ব্যর্থ ফরাসি-স্প্যানিশ বিপ্লব, আরও ১০ বছরের আক্ষেপ

চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলেও বেনিতেজের ‘স্প্যানিশ বিপ্লব’ লিগের স্বাদ পায়নি। ছবি: এএফপি
চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলেও বেনিতেজের ‘স্প্যানিশ বিপ্লব’ লিগের স্বাদ পায়নি। ছবি: এএফপি
>

টানা তিন দশক পর আবারও লিগ শিরোপার স্বাদ পেয়েছে লিভারপুল। ৩০ বছর ধরে হাজারো চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আবারও ইংলিশ ফুটবলের রাজা হয়েছে ‘অল রেড’রা। দীর্ঘ ৩০ বছরের এই যাত্রা কেমন ছিল? সেটিই জানানোর চেষ্টা করা হয়েছে তিন পর্বের ধারাবাহিকে। আজ পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব

লিগ শিরোপাহীন দ্বিতীয় দশকের শুরুটা হলো অনেক সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা দিয়ে। আর এই উঠতি প্রত্যাশার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল লিভারপুলের ফরাসি ম্যানেজার জেরার্ড হুলিয়েরের। রয় এভান্স আমলের দুই খামতির কথা হুলিয়ের বেশ ভালো করেই জানতেন। জানতেন তাঁর আগে সুনেস কেন ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেটাও। দুই পূর্বসূরির ইতিহাস মাথায় রেখে আস্তে আস্তে নিজের ছাপ রাখা শুরু করলেন।

আর্সেনালে আরেক ফরাসি ভদ্রলোক আর্সেন ওয়েঙ্গারের কাজ দেখে মুগ্ধ হওয়া লিভারপুল বোর্ড হুলিয়েরকে নিয়োগই দিয়েছিল এই আশায়, লন্ডনের ক্লাবটায় ওয়েঙ্গার যে 'ফরাসি বিপ্লব' শুরু করেছেন, তার ছোঁয়া লাগবে লিভারপুলেও। সুনেসের মতো ক্লাবের নিয়মকানুনে কড়াকড়ি আনা শুরু করলেন সাবেক এই স্কুলশিক্ষক। তবে সুনেসের মতো রাতারাতি নয়, অবলম্বন করলেন ‘ধীরে চলো’ নীতি। আর এই কাজে সহকারী হিসেবে পেলেন লিভারপুলের সাবেক অধিনায়ক ফিল থম্পসনকে। খাওয়াদাওয়ায় কড়াকড়ি এলো। অনুশীলন, ড্রেসিংরুম কিংবা করিডরে মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা। হুলিয়ের বর্তমান দলের কারওর সাবেক সতীর্থ ছিলেন না, দলে খুব বড় তারকাও ছিল না, ফলে সুনেস যে ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রায় এক দশক আগে, সে সমস্যায় পড়লেন না হুলিয়ের।

রয় এভান্স আমলে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ ঠিক থাকলেও রক্ষণভাগের অবস্থা ছিল বাজে। হুলিয়ের এসেই সমস্যা সমাধানে লেগে গেলেন। ডাচ ক্লাব উইলেম আর ইংলিশ ক্লাব ব্ল্যাকবার্ন থেকে দলে এলেন ফিনল্যান্ডের অখ্যাত সেন্টারব্যাক স্যামি হুপিয়া ও সুইজারল্যান্ডের স্তেফানে হেনচোজদের। গোলবার সামলানোর জন্য এলেন স্যান্ডর ওয়েস্টারভেল্ড। রক্ষণভাগে বাড়তি নিরাপত্তা ও মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য নিউক্যাসল ইউনাইটেড থেকে আনা হল জার্মান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ডিটমার হামানকে। হুলিয়েরের মাথায় ছিল, ক্লাবের একাডেমিতে স্টিভেন জেরার্ড বলে এক রত্ন আছে, যাকে খুব শীঘ্রই মূল দলে ডাকতে হবে। জেরার্ড ছাড়াও দলের অন্যান্য ইংলিশ প্রতিভা ড্যানি মারফি, জেমি ক্যারাঘার ও মাইকেল ওয়েনকে পরিচর্যা করার ক্ষেত্রেও হুলিয়ের ছিলেন সদা তৎপর।

তবে এতকিছু করেও নিজের ঘাড় থেকে একটা 'দোষ' নামাতে পারলেন না হুলিয়ের। 'হুলিয়েরের অধীনে লিভারপুল তাঁর ইংলিশ সত্ত্বা হারাচ্ছে, দল হয়ে পড়ছে ফরাসি-নির্ভর', এই অভিযোগের উপস্থিতি ছিল সব সময়। এই অভিযোগের পালে হাওয়া অবশ্য হুলিয়ের নিজেই দিয়েছিলেন। ক্লাবে আসার পর প্রথম যাকে এনেছিলেন, তিনিই ছিলেন ফরাসি। জ্যাঁ মিশেল ফেরি নামের সেই মিডফিল্ডার ছয়মাসও টেকেননি। খেলোয়াড়দের মধ্যে গুঞ্জন ছিল, ড্রেসিংরুম এর 'গোয়েন্দা' করে আনা হয়েছিল ফেরিকে।

নতুন এই খেলোয়াড় আনার সুফল লিভারপুল পেল একদম হাতেনাতে। নতুন দশক শুরু করল 'কাপ ট্রেবল' জিতে – এফএ কাপ, লিগ কাপ ও উয়েফা কাপ। শতাব্দীর শুরুতেই একাধিক ট্রফি জেতার কারণে তরুণ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া লাগল। এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে অবশেষে এক যুগ পর লিগ জয় হবে, আশায় বুক বাঁধলেন সবাই।

জেরার্ড হুলিয়েরের ফরাসি বিপ্লবও থেকেছে অসম্পূর্ণ। ছবি : এএফপি
জেরার্ড হুলিয়েরের ফরাসি বিপ্লবও থেকেছে অসম্পূর্ণ। ছবি : এএফপি

তা দেখে ওপর থেকে ফুটবল-বিধাতা হয়তো মুচকি হেসেছিলেন। এভান্সের সমস্যাগুলোর সমাধান করলেও, হুলিয়েরের সমস্যা হলো আরেক জায়গায়। ফাওলার বা ওয়েনের মতো তারকারা যত তাড়াতাড়ি নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, বিভিন্ন চোটের কারণে মিইয়ে যাওয়া শুরু করলেন ঠিক তত তাড়াতাড়ি। আক্রমণভাগে গোল কমা শুরু হল। সমস্যা নিরসনে লেস্টার সিটি থেকে তৎকালীন ক্লাব রেকর্ড এক কোটি দশ লাখ পাউন্ড দিয়ে দলে আনা হলো ইংলিশ স্ট্রাইকার স্ট্রাইকার এমিল হেসকিকে।

হেসকির আবার সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। নামে স্ট্রাইকার হলেও জুটি বেঁধে খেলতে পছন্দ করতেন বেশি, খেলা গড়ে দিতে পছন্দ করতেন স্ট্রাইকিং-সঙ্গীর জন্য। ফলে ফাওলার বা ওয়েন চোটের কারণে মাঠের বাইরে চলে গেলে স্বাভাবিকভাবে হেসকির কার্যকারিতাও কমে যেত। এরই মধ্যে ফাওলারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত গোল না পেয়ে বিক্রি করে দেওয়া হলো লিডস ইউনাইটেডের কাছে। ২০০১-০২ মৌসুমে ইউনাইটেডকে টপকালেও লিগে দ্বিতীয় হলো লিভারপুল। ক্লাবের সবাই আশায় বুক বাঁধলেন, সামনের বছর হবে, ক্লাব সঠিক পথেই আছে।

তবে হুলিয়ের এর মধ্যেই সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলেন, ২০০১ সালের ১৩ অক্টোবর। পড়েছিলেন জীবন-সংশয়ে। লিডসের বিপক্ষে প্রথমার্ধ শেষে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়া লিভারপুলকে ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্রণা দিতে গিয়ে বুকে ব্যথা অনুভব করলেন। ক্লাবের ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখলেন, 'অ্যাওর্টিক ডিসেকশান' হয়েছে ম্যানেজারের। হুলিয়ের চেয়েছিলেন ম্যাচ শেষ করে তারপর চিকিৎসা নিতে। মানা হয়নি সে কথা। তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। পরে জানা গেল, ম্যাচ শেষ করে স্টেডিয়ামের বাইরের ভিড়ভাট্টা পেরিয়ে হাসপাতালে আসতে আসতে হয়তো প্রাণ হারাতে হতো হুলিয়েরকে। 'ট্রেবল' জয়ের পর শেষে আবারও লিগ জেতার আশায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেল লিভারপুল সেদিন।

পাঁচ মাস পর হুলিয়ের ডাগআউটে ফিরলেও কুঁজো হয়ে গেছিলেন, হয়েছিলেন শীর্ণকায়। মাথায় আর আগের মতো দ্রুতগতিতে ফুটবলীয় কৌশলগুলো ঘুরপাক খেত না। যার মাশুল দিল লিভারপুল। সে মৌসুমে দ্বিতীয় হলেও পরের মৌসুম থেকে যার প্রভাব পড়া শুরু হল।

এখান থেকে একটা অনাকাঙ্খিত ধারার সূত্রপাত হয়। লিগহীন বছরগুলোতে লিভারপুল যখনই দ্বিতীয় হতো, পরের বছরেই উল্টোপাল্টা খেলোয়াড় কিনে দ্বিতীয় থেকে প্রথম হওয়ার সুযোগ হারাতো। আগের বছরেই পিএসজি থেকে ধারে তরুণ স্ট্রাইকার নিকোলাস আনেলকাকে এনেছিল লিভারপুল। আনেলকা খেলছিলেনও অসাধারণ। মাইকেল ওয়েনের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ছিল চমৎকার। কিন্তু সব হিসাব পাল্টে‌ দিল ২০০২ বিশ্বকাপ।

সেবার ফ্রান্সকে টপকে একদম কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত চলে যাওয়া সাহসী সেনেগালের দুজন খেলোয়াড় – এল হাজি দিউফ আর সালিফ দিয়াওকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন হুলিয়ের। ভুলে গেলেন আগের মৌসুমে আনেলকার ঝলকের কথা। যেখানে আনেলকার ধার চুক্তি পাকা করার সুযোগ ছিল, সেটা না করে দিউফকে এক কোটি পাউন্ড দিয়ে কিনলেন। ওদিকে দিয়াওর মধ্যে দেখলেন আর্সেনালের প্যাট্রিক ভিয়েরার ছায়া।

নব্বই দশকের শেষদিক থেকে প্রিমিয়ার লিগে বিদেশী খেলোয়াড়ের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বিশেষ করে প্রথাগত স্ট্রাইকারের পেছনে 'ফ্রি' ভাবে খেলতে থাকা বিদেশী আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার বা সহকারী স্ট্রাইকার খেলানোর একটা নতুন ধারা চালু হয় ক্লাবগুলোর মধ্যে। যে ধারাটা শুরু করেছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এরিক ক্যান্টোনা, চেলসির জিয়ানফ্রাঙ্কো জোলা ও আর্সেনালের ডেনিস বার্গক্যাম্প। তখন প্রিমিয়ার লিগের আর দশটা পরিবর্তনের মতো ওই পরিবর্তনের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝেনি লিভারপুল, ওই ভূমিকায় খেলানোর জন্য কেনেনি কাউকে। এতদিন পর সেই 'ফ্রি' ভূমিকায় খেলানোর জন্য ফরাসি মিডফিল্ডার বেনোয়া শেরু কে দলে আনলেন হুলিয়ের। ঘোষণা দিলেন, 'লিভারপুল পেয়ে গেছে নতুন জিদান।'

আদৌ পেয়েছিল কি না, সেটা বিজ্ঞ পাঠকদের ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। অসুস্থতার পর এমন একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের বলি হয়ে ক্লাব ছাড়লেন হুলিয়ের। লিভারপুলের ফরাসি বিপ্লব অসম্পূর্ণই রয়ে গেল।

ততদিনে বিশ্ব দেখছে এক পর্তুগিজ লোকের কেরামতি। এফসি পোর্তোর হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে সবার মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছিলেন হোসে মরিনহো। লিভারপুলের প্রধান নির্বাহী রিক পেরিও চাইলেন, দলে মরিনহো আসলে মন্দ হয় না। মরিনহোর পক্ষ থেকে জানানো হলো, লিভারপুলের দায়িত্ব নিতে অপেক্ষা করছেন সাগ্রহে। কিন্তু মরিনহোর অকপট মানসিকতা ও ঠোঁটকাটা স্বভাব দেখে পিছু হটলেন পেরি। ঠোঁটকাটা মরিনহোর চেয়ে চুপচাপ বেনিতেজকে মনে ধরল লিভারপুলের।

প্রতিভার চেয়ে কৌশলকে বেশি প্রশ্রয় দিতেন বেনিতেজ। ছবি : এএফপি
প্রতিভার চেয়ে কৌশলকে বেশি প্রশ্রয় দিতেন বেনিতেজ। ছবি : এএফপি

বেনিতেজ চুপচাপ থাকলেও, ভ্যালেন্সিয়ায় তাঁর কাজ তাঁর সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছিল উচ্চগ্রামে। ২০০২ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগে ভ্যালেন্সিয়ার কৌশলের কাছে নাকাল হওয়া স্টিভেন জেরার্ডরা ততদিনে স্বীকার করেছেন, কৌশলগতভাবে এমন অসাধারণ দলের মুখোমুখি হননি কখনো। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে বেনিতেজকেই আনা হলো, ওদিকে মরিনহো পাড়ি জমালেন চেলসিতে।

লিভারপুলে এসেই পাহাড়সম এক কাজ চাপল বেনিতেজের মাথায়। স্টিভেন জেরার্ড তখন ইংল্যান্ডের সেরা মিডফিল্ডার। আর ওদিকে চেলসিতে গিয়েই জেরার্ডকে দলে চাইলেন মরিনহো। জেরার্ড যে মরিনহোর কৌশলে কতটা অপরিহার্য হতে পারেন, পর্তুগিজ কোচ সেটা বেশ ভালোই বোঝাতে পারলেন ইংলিশ তারকাকে। একদিকে মরিনহোর মতো অসাধারণ কোচের অধীনে খেলার ইচ্ছা, অপরদিকে লিভারপুলের প্রতি আজন্ম ভালোবাসা। দোটানায় পড়ে গেলেন জেরার্ড। জেরার্ডকে দলে রাখার জন্য তাই বেনিতেজকে এগিয়ে আসতেই হতো। আর সেই কাজের শুরুতেই ঝামেলা পাকিয়ে ফেললেন এই স্প্যানিশ কোচ।

চুপচাপ থাকার কারণে মানুষকে 'পটানো'র জন্য কখন কী বলতে হয়, অত ভালো পারতেন না। লিভারপুলের দায়িত্ব পেয়েই ইউরো ২০০৪ -তে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা লিভারপুলের তিন সদস্য জেরার্ড, ওয়েন আর ক্যারাঘারের সঙ্গে দেখা করতে উড়োজাহাজে চাপলেন বেনিতেজ। কাকতালীয়ভাবে সে ফ্লাইটে জেরার্ডের মা-ও ছিলেন। জেরার্ডের মায়ের সঙ্গে দেখা করেই প্রথমে একটা বেফাঁস মন্তব্য করে বসলেন বেনিতেজ, 'আপনার ছেলে কি টাকাপয়সা খুব পছন্দ করে?'

ঠাট্টাচ্ছলেই বলেছিলেন লিভারপুলের নতুন কোচ। তবে জেরার্ডের মায়ের কাছে ইঙ্গিতটা ভালো লাগল না। জেরার্ডের সঙ্গে বেনিতেজের দেখা হওয়ার আগেই ততক্ষণে মায়ের কাছ থেকে লিভারপুল অধিনায়ক নতুন কোচের এই কাণ্ড সম্পর্কে জেনে গেছেন। ক্যারাঘার নতুন কোচের সঙ্গে দেখা করে উচ্ছ্বসিত হলেও, ওয়েন-জেরার্ডের কাছে মনে হলো এই লোক বেশ 'শীতল' স্বভাবের। পেশাদারিত্ব ছাড়া কিছু বোঝেন না।

পরের এক বছরে জেরার্ডদের সেই ধারণা আরও পোক্ত হল। যেখানে মরিনহো ছিলেন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ও স্পষ্টবাদী, বেনিতেজ আগাগোড়াই পেশাদার। ফলে জেরার্ডের মনে হলো, তিনি বেনিতেজের কাছে অপরিহার্য নন, উল্টো মরিনহোই তাঁকে বেশি চান। জেরার্ডের আগের গুরু হুলিয়ের যেখানে খেলোয়াড়দের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মনোযোগী ছিলেন, নিয়মিত খেলোয়াড়দের পরিবার-পরিজন নিয়ে জানতে চাইতেন, বেনিতেজের সেসবের বালাই ছিল না। খেলোয়াড় তাঁর কৌশল, ছক বা আগের রাতে ম্যাচ দেখেছে কি না–বেনিতেজের জানতে চাওয়ার দৌড় অতটুকুই ছিল।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই হুট করে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে বসে লিভারপুল। বিশ্বজোড়া লিভারপুল সমর্থকের কাছ থেকে জেরার্ড পান দেবতার মর্যাদা। তা দেখে আবেগাপ্লুত জেরার্ডের মনে হয়, 'এই ক্লাবকে আমি কীভাবে ছাড়তে পারি?'

তবে জেরার্ডের দুর্ভাগ্য, বেনিতেজ বা লিভারপুলের কর্তাব্যক্তিরা জেরার্ডকে নিয়ে সেটা ভাবতেন না, অন্তত জেরার্ডের সেটাই মনে হয়েছিল। ক্লাব নতুন চুক্তি দিচ্ছে না, কোচের ব্যবহার দেখেও মনে হচ্ছে জেরার্ডকে বিক্রি করে সে টাকা দিয়ে দল ঢেলে সাজাতে আগ্রহী তিনি। নিজের ক্লাবের এমন নির্বিকারত্ব কষ্ট দিল জেরার্ডকে। ঠিক যেমনটা কষ্ট দিয়েছিল স্টিভ ম্যাকমানামান, রবি ফাওলার কিংবা মাইকেল ওয়েনকে। চুক্তি নিয়ে ক্লাবের গড়িমসির কারণে ক্লাব ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনজনই। ওদিকে অবস্থা বুঝে মরিনহো আবারও জানিয়ে দিলেন, ক্লদ ম্যাকেলেলে আর ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের পাশে খেলানোর জন্য স্টিভেন জেরার্ডই তাঁর মূল পছন্দ।

দিনের পর দিন ধরে অপেক্ষা করার পর জেরার্ড যে চুক্তি পেলেন, তাতে তাঁর পোষাল না। ওদিকে নিজের পছন্দের ক্লাব ছেড়েও যেতে মন চাইছে না যে! জেরার্ডের বাবা ও ভাই বোঝালেন, 'তুমি কি ক্লাব ছাড়ার পর অন্য ক্লাবের হয়ে নিজের পুরোটা দিতে পারবে? লিভারপুল সমর্থকদের কাছে "বিশ্বাসঘাতক" হওয়ার বোঝা বইতে পারবে আজীবন?' মানসিক চাপে আসলেই অসুস্থ হয়ে গেলেন জেরার্ড। 'প্যানিক অ্যাটাক' হতে থাকল বারবার। ক্লাবের ডাক্তার এসে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা শুরু করলেন।

শেষমেশ জেরার্ড বুঝলেন, ক্লাব যা দিচ্ছে দেক, তাঁর পক্ষে ক্লাব ছাড়া সম্ভব না। এমনকি নতুন চুক্তিতে লেখা ছিল, লিভারপুল চ্যাম্পিয়নস লিগে না উঠতে পারলে জেরার্ড চাইলে ক্লাব ছাড়তে পারবেন। জেরার্ডের অনুরোধে সে ধারা বাতিল করা হয়। ইঙ্গিত স্পষ্ট, আর কখনই ক্লাব ছাড়বেন না এই তারকা।

ওদিকে খেলার মাঠে কৌশলগত দিক দিয়ে বেনিতেজের অধীনে নতুন যুগে প্রবেশ করছিল লিভারপুল। দর্শকদের আনন্দ দেওয়ার দিকে একটুও আগ্রহ ছিল না বেনিতেজের। কীভাবে নিজেদের রক্ষণভাগ সুদৃঢ় রেখে একের পর এক ম্যাচ বের করে আনা যায়, সেটাই ছিল লক্ষ্য। যে কারণে বেনিতেজের অধীনে আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়দের দাম ছিল না একদম। স্ট্রাইকার-উইঙ্গারদের দিয়েও রক্ষণ কাজ করাতে চাইতেন। 'আগে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলানোর জন্য সতর্ক থাকো, নিজের পেছনে থাকা সতীর্থকে রক্ষণকাজে সাহায্য কর, পরে সুযোগ পেলে দরকার হলে আক্রমণে যাবে', বেনিতেজের বার্তা ছিল স্পষ্ট। যে কারণে ফেইনুর্দে গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়া ডাচ তারকা ডির্ক কিউট লিভারপুলে এসে হয়ে যান পরিশ্রমী উইঙ্গার, যার মূল কাজ বিপক্ষ দলের উইঙ্গার বা ফুলব্যাকের গতিবিধির দিকে নজর রাখা ও নিজের পেছনে থাকা ফুলব্যাককে সাহায্য করা, গোল করা নয়। সেভিয়ার রাইটব্যাক দানি আলভেসকেও সে কারণে কিনতে চেয়েছিলেন বেনিতেজ, তবে ফুলব্যাক হিসেবে না, উইঙ্গার হিসেবে।

এই দশকে লিভারপুলের প্রধান দুই তারকা, স্টিভেন জেরার্ড ও ফার্নান্দো তোরেস। ছবি : এএফপি
এই দশকে লিভারপুলের প্রধান দুই তারকা, স্টিভেন জেরার্ড ও ফার্নান্দো তোরেস। ছবি : এএফপি

ফুলব্যাকদের উইঙ্গার হিসেবে একজন ম্যানেজার তখনই খেলান, যখন সবার আগে তাঁর রক্ষণ করার দিকে নজর থাকে। গোল করার দিকে নয়। যে কারণে জন আর্ন রিসার মতো লেফটব্যাক বেনিতেজের লিভারপুলে খেলতেন উইঙ্গার হিসেবে। ওদিকে বেনিতেজের কথা না শোনার কারণে রায়ান বাবেলের মতো প্রতিশ্রুতিশীল উইঙ্গারকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তাঁর দোষ একটাই ছিল, নিজের পিছে থাকা ফুলব্যাককে সাহায্য না করে বারবার প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ঢুকে গোল করতে চাইতেন। প্রতিভার চেয়ে দলের কৌশল বড়–বেনিতেজের সাফ কথা।

ম্যাচের আগে প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের মাথায় বেদবাক্যের মতো ঢুকিয়ে দিতেন, যা-ই করোনা কেন, এগারো জনের যে কৌশলগত ছক, সেটা যেন না ভাঙ্গে। ছক ভেঙ্গে কিছু করা মানেই বিপদ। প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড়ের গতিবিধি অনুযায়ী সে খেলোয়ড়কে 'মার্ক' করা লিভারপুলের কোনো খেলোয়াড় নিজের জায়গা থেকে একটু নড়লে গোটা দল ঐ অনুযায়ী নিজেদের পুনর্বিন্যাস করত। কোনোভাবেই ছক ভাঙত না। পরে সুযোগ পেলে প্রতি আক্রমণে গোল–যে কৌশলে দুর্দান্ত সাফল্য পেয়েছিলেন ফার্নান্দো তোরেস ও স্টিভেন জেরার্ড জুটি।

প্রতিপক্ষ যাতে তাঁর কৌশল আগেভাগে না জানতে পারে, এ জন্য প্রায় সময়ই শেষ মুহূর্তে দল বানাতেন বেনিতেজ। দল কোন ছকে খেলবে, কে খেলবে, কার ভূমিকা কী হবে, এসব অনেক সময় বেনিতেজ নিজের খেলোয়াড়দের একদম ম্যাচ শুরু হওয়ার আগ দিয়ে বলতেন–পাছে প্রতিপক্ষ জেনে যায়! দলে মানহীন অনেক স্প্যানিশ খেলোয়াড়ও কিনেছেন, যাদের কাজ ছিল খেলার মাঝে বেনিতেজের কাছ থেকে কথা শুনে সে কথা মাঠের সতীর্থদের অনুবাদ করে বলা। বেনিতেজ এই কথাগুলোও বলতেন স্প্যানিশে, যাতে মাঠের মধ্যে প্রতিপক্ষ না বুঝতে পারে!

অতিরক্ষণশীল মনোভাবের কারণে বড় দলগুলোর সঙ্গে জিততে পারলেও, ছোট দলগুলোর বিপক্ষে জিততে অনেক কষ্ট হতো বেনিতেজের। কারণ একটাই, বড় দলগুলো আক্রমণাত্মকভাবে খেলে, তাঁদের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক পন্থা অবলম্বন করে প্রতি আক্রমণে গিয়ে ম্যাচ জেতা যায়। কিন্তু ছোট দলগুলো লিভারপুলের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক খেলত। ফলে 'ফুলব্যাককে সাহায্য করা'র আদেশ নিয়ে মাঠে যাওয়া আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা গোল করতে পারতেন না। ২০০৮-০৯ মৌসুমে ঠিক এই কারণেই লিগে দ্বিতীয় হয় লিভারপুল। বড় দলের সঙ্গে নিয়মিত পয়েন্ট পেলেও ছোট দলগুলোর সঙ্গে ড্র করত তারা, হেরে বসেছিল মিডলসব্রো ও টটেনহামের কাছে। সেবার গোটা মৌসুমে ১১টা ম্যাচ ড্র না করলে হয়তো লিগই জিতে যেত তারা!

পূর্বসূরি হুলিয়েরের মতো বেনিতেজও আজেবাজে খেলোয়াড়দের পেছনে টাকা খরচ করেছেন প্রচুর। বল পায়ে শিল্পিত কাজ দেখানো জাবি আলোনসোর জায়গায় আনতে চেয়েছিলেন পরিশ্রমী গ্যারেথ ব্যারিকে। পরে কোচের ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে আলোনসো পাড়ি জমান রিয়াল মাদ্রিদে। পরে ব্যারিকেও পাননি বেনিতেজ। রোম থেকে কিনে এনেছিলেন ইতালিয়ান মিডফিল্ডার আলবার্তো অ্যাকুইলানিকে। চোটে জর্জরিত যে খেলোয়াড় কখনই অ্যানফিল্ডে নিজের ঝলক দেখাতে পারেননি। এরকম প্রশ্নবিদ্ধ দলবদল অহরহ করেছেন বেনিতেজ। যে কারণে দ্বিতীয় হওয়ার পরের মৌসুমে আজেবাজে খেলোয়াড় আনার হুলিয়ের সেই ধারা বজায় রাখলেন বেনিতেজও। লিভারপুল হলো সপ্তম।

লিভারপুলে যে ছয় বছর ছিলেন, খেলোয়াড় বিক্রি বাবদ যা টাকা পেয়েছিলেন তাঁর চেয়ে ১২ কোটি পাউন্ডেরও বেশি খরচ করেছেন খেলোয়াড় কেনার ক্ষেত্রে। যেখানে একই সময়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খরচ ছিল দুই কোটি সাতাশ লাখ পাউন্ডের মতো।

ফলে এই দশকের শেষে বেনিতেজকেও সেই হুলিয়েরের ভাগ্যই বরণ করে নিতে হয়েছে। তাতে লিগের জন্য লিভারপুলের অপেক্ষা শুধুই বেড়েছে, কমেনি।
(চলবে)