গত রাতে পিএসজিকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে নিয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ। পূরণ করেছে ট্রেবল জয়ের লক্ষ্য। কিন্তু কীভাবে কৌশলের খেলায় নেইমারদের হারিয়েছেন লেভানডফস্কিরা?
বছরের শুরুতেও যদি কোনো বায়ার্ন ভক্তকে বলা হতো, বাভারিয়ানরা ট্রেবল জিতবে—কয়জন বিশ্বাস করতেন কথাটা?
বায়ার্নের অবস্থাটা ঠিক তেমনই ছিল। কোচ নিকো কোভাচের অধীনে খাবি খাচ্ছিল জার্মান চ্যাম্পিয়নরা। আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছে ৫-১ গোলে বিধ্বস্তও হয়েছিলেন লেভা-মুলাররা। এরপর কোভাচ বিদায় নিলেন। আলেগ্রি-পচেত্তিনো বহু কোচের নাম শোনা গেলেও বায়ার্ন আস্থা রাখল কোভাচের সহকারী হান্সি ফ্লিকের ওপর। আর সঙ্গে সঙ্গে ভোজবাজির মতো বদলে গেল বায়ার্নের ভাগ্য। লিগ আর কাপ তো জেতা হয়েছেই, গত রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে সফল মৌসুমের দুর্দান্ত এক পরিসমাপ্তি টানল বায়ার্ন।
ম্যাচ জেতার সুযোগ যে পিএসজি পায়নি, তা না। সুযোগ পেয়েছে দুই দলই। কিন্তু গোলমুখে সফল ছিল বায়ার্নই। ওদিকে নেইমারদের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার। দুইয়ের যোগফল, বায়ার্নের ইউরোপ জয়।
ম্যাচের আগে দুই দলের ছক যেমন হবে ভাবা হয়েছিল, তেমনই হয়েছে। পিএসজি নেমেছে তাদের চিরচেনা ৪-৩-৩ ছকে, বায়ার্ন ৪-২-৩-১। চোট কাটিয়ে পিএসজির মূল গোলরক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন কেইলর নাভাস। সেমির দলের সঙ্গে এই দলের পার্থক্য এই একটাই। অর্থাৎ সুস্থ হওয়ার পরেও মার্কো ভেরাত্তিকে শুরু থেকে নামাননি পিএসজি কোচ টমাস টুখেল। সেমিফাইনালে দুর্দান্ত খেলার পুরস্কার পেয়েছেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। মিডফিল্ডে পারেদেসের সঙ্গী ছিলেন মার্কিনহোস ও আন্দের হেরেরা। রক্ষণভাগে জুটি বেঁধেছিলেন যথারীতি প্রেসনেল কিমপেম্বে ও থিয়াগো সিলভা, দুই ফুলব্যাক হুয়ান বের্নাত (বাম) ও থিলো কেহরার (ডান)। আক্রমণভাগে এমবাপ্পে মূল স্ট্রাইকার রেখে ডানে-বাঁয়ে খেলানো হয়েছে যথাক্রমে অ্যানহেল ডি মারিয়া ও নেইমারকে।
ওদিকে বায়ার্ন একাদশেও বদল ছিল একটা। বাঁ উইংয়ে ক্রোয়েশিয়ার ইভান পেরিসিচের জায়গায় কোচ হান্সি ফ্লিক নামিয়েছিলেন সাবেক পিএসজি তারকা কিংসলে কোমানকে। উদ্দেশ্য একটাই। গতিতে পিএসজির রক্ষণকে দিশেহারা করে ফেলা।
মাঝে টমাস মুলার, ডানে সার্জ নাব্রি, ওপরে লেভানডফস্কি। বেঞ্জামিন পাভার সুস্থ হলেও তাঁকে দলে জোর করে ঢোকাননি ফ্লিক। মিডফিল্ডে থিয়াগো আলকানতারার সঙ্গে লিওন গোরেৎস্কা। রক্ষণভাগে জেরোম বোয়াটেংয়ের সঙ্গে ডেভিড আলাবার জুটি, দুই ফুলব্যাক ইওশুয়া কিমিখ ও আলফোনসো ডেভিস। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোয়াটেং চোটে পড়ে বের হয়ে যান, তাঁর জায়গায় আনা হয় নিকলাস সুলাকে। এই বদলিটা বায়ার্নের জন্য এক রকম শাপেবর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ হাই লাইন রক্ষণে বোয়াটেং কালকেও খাবি খাচ্ছিলেন, বোয়াটেংয়ের জায়গায় সুলা নেমে সমস্যাটা সমাধান করার দিকে নজর দেন। (ছবি : 3)
আগের ম্যাচগুলোতেও বায়ার্ন দেখিয়েছে, গোল করা ছাড়াও তাদের আক্রমণভাগ আরেকটা কাজে যথেষ্ট পটু। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে দুর্দান্তভাবে প্রেস করে বল কেড়ে নেওয়ার ব্যাপারে সফলতা দেখাচ্ছেন আক্রমণভাগের চারজনই। এর মধ্যে লেভানডফস্কির ভূমিকা থাকে ওপর থেকে একটু নিচে নেমে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে প্রেস করে তাঁর খেলা নষ্ট করে দেওয়ার। যে কাজটা তিনি কোয়ার্টারে বার্সেলোনার বুসকেটসের বিপক্ষে দুর্দান্তভাবে করেছিলেন। প্রায়ই লেভানডফস্কির প্রেসে দিশেহারা হয়ে নিজের স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারছিলেন না বুসকেটস।
ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে প্রেস করার জন্য লেফানডফস্কি নেমে এলে দুই উইঙ্গারের কাজ হয় প্রতিপক্ষের দুই সেন্টারব্যাককে প্রেস করা, ফলে সেন্টারব্যাকদ্বয় ও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের মধ্যে যোগাযোগটা নষ্ট হয়। সুবিধা পেয়ে যান লেভানডফস্কিরা। এই কাজটা পিএসজির বিপক্ষেও অত্যন্ত সফলভাবে করেছে বায়ার্ন। ম্যাচে পিএসজির ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মার্কিনিওসকে নিচে নেমে প্রেস করেছেন লেভা, আর দুই সেন্টারব্যাক সিলভা ও কিমপেম্বেকে ক্রমাগত প্রেস করে গেছেন বায়ার্নের দুই উইঙ্গার নাব্রি ও কোমান। এর মধ্যে কোমান আবার এক কাঠি সরেস। যার বদলে দলে ঢুকেছেন, সে পেরিসিচের তুলনায় কোমান বল পায়ে কারিকুরি করতে পারেন বেশ, গতিও আছে অনেক। ফলে থিয়াগো সিলভার বেশ ব্যস্ত সময় কেটেছে।
গোলরক্ষক নাভাসের মাধ্যমে পেছন থেকে আক্রমণ গড়তে চেয়েছিল পিএসজি। নাভাস যেহেতু ‘সুইপার কিপার’ (যে গোলরক্ষক সাধারণ গোলরক্ষকের মতো সেইভ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত একজন ডিফেন্ডারের মতো পেছন থেকে আক্রমণ গড়ার কাজে সাহায্য করেন, বিপদ আঁচ করতে পেরে আগেই প্রয়োজনে ডিবক্স থেকে বের হয়ে এসে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেস্তে দেন) হিসেবে নয়্যারের মতো অতটা কার্যকরী নন, তাই নাভাসের কাছ থেকে পাস নেওয়ার জন্য নিজেদের ডিবক্সেই সেঁধিয়ে ছিলেন সিলভা ও কিমপেম্বে। ওই দুজনকেই প্রেস করেছেন নাব্রি আর কোমান। ফলে দুই সেন্টারব্যাককে নিশ্চিন্তে পাস দিতে পারছিলেন না নাভাস।
ওদিকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মার্কিনিওসকে প্রেস করে যাচ্ছিলেন লেভানডফস্কি। ফলে তাঁর দিকেও পাস দিতে পারছিলেন না নাভাস। মাঝে মাঝে মার্কিনিওসকে সাহায্য করার জন্য নেমে আসছিলেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। তা দেখে পারেদেসকে আবার প্রেস করছিলেন মুলার। ফলে রক্ষণভাগ থেকে বল বের করার জন্য দুই ফুলব্যাক বের্নাত আর কেহরার ছাড়া তেমন সুযোগ ছিল না নাভাসের কাছে। ফলে ম্যাচের সময় যত গড়াচ্ছিল, পিএসজি তত বেশি লং বলের আশ্রয় নিচ্ছিল, ছোট ছোট পাস দিয়ে রক্ষণভাগ থেকে খেলা গড়তে পারছিল না, মাঠের মধ্যপথ দিয়ে আক্রমণ করতে পারছিল না। মাঝমাঠ দিয়ে বল বের করার চেষ্টা করলেও বল হারাচ্ছিল বারবার, তখন দলকে বারবার বিপদমুক্ত করছিলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মার্কিনিওস।
এই ম্যাচে জিততে হলে পিএসজির যেটা করতে হতো, সেটা হলো বায়ার্নের দুই ফুলব্যাকের মধ্যে অপেক্ষাকৃত আক্রমণাত্মক আলফোনসো ডেভিস যেন তাঁর দিকে থাকা উইঙ্গার কোমানের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ করতে না পারেন, সেদিকে লক্ষ্য রাখা। সে কাজে তারা পুরোপুরি সফল, অন্তত প্রথমার্ধে। পিএসজির রাইটব্যাক কেহরার প্রথমার্ধে ডেভিসকে বেশ যন্ত্রণা দিয়েছেন। ওদিকে কোমানও নিচে নেমে রক্ষণের ক্ষেত্রে ডেভিসকে সাহায্য করার ব্যাপারে অতটা আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন না। ফলাফল, প্রথমার্ধেই হলুদ কার্ড দেখে বসেন ডেভিস।
দ্বিতীয়ার্ধে এই দুর্বলতাকেই অন্যতম শক্তিতে পরিণত করে পিএসজি। থিলো কেহরারকে রাইটব্যাকে খেলানো হলেও, মূলত তিনি একজন সেন্টারব্যাক। ডান পায়ের হওয়ার কারণে রাইটব্যাকেও খেলতে পারেন, এই যা। দ্বিতীয়ার্ধে এই জায়গাটাকে টার্গেট করে খেলতে নামে বায়ার্ন। ডেভিস, কোমান ও কিছু ক্ষেত্রে মুলার, তিনজনের চাপে খাবি খাচ্ছিলেন কেহরার। ওদিকে মাঝমাঠের দুর্দান্ত প্রেসের কারণে বায়ার্নের আরেকটা সুবিধা হচ্ছিল, থিয়াগো আলকানতারা মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার পর্যাপ্ত জায়গা, সময় ও সুযোগ পাচ্ছিলেন। এই দুয়ের সমন্বয়েই বায়ার্ন পেয়ে যায় পরম আরাধ্য গোল। মাঝমাঠ থেকে থিয়াগোর মাপা বল পিএসজির মিডফিল্ড ভেদ করে আসে কিমিখের পায়ে, সেখান থেকে বায়ার্নের রাইটব্যাক অসাধারণ এক ক্রস দেন কোমানের উদ্দেশ্যে। বক্সে থাকা লেভানডফস্কির দিকে মনোযোগ দেওয়া কেহরার বুঝতেই পারেননি, পেছনে কোমানের মুভমেন্ট। যতক্ষণে পেছনে ফিরলেন, ততক্ষণে কোমানের হেড দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।
মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগে বায়ার্নের প্রেসে দিশেহারা পিএসজি মিডফিল্ড থেকে নেইমার আর এমবাপ্পেকে তেমন সাহায্যও করতে পারছিলেন না। যে আশায় পারেদেসকে নামানো হয়েছিল, খেলা গড়ে দেওয়ার কাজটা ভালো করতে পারেননি এই আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার। পারেদেসের বদলি ভেরাত্তিও কাজটা করতে পারেননি। যে দুই-একটা সুযোগ পাচ্ছিলেন নেইমার, ডি মারিয়া, এমবাপ্পেরা—সেগুলোও দৃষ্টিকটুভাবে মিস করেছেন। আর সামনে মানব দেওয়াল হিসেবে নয়্যার তো ছিলেনই।
মাঝমাঠ থেকে বল না পাওয়ার কারণে নেইমার বেশ নিচে খেলেছেন, যোগান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এমবাপ্পেকে। ওদিকে ডি মারিয়াও ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। ব্যক্তিগত প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে নেইমার আর এমবাপ্পে কিছু সুযোগ পেলেও বায়ার্ন রক্ষণভাগের শক্তিমত্তার কাছে নেইমার এমবাপ্পেরা পেরে উঠছিলেন না। এ অবস্থায় স্ট্রাইকে একজন শক্তিশালী খেলোয়াড় থাকলে সুবিধা পেত ফরাসি ক্লাবটা, যার কাজ হতো শক্তির দিক দিয়ে বায়ার্নের রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে ডিবক্সে এমবাপ্পের জন্য জায়গা সৃষ্টি করা। আর এই জায়গাতেই এডিনসন কাভানির অভাব ভুগিয়েছে পিএসজিকে।
গত জুলাইয়ে যেসব খেলোয়াড়দের চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে শুধু থিয়াগো সিলভা আর এরিক মাক্সিম চুপো মোতিংয়ের সঙ্গে দুই মাসের চুক্তি বাড়িয়েছিল পিএসজি। কাভানি বা রাইটব্যাক টমাস মনিয়েঁর সঙ্গে নয়। চুক্তি বাড়ালে হয়তো গতকাল ম্যাচের অবস্থা দেখে স্ট্রাইকে কাভানিকে নামাতে পারতেন পিএসজি কোচ টমাস টুখেল, রাইটব্যাকে কেহরারের জায়গায় খেলতেন মনিয়েঁ। আর সেটা হলে হয়তো ম্যাচের ফল ভিন্নও হতে পারত।
এসব ছোট-ছোট বিষয় গুলিই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে দুই দলের মধ্যে। আর বায়ার্নকে এনে দিয়েছে তাঁদের ষষ্ঠ চ্যাম্পিয়নস লিগ।