পুরোনো ‘শত্রু’ লিভারপুলের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল এসি মিলান
চ্যাম্পিয়নস লিগ। লিভারপুল। এসি মিলান।
শব্দগুলো বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০০৫ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে দুই দলের অবিশ্বাস্য সেই পারফরম্যান্স। প্রথম মিনিটেই পাওলো মালদিনির গোল। লিভারপুলের রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে এর্নান ক্রেসপোর জোড়া গোল। পরে অধিনায়ক স্টিভেন জেরার্ডের কাঁধে চড়ে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখে লিভারপুল। জেরার্ডের সেই হেড, কিংবা দুদেকের অবিশ্বাস্য জোড়া সেভ। পেনাল্টিতে শেষমে হাসে লিভারপুলই।
দুবছর পর আবারও চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয় এই দুই দল। এবার অবশ্য দুই বছর আগে পাওয়া বেদনার হিসাব চুকিয়ে দেয় মিলান। জোড়া গোল করে ফিলিপ্পো ইনজাঘি বোঝান, কেন তাঁকে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর স্ট্রাইকার বলা হতো সে সময়।
চ্যাম্পিয়নস লিগে সেদিন আর নেই। দুই দল মিলে ১৩টি শিরোপা জেতা লিভারপুল-এসি মিলান মাঝে খর্ব শক্তির হয়ে পড়েছিল। লিভারপুল তাও নিজেদের খারাপ সময় কাটিয়ে এসে গত কয়েক বছরে একবার চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জিতেছে, একবার উঠেছে ফাইনালে। এসি মিলানের অবস্থা তো আরও খারাপ।
টানা সাত বছর ইউরোপীয় অঙ্গনের সর্বোচ্চ এই প্রতিযোগিতায় সুযোগ পায়নি সাতবারের চ্যাম্পিয়নরা। সাত বছর পর এবারই প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগে ফিরেছে মিলান। ফিরেই পড়েছে পুরোনো শত্রুর সামনে, যে শত্রুর সঙ্গে আগে বছর বছর আকর্ষণীয় ম্যাচ উপহার দিত তারা।
শক্তির হিসেবে এখন লিভারপুল এসি মিলানের চেয়ে ঢের এগিয়ে। তাতে কী? দলটা যে এসি মিলান! লিভারপুলের মতো তারাও যে হারার আগে হারে না! বহু বছর পর নিজেদের পুরোনো শত্রুকে পেয়ে যেন ঝলসে উঠেছিল রোজোনেরিরা। চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বে আজ নিজেদের প্রথম ম্যাচে লিভারপুলের মাঠে লিভারপুলকে ভয়ই ধরিয়ে দিয়েছিল দলটা। শেষমেশ যদিও ম্যাচ হেরেছে ৩-২ গোলে, কিন্তু তাও মিলান-লিভারপুলের খেলা দেখে ফুটবলপ্রেমীরা নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, নিশ্চিত!
লিভারপুলের হয়ে গোল করেছেন মোহাম্মদ সালাহ ও অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন। আরেকটা গোল মিলান ডিফেন্ডার ফিকায়ো তোমোরির আত্মঘাতী। ওদিকে মিলানের হয়ে গোল করেছেন ব্রাহিম দিয়াজ ও আনতে রেবিচ।
ম্যাচের শুরু থেকেই মিলানের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছে লিভারপুল। গোলের সুযোগ সৃষ্টি করছিল অনেক, কিন্তু গোলটাই আসছিল না। শেষমেশ মিলানের ইংলিশ ডিফেন্ডার ফিকায়ো তোমোরির কল্যাণে এগিয়ে যায় লিভারপুল। লিভারপুলের রাইটব্যাক ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আরনল্ডের একটা ক্রস তোমোরির পায়ে লেগে জালে জড়ায়। নয় মিনিটেই এগিয়ে যায় লিভারপুল।
১৪ মিনিটে লিভারপুলের লেফটব্যাক অ্যান্ডি রবার্টসনের শট ডি–বক্সের ভেতর মিলানের আলজেরিয়ান মিডফিল্ডার ইসমায়েল বেনেসারের হাতে লাগলে পেনাল্টি পায় লিভারপুল। অল রেডদের একের পর এক আক্রমণ সামলাতে মিলান তখন হাঁসফাঁস করছে আক্ষরিক অর্থেই। কিন্তু মোহাম্মদ সালাহর নেওয়া সে পেনাল্টি দুর্দান্ত দক্ষতায় আটকে দেন ফরাসি গোলকিপার মাইক মাইনিয়ান।
গোটা ম্যাচে দুর্দান্ত খেলেছেন এই মাইনিয়ান, সেভ করেছেন ছয়টি। মাইনিয়ান, আর নিজেদের গোল করার ব্যর্থতার কারণে আরও কয়েকটা গোল পায়নি লিভারপুল।
২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো পেনাল্টি মিস করলেন সালাহ। চার বছর আগে প্রিমিয়ার লিগে হাডার্সফিল্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ পেনাল্টি মিস করেছিলেন, এরপর টানা ১৭ পেনাল্টিতে গোল পেলেও আটকে গেলেন আজ। এদিকে লিভারপুলের পেনাল্টি মিস করা দেখে সাহস আসে মিলানের বুকে। আস্তে আস্তে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে থাকে তারা।
লিভারপুলের রক্ষণভাগে আজ ছিলেন না ভার্জিল ফন ডাইক, বহুদিন পর সুযোগ পেয়েছিলেন ইংলিশ ডিফেন্ডার জো গোমেজ। অনেক দিন পর মাঠে নেমেছিলেন দেখেই কি না মনোযোগে একটু ঘাটতি ছিল তাঁর। আর সেই সুযোগই নিয়েছে মিলান। ৪২ ও ৪৪ মিনিটে দুই গোল করে ম্যাচে ফিরে আসে মিলান। গোল করেন ক্রোয়েশিয়ান স্ট্রাইকার আনতে রেবিচ ও স্প্যানিশ মিডফিল্ডার ব্রাহিম দিয়াজ।
দ্বিতীয়ার্ধে আবারও সেই পরিচিত লিভারপুল। বেলজিয়ান স্ট্রাইকার দিভক অরিগির সহায়তায় ৪৯ মিনিটে পেনাল্টি মিসের প্রায়শ্চিত্ত করেন সালাহ। ৬৯ মিনিটে দূরপাল্লার এক শটে দলকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন। হেন্ডারসনের গোলেই নিশ্চিত হয়ে যায়, ম্যাচটা লিভারপুলই জিতছে।
পুরো তিন পয়েন্ট নিয়ে নিজেদের গ্রুপে শীর্ষে আছে লিভারপুল। আর ম্যাচ হারার কারণে পয়েন্ট তালিকার সবার নিচে আছে মিলান। ওদিকে গ্রুপের বাকি দুই দল আতলেতিকো মাদ্রিদ আর পোর্তো গোলশুন্য ড্র করে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেছে।