বাংলাদেশ বদলে গেছে 'থ্রি এস'-এ

এবারের এশিয়ান গেমসে বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশ দলের দেখা মিলেছে। সংগৃহীত ছবি
এবারের এশিয়ান গেমসে বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশ দলের দেখা মিলেছে। সংগৃহীত ছবি
উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৩-১ গোলে হেরে এশিয়ান গেমস থেকে বাংলাদেশ বিদায় নিলেও তরুণ ফুটবলারদের পারফরম্যান্স মন জয় করে নিয়েছে। আর এ ভালো ফুটবল খেলা সম্ভব হয়েছে ফিটনেসের উন্নতিতে


‘বাংলাদেশের ফুটবলাররা তো দৌড়াতেই পারে না। খেলবে কী?’ 

দেশের ফুটবলের গল্প উঠলেই কথাটি তাচ্ছিল্যের সুরে ব্যবহৃত হয়। এর বিরোধিতা করার সুযোগও নেই। তবে এক দল তরুণ ফুটবলার এবার কথাটির প্রতিবাদ করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, তাঁরা এশিয়ান গেমসে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, ‘কিছু ব্যতিক্রমও আছে।’ কাতার ও থাইল্যান্ডের মতো দলকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসের দ্বিতীয় রাউন্ডে নিয়ে গেছেন তাঁরা। এতেই তো বোঝা যায় এই তরুণেরা ব্যতিক্রম।

এই ব্যতিক্রম দল হয়ে ওঠার রহস্য উন্মোচন এক কথায় করতে গেলে উত্তর হচ্ছে, ফিটনেস। এ দল খেলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দৌড়াতে পারে একই ছন্দে। এর ফলে বিদায়ের আগ পর্যন্ত ‘বিদায় হব না’, এ দৃঢ় মানসিকতাটা ফুটে ওঠে শরীরী ভাষায়। থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ড্রয়ের পর কাতারকে হারিয়ে এশিয়াডের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেওয়া। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৩-১ গোলে হেরে বিদায়। যোগ করা সময়ে বাংলাদেশের ব্যবধান কমানোর গোলটি বাদ দিলে ৯০ মিনিট পর্যন্ত ৩-০। স্কোর বোর্ডের এ চেহারা একটা একপেশে ম্যাচের কথাই বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত ম্যাচের প্রতিটি মুভে কোরীয়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। কীভাবে সম্ভব হয়েছে এটা?

ফুটবলে ‘থ্রি এস’ বলে একটা মৌলিক বিষয় আছে—স্পিড (গতি), স্ট্রেংথ (শক্তি) ও স্ট্যামিনা (দম)। যে দলের এই ‘থ্রি এস’ যত ভালো, দল হিসেবে তারা ততটাই ভালো। দেশের ফুটবলে নিয়ে কথায় বারবার উঠে আসে এদের থ্রি এসের অভাব। কিন্তু জেমি ডের শিষ্যরা প্রমাণ করেছে, তাঁরা এই জায়গাটিতে উন্নতি করেছে বলেই এশিয়াডে কাতারের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়তে পেরেছে। বর্তমান রানার্সআপ উত্তর কোরিয়ার জালেও পাঠানো গেছে বল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেও এটা কেউ কল্পনায় আনতে পারেননি। কিন্তু সবই সম্ভব হয়েছে ‘থ্রি এস’-এর উন্নতিতে।

পরিসংখ্যান দিয়েই প্রমাণ করা যাক। বিশ্বকাপ খেলুড়ে দেশ উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে প্রথমার্ধে দুই গোল হজম করার পর অনেকেই ধরেই নিয়েছিল, দ্বিতীয়ার্ধে একেবারেই খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে বাংলাদেশ। কিন্তু লড়াইটা হলো সেয়ানে সেয়ানে। দ্বিতীয়ার্ধের ফলাফল বাংলাদেশ ১-১ উত্তর কোরিয়া। বলের দখল ৪৫-৫৫, শট ৫-৪, লক্ষ্যে শট ৩-১। অর্থাৎ বল পজিশনে একটু পিছিয়ে থাকা ছাড়া বাকি সবকিছুতেই বাংলাদেশই এগিয়ে। স্বাভাবিকভাবে স্পিড, স্ট্রেংথ ও স্ট্যামিনা বাড়াতেই দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ এভাবে খেলতে পেরেছে।

দলের এই বড় পরিবর্তন খুব সহজেই চোখে পড়েছে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ সাইফুল বারীর, ‘কোনো সন্দেহ নেই, প্রতিটা বিভাগ মিলিয়ে বাংলাদেশের ফিটনেসের অনেক উন্নতি হয়েছে, যার জন্য প্রতিপক্ষের অর্ধে গিয়েও প্রেসিং করা যাচ্ছে। টিম ডিফেন্ডিং ভালো হচ্ছে। বল রাখা যাচ্ছে দখলে।’

যে ফিটনেসের কারণে আগে পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ, তা-ই এখন উন্নতির কারণ। আর এটা সম্ভব হয়েছে নিয়মতান্ত্রিক খাদ্যাভ্যাসে। বর্তমানে কঠোর নিয়মে বাঁধা ফুটবলারদের খাবার তালিকা। কোচ ও ট্রেনার মিলিয়ে একটি খাদ্যতালিকা তৈরি করে দিয়েছেন, এর বাইরে গিয়ে খাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চিনি, জাঙ্ক ফুড, কোমল পানীয় পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ঝাল ও মসলাযুক্ত খাবারেরও কোনো সুযোগ নেই। ভাত খাওয়ার সুযোগ আছে, এক বেলা, তা-ও পরিমাণে খুবই অল্প। বোঝাই যাচ্ছে সবকিছুতেই একটা বদলের আভাস।