরোপিয়ান সুপার লিগের দিকে ঝুঁকেছে। কারণ, সেই লিগে যোগ দিলেই ২৭ কোটি ইউরো ‘অভ্যর্থনা’ হিসেবে পাবে বার্সা, পরের দুই বছরে পাবে ৬ কোটি ইউরো করে। এর বাইরে প্রতিবছরে প্রায় ২৩ কোটি ৫০ লাখ ইউরো প্রকল্পিত আয় তো আছেই!

বার্সার এই আর্থিক ঝামেলা হঠাৎ হয়নি। ক্লাবের নতুন বোর্ডের আর্থিক বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এদুয়ার্দ রোমেউ যেমন সর্বশেষ বার্ষিক সভায় বলছিলেন, ‘শুধু কোভিডই সবকিছুর জন্য দায়ী নয়। এর আগ থেকেই সবকিছু খুব বাজেভাবে হয়ে এসেছে।’ বার্সার নতুন সভাপতি লাপোর্তা সাবেক সভাপতি বার্তোমেউর বোর্ডের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, লা লিগার আর্থিক এই কড়াকড়ি ‘আমরা এসেই পেয়েছি।’

এই অবস্থা থেকে বেরোতে বার্সাকে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হতো। ধারণা করা হচ্ছিল, বার্সা প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেলোয়াড়দের জোর করেই বিক্রি করে দেবে। কিন্তু এত বেতনে কুতিনিও-উমতিতিদের কিনতে আগ্রহী ক্লাবের সংখ্যা কম। অবশেষে কঠিন সিদ্ধান্তটা এল বার্সা সমর্থকদের দুঃস্বপ্ন হয়ে—মেসি আর বার্সার বিচ্ছেদ!