বাংলাদেশ সময় আজ রাত আটটায় বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের যৌথ বাছাইয়ে মুখোমুখি বাংলাদেশ ও ভারত। কলকাতার যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ২০১৯ সালের অক্টোবরে বাছাইপর্বের প্রথম লেগের ম্যাচটি ড্র হয়েছিল ১-১ গোলে। প্রতি-আক্রমণনির্ভর ফুটবল খেলে প্রথমার্ধেই আবাহনীর উইঙ্গার সাদ উদ্দিনের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাচের শেষের দিকে মোহনবাগানের ডিফেন্ডার আদিল খানের গোলে সমতায় ফেরে স্বাগতিকেরা।
কপাল খারাপ ছিল সেদিন বাংলাদেশের, বলতেই হয়। বেশ কিছু ভালো সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি নাবিব নেওয়াজ-সাদ-ইব্রাহিমরা। বল পোস্টে লেগেছে, গোললাইন ক্লিয়ারেন্সে বেঁচেছে ভারত—আরও কত কী! আর তাতে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের অপেক্ষাটা দীর্ঘই হয়েছে শুধু। শেষবার ভারতকে হারানো গিয়েছিল তা–ও প্রায় ১৯ বছর আগে—২০০৩ সালে।
ক্রোয়েশিয়ার ইগর স্টিমাচ কোচ হয়ে আসার পর একটা ম্যাচে জিতেছে তারা, ড্র করেছে চারটায়। হেরেছে আট ম্যাচে। বাংলাদেশের বিপক্ষে আগের ম্যাচটার কথা তো বলা হলোই, এবারের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হারতে হারতে ড্র করেছে দলটা। যদিও কাতারের বিপক্ষে প্রথম পর্বে দারুণ খেলে গোলশূন্য ড্র করেছিল তারা। বাছাইপর্বের প্রথম ম্যাচে ওমানের বিপক্ষে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত হেরেছিল ২-১ গোলে।
ভারতের এখন একমাত্র লক্ষ্য, কোনোভাবে হাতে থাকা বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচগুলো জিতে গ্রুপে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বের সুযোগ করে নেওয়া। আর সে লক্ষ্যে তারা অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারে আজ। আজ জিতলে আফগানিস্তানকে টপকে তৃতীয় স্থানে চলে আসবে ভারতীয়রা। আর সেটি যেন না হয়, তার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাবে বাংলাদেশ। জামাল ভূঁইয়ারা জিতলে যে এ ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের কৌশল ও মূল একাদশ কেমন হতে পারে?
বাংলাদেশের বিপক্ষে পূর্ণ তিন পয়েন্ট পাওয়ার জন্য ভারত যে আগাগোড়াই আক্রমণাত্মক খেলবে, সেটা মোটামুটি বলে দেওয়া যায়। কাতারের বিপক্ষে যে অতি সাবধানী ভারতকে দেখা গিয়েছিল, সে ভারতকে আশা করা যাবে না বাংলাদেশের বিপক্ষে। সংবাদ সম্মেলনেও কোচ স্টিমাচ অমন একটা ধারণা দিয়ে রেখেছেন, ‘কাতার বা ওমান ম্যাচে আমরা যেমন খেলেছিলাম, এ ম্যাচে তার চেয়ে ব্যতিক্রমী খেলা খেলব আমরা। বলের দখল রাখা, সঠিক পাস দেওয়া, খেলার গতি বজায় রাখা—এসব দিক দিয়ে ম্যাচটা কীভাবে খেলা যায়, সেটা আমাদের ওপরেই।’
এই ‘ব্যতিক্রমী খেলা’ মানে যে আক্রমণাত্মক খেলা, সেটা না বলে দিলেও চলছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে শেষ ম্যাচেই যেমন ভারত নিজেদের মাঠে এতটাই আক্রমণাত্মক খেলার পরিকল্পনা করেছিল, যেকোনো রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার ছাড়াই খেলতে নেমে গিয়েছিল। সেদিন বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার অনিরুদ্ধ থাপাকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের জায়গায় বসিয়ে সামনে পাঁচজন আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় নামিয়ে দিয়েছিলেন স্টিমাচ- স্ট্রাইকার অধিনায়ক সুনীল ছেত্রী, উইঙ্গার মানভির সিং, উদান্তা সিং ও আশিক কুরুনিয়ান, আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার আব্দুল সামাদ। জামাল ভূঁইয়া আর সোহেল রানা মিলে সেদিন নিশ্চিত করেছিলেন, থাপা যেন কোনোভাবেই আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ না করতে পারেন। সে কাজে তাঁরা ছিলেন শতভাগ সফল।
তাই এ ম্যাচে আক্রমণাত্মক খেলার পাশাপাশি ওদিকটাও নজরে রাখতে হবে ভারতকে, যাতে নিজেদের কৌশলের কারণেই এমন কিছু না হয়ে যায় যাতে মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে যোগাযোগটা না থাকে।
কাতার, ওমান ও আরব আমিরাত, ভারত সাম্প্রতিক সময়ে তিনটা ম্যাচই খেলেছে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দলের বিপক্ষে। ডিফেন্ডার হিসেবে খেলেছেন পাঁচজন, আক্রমণভাগেও এমন কয়েকজনকে নির্বাচন করা হয়েছিল যাঁরা প্রয়োজনে নিচে নেমে এসে রক্ষণে সাহায্য করে দিতে পারেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে ওই কৌশলে খেলবে না ভারত।
এমনিতেই কোচ স্টিমাচের পছন্দের ছক ৪-২-৩-১। যা আক্রমণ করার সময় ৪-৩-৩ হয়ে যায়, আর প্রতিপক্ষের পায়ে বল চলে গেলে ৪-১-৪-১। আজও অমন কিছুই দেখা যাবে হয়তো। নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার রাহুল ভেকে কাতারের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখেছেন, ফলে তাঁকে ছাড়াই নামতে হবে ভারতকে। ভারতের রক্ষণভাগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাদের বৈচিত্র্যময়তা। এখনো নিজেদের কোনো স্থায়ী রক্ষণভাগ ঠিক করতে পারেননি স্টিমাচ। সেটা রক্ষণ নিয়ে কোচের সংশয়ও যেমন প্রকাশ করে, একই সঙ্গে প্রকাশ করে ডিফেন্ডারদের একাধিক পজিশনে খেলতে পারার ক্ষমতাকেও।
বাংলাদেশের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে ড্রয়ের নায়ক আদিল খানই যেমন। সেন্টারব্যাক হিসেবেও যেমন খেলতে পারেন, খেলতে পারেন রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে। মোহনবাগানের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার প্রীতম কোটাল খেলতে পারেন রাইটব্যাক, সেন্টারব্যাক ও রাইট মিডফিল্ডার হিসেবে। কোটালের মোহনবাগান সতীর্থ শুভাশিস বসু খেলতে পারেন সেন্টারব্যাক ও লেফটব্যাক হিসেবে। সেন্টারব্যাক, রাইটব্যাক হিসেবে খেলতে পারেন কাতারের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখা রাহুল। আশিক কুরুনাইন লেফট উইঙ্গার হলেও তাঁকে প্রায়ই খেলানো হয় লেফটব্যাক হিসেবেও। শেষ সাত ম্যাচে ভারত খেলেছে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন ডিফেন্সিভ লাইনআপে। বাংলাদেশের বিপক্ষেও এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার শেষ হবে না হয়তো।
রাহুল না থাকার কারণে রাইটব্যাক হিসেবে খেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি প্রীতমের। সেন্টারব্যাক হিসেবে বাংলাদেশের বিপক্ষে ড্রয়ের নায়ক আদিল গত তিন ম্যাচ ধরে মূল একাদশে নেই, সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলেছেন শুভাশিস, সন্দেশ ঝিঙ্গান, প্রীতম। তবে রাহুলের অনুপস্থিতির কারণে প্রীতমের রাইটব্যাকে খেলার সম্ভাবনা কপাল খুলে দিতে পারে আদিলের জন্য। বাংলাদেশের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে না খেলা সন্দেশ এ ম্যাচে থাকবেন সেটা নিশ্চিত। লেফটব্যাক হিসেবে উইঙ্গার আশিক কুরুনাইনকে না খেলিয়ে আজ আকাশ মিশ্রকে খেলাতে পারেন স্টিমাচ, যিনি অপেক্ষাকৃত রক্ষণাত্মক।
মাঝমাঠে অনিরুদ্ধ থাপার করোনা নেগেটিভ হওয়ার সংবাদটা স্বস্তির সুবাতাস বয়ে এনেছে ভারতের জন্য। দুই মিডফিল্ডারের মধ্যে বক্স-টু-বক্স ভূমিকায় আজ তাঁকে দেখা যেতে পারে। কিন্তু অনিরুদ্ধের পাশে একজন জাত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার না খেলানোর ভুলটা হয়তো আজ করবেন না স্টিমাচ। সে হিসেবে কাতারের বিপক্ষে গত ম্যাচে অভিষিক্ত এফসি গোয়ার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার গ্লান মার্টিনসকে আবারও সুযোগ দিতে পারেন স্টিমাচ।
আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডে সৃষ্টিশীলতার জন্য গোয়ার ব্র্যান্ডন ফার্নান্দেস কিংবা কেরালা ব্লাস্টার্সের সাহাল আব্দুল সামাদকে রাখা হতে পারে। দুর্দান্ত গতিশীলতা ও ড্রিবলিংয়ের জন্য রাইট উইংয়ে খেলতে পারেন বেঙ্গালুরু এফসির উদান্তা সিং। লেফট উইং ও একক স্ট্রাইকার—এই দুই পজিশনে খেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ সুনীল ছেত্রী ও মোহনবাগানের মানভির সিংয়ের। নিজেদের মধ্যে ক্রমাগত পজিশন পরিবর্তন করবেন এঁরা দুজন। গোলকিপার হিসেবে ভারতে গুরপ্রীত সিং সান্ধুর প্রতিদ্বন্দ্বী নেই একেবারেই।
দোহার জসিম বিন হামাদ স্টেডিয়ামে আজ তাই জামালদের মূল লক্ষ্য হবে ভারতের আক্রমণ সামলে প্রতি–আক্রমণের মাধ্যমে গোলের সুযোগ খোঁজা, যে কাজটা খুব সফলভাবেই গত ম্যাচে করেছিল বাংলাদেশ।